
ঢাকার পূর্বাচল প্রকল্পে অধিগ্রহণ করা ১২৬ একর জমির দখল নেই রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক)। সেই সঙ্গে এই জমি অধিগ্রহণ করা বাবদ ১১ কোটি টাকার হিসাব নেই। রাষ্ট্রীয় সম্পদ নিয়ে এ ধরনের দুর্নীতি অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে খোদ রাজউকের ভেতরেই।
রাজউকের নিরীক্ষা বিভাগের এমন তথ্যকে অনিয়ম বলছে সরকারের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয় (সিএজি)। এ বিষয় কথা বলতে রাজি নন রাজউক কর্মকর্তারা। বিষয়টি নিয়ে মুখ না খুললেও কোনো প্রতিবাদ করা হয়নি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে।
জানা যায়, পূর্বাচল প্রকল্পের জন্য মোট ৬ হাজার ২১৩ একর জমি অধিগ্রহণ করেছে রাজউক। তবে বাস্তবে প্রতিষ্ঠানটির দখলে আছে ৬ হাজার ৮৭ একর জমি। বাকি ১২৬ একর জমি দখলে নেই। বিষয়টি রাজউকের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের হিসাব নিরীক্ষার সময় নজরে আসে।
পরে এ নিয়ে নিরীক্ষা চালায় সরকারের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক কার্যালয় (সিএজি)। গত জুন মাসে তারা নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেয়। নিরীক্ষায় বিষয়টিকে অনিয়ম বলে উল্লেখ করে সিএজি।
সিএজির কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে জানান, কম জমি দখলে থাকার বিষয়ে রাজউক কর্তৃপক্ষ কোনো জবাব দেয়নি। পরে অনিয়ম নিয়ে সচিব বরাবর নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও তাগিদপত্র ইস্যু করা হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো নিষ্পত্তিমূলক জবাব দেওয়া হয়নি। তাই অধিগ্রহণ ও দখলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানান সিএজির কর্মকর্তারা।
নিরীক্ষাকালীন পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) ছিলেন উজ্জ্বল মল্লিক। বর্তমানে তিনি রাজউকের প্রধান প্রকৌশলীর (বাস্তবায়ন) দায়িত্বে আছেন। তিনি গণমাধ্যমকে প্রশ্ন করে বলেন, জায়গা কম পাওয়া যাচ্ছে মানে? আমি হলাম এই প্রকল্পের দশম পিডি। আমি কি জায়গা দখল করেছি?
তার দাবি, ৩০০ ফুট সড়কের ১৫০ একর জায়গা ধরা হয়নি। ওই জায়গা হয়তো দেখায়নি, এ রকম কিছু একটা হবে। ওই সড়কে যে ১৫০ একর জায়গা আছে, ওই জায়গা ওই প্রকল্পের আওতায় আছে। নিরীক্ষাকারীরা হয়তো না বুঝে লিখেছেন।
নিরীক্ষা আপত্তির বিষয়টি জানেন না বলেও জানান তৎকালীন প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) উজ্জ্বল মল্লিক। তিনি বলেন, প্রকল্পের আওতায় জমি অধিগ্রহণ হয়েছে ৬ হাজার ২২৭ একর। আর মাস্টারপ্ল্যানে জমি আছে ৬ হাজার ৭৭ একর। এর সঙ্গে ৩০০ ফুট সড়কের ওই ১৫০ একর জমি যোগ করতে হবে।
জানা গেছে, অধিগ্রহণ করা জমি মোট ২০টি খাতে ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বেশি জমি বরাদ্দ রাখা হয়েছে আবাসিক প্লট, সড়ক, জলাধার, আবাসিক ব্লক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য। এর মধ্যে আবাসিক প্লটে ২ হাজার ৩৩ দশমিক ৫৫ একর, সড়ক নির্মাণে ১ হাজার ৪৫৪ দশমিক ২৫৪ একর, জলাধারে ৪৬০ দশমিক ৯৪০ একর, আবাসিক ব্লকে ৩২৫ দশমিক ৩২২ একর এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৭০ দশমিক ৩৬৯ একর জমি।
এ ছাড়া প্রকল্প এলাকায় ফুটপাত, শরীরচর্চার অবকাঠামো, বনায়ন ও ইকোপার্ক নির্মাণ ও সবুজায়নসহ (আরবান গ্রিন) অন্যান্য খাতে জমি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। যদিও এতে ৩০০ ফুট সড়কের জন্য কোনো জমি বরাদ্দের কথা উল্লেখ নেই।
তবে সিএজির নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের জুনের অগ্রগতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, অধিগ্রহণ করা মোট জমির পরিমাণ ৬ হাজার ২১৩ দশমিক ৫৫ একর। প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৬ হাজার ৮৭ দশমিক ৩৫৫ একর জমি। বাকি ১২৬ দশমিক ১৯৫ একর জমির হিসাব নেই।
সিএজির নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণে রাজউকের ব্যয় হয়েছে ৫৪২ কোটি ৭৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। একরপ্রতি ব্যয় হয়েছে ৮ লাখ ৭৩ হাজার ৫০১ টাকা। এই হিসাবে ১২৬ দশমিক ১৫৫ একর জমির দাম ১১ কোটি ২ লাখ ৩১ হাজার ৪৫৯ টাকা।
নিরীক্ষা আপত্তির বিষয়ে প্রকল্পের বর্তমান পিডি মোহাম্মদ মনিরুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, ওরা (নিরিক্ষা) যে আপত্তি দিয়েছে, এটা ওরা সরেজমিনে মেজারমেন্ট (পরিমাপ) করে দেয়নি। আমরা তো এ রকম কোনো তথ্য দিইনি যে জমি কম আছে।
মনিরুল হক আরও বলেন, ভেতরে যেগুলো অধিগ্রহণ করা হয়েছে, এ রকম অনেক জমির টাকা পরবর্তী সময়ে আর দেওয়া হয়নি। কারণ, ওই জমিগুলো ওয়াক্ফতে দান করে দেওয়া। এ ধরনের জমি অধিগ্রহণ করা যায় না। এটা হয়তো তখন আপত্তি এসেছিল। কিন্তু কেন নিষ্পত্তি করা হলো না, সেটা বুঝলাম না।
বর্তমান পিডি আরও বলেন, নিরীক্ষা আপত্তির বিষয়টি জানা ছিল না। আমি ওই শাখার সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব। আর নিরীক্ষা আপত্তির জবাবও দেওয়া হবে। সাধারণত রাজউক কর্তৃপক্ষের ভূমি শাখা জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে অধিগ্রহণের কাজ করে জমি বুঝিয়ে দেয়। পরে সেখানে জমি উন্নয়নের কাজ করা হয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, এটা রাষ্ট্রীয় সম্পদ নিয়ে প্রতারণামূলক দুর্নীতি। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক ও অগ্রহণযোগ্য।
তিনি বলেন, কীভাবে এটা হলো, খতিয়ে দেখতে হবে, জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। না হলে এ ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রতারণা চলতেই থাকবে।
প্রসঙ্গত, দেশের সবচেয়ে বড় আবাসন প্রকল্প পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প। এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ১৯৯৫ সালে। শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১০ সালে। তবে এখনো প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। সপ্তমবারের মতো বাড়ানো হয়েছে প্রকল্পের মেয়াদ। সর্বশেষ মেয়াদ বেড়েছে গত বছরের জুন মাসে। বর্ধিত এ মেয়াদ আগামী বছরের ডিসেম্বর মাসে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।




