বাংলাদেশ রেলওয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় মালবাহী ওয়াগন ও যাত্রীবাহী কোচ সংস্কারে প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ ভারী ও খুচরা যন্ত্রাংশ। কারখানাটিতে অধিকাংশ যন্ত্রাংশ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও জনবল সংকট, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং প্রয়োজনীয় সময়ে কাঁচামাল না পাওয়ার কারণে প্রতি বছর টেন্ডারের মাধ্যমে দেশীয় বাজার ও বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ খুচরা ও ভারী যন্ত্রাংশ কিনতে হচ্ছে।
এতে একদিকে সরকারের রাজস্ব ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে বাইরে থেকে সরবরাহ করা যন্ত্রাংশের গুণগত মান নিয়েও রয়েছে শঙ্কা।
কারখানার বিভিন্ন শপ ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ মিলরাইট শপে ২৯টি হালকা ও ভারী মেশিন থাকলেও প্রায় সবগুলোই দীর্ঘদিন ধরে অচল। অযত্ন ও অবহেলায় মেশিনগুলোতে জমেছে ধুলাবালি, কোথাও কোথাও দেখা গেছে মাকড়সার জাল। একই চিত্র দেখা গেছে প্রোডাকশন শপ, টুলরুম শপসহ অন্যান্য শপেও।
কারখানার অন্যতম দুটি উৎপাদন শপ—প্রোডাকশন শপ ও টুলরুম শপে—মোট ১৪২টি মেশিনের মধ্যে মাত্র ৩৮টি সচল রয়েছে। বাকি মেশিনগুলো দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে।
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা সূত্র জানা গেছে, কারখানায় মোট ৭৭৯টি মেশিন রয়েছে। এর মধ্যে ৫৮২টি (৭৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ) কার্যক্ষম এবং ১৯৭টি (২৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ) অকার্যকর। তবে উৎপাদন সক্ষম অনেক মেশিন দক্ষ কারিগরের অভাব ও রক্ষণাবেক্ষণের সংকটে ব্যবহার না হওয়ায় অচল হয়ে পড়ে আছে।
কারখানার বিভিন্ন শপের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সচল ৫৮২টি মেশিন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবলের তুলনায় কারিগর রয়েছে মাত্র ১৪০ জন। দক্ষ কারিগরের অভাবে অনেক মেশিন অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে।
তারা আরও জানান, অনুমোদিত জনবল নিয়োগ করা হলে বাইরের বাজার থেকে যন্ত্রাংশ কেনার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাবে। বর্তমানে কারখানায় বহু পুরোনো ও মান্ধাতা আমলের মেশিনারিজ দিয়েই যন্ত্রাংশ উৎপাদনের কাজ চলছে।
কারখানার মেশিনগুলোর বয়স বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বর্তমানে ১ থেকে ২০ বছর বয়সী ৮২টি, ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সী ২০৭টি এবং ৫০ বছরের বেশি পুরোনো ৪৮২টি মেশিন ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ এসব মেশিন পরিচালনার জন্য মোট জনবল রয়েছে মাত্র ২০১ জন।
দক্ষ জনবল সংকটের মধ্যেও প্রতি মাসে মালবাহী ওয়াগন ও যাত্রীবাহী কোচ মিলিয়ে প্রায় ৮০টি রোলিং স্টকের সংস্কার করা হয়। এ কাজ নির্বিঘ্নে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হয় বিপুল সংখ্যক ভারী ও ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ।
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার উৎপাদন প্রকৌশলী মো. জাহিদ হাসান জানান, ২০১৬ সালের পর থেকে চীন, ভারত ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানিকৃত কোচগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ তৈরিতে আধুনিক সিএনসি মেশিন রেলওয়ে কারখানায় নেই। ফলে এসব যন্ত্রাংশ এখানে উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি দক্ষ মেশিনম্যানের সংকটও উৎপাদনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে কারখানায় প্রায় ৬৪৩ ধরনের খুচরা যন্ত্রাংশ উৎপাদন হলেও প্রতিবছর স্থানীয় বাজার থেকে প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের ২৫০ ধরনের খুচরা যন্ত্রাংশ কিনতে হয়।
এ বিষয়ে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক শাহ সুফি নূর মোহাম্মদ বলেন, কারখানায় দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকট রয়েছে। প্রয়োজনীয় সময়ে কাঁচামাল পাওয়া যায় না। এছাড়া আধুনিক সিএনসি টাইপ মেশিনের অভাব রয়েছে। এসব কারণে প্রয়োজন মেটাতে বাধ্য হয়ে টেন্ডারের মাধ্যমে কিছু খুচরা যন্ত্রাংশ কিনতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, জনবল সংকট দূর হলে এবং প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন করা গেলে বাইরের ওপর নির্ভরতা অনেকটা কমে আসবে। ব্রিটিশ আমলের অস্থায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়ার পরিবর্তে স্থায়ী নিয়োগ পদ্ধতি চালু থাকলে দক্ষ শ্রমিক পাওয়া সহজ হবে। আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন, দক্ষ জনবল নিয়োগ এবং নিয়মিত কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে রেলওয়ে কারখানায় নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাবে। এতে সরকারের ব্যয় কমবে, বিদেশি নির্ভরতা হ্রাস পাবে এবং দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই রেলওয়ে কারখানা তার পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।
আরটিভি/টিআর



