নাটোরে চাঁদা দাবি করে পাঁচটি বাড়িতে চিঠি দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। চিঠিতে একটি বিকাশ নম্বরও দেওয়া হয়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ওই নম্বরে নির্ধারিত অংকের টাকা পরিশোধ না করলে পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়।
শনিবার (১ আগষ্ট) রাতে লালপুর উপজেলার বাকনাই (পালপাড়া) গ্রামের স্বর্ণ ব্যবসায়ী নারায়ণ কুমার পালের বাড়িতে ‘সেভেন স্টার’ নামে একটি গোষ্ঠী কম্পিউটারে টাইপ করে এই খোলা চিঠিটি রেখে যায়। বিষয়টি প্রথমে নারায়ণ কুমারের ছেলে অরুণ কুমারের নজরে আসে। পরে তিনি পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের জানান।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাকনাই গ্রামের পালপাড়ায় ৫৫টি হিন্দু পরিবারের বসবাস। শনিবার রাত ১১টার দিকে নারায়ণ কুমার পালের বাড়ির বারান্দায় তার ছেলে অরুণ কুমার পাল একটি চিঠি দেখতে পান। বিষয়টি তিনি প্রথমে পরিবারের সদস্যদের জানান। এরপর দ্রুতই খবরটি প্রতিবেশীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। পরে দেখা যায়, অজামিল পাল, সুব্রত পাল, অধির পাল ও ষষ্ঠী পালের বাড়িতেও একই রকম চিঠি দেওয়া হয়েছে।
সেভেন স্টার কর্তৃপক্ষ নাম দিয়ে ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘সেভেন স্টারের পক্ষ থেকে আপনাদের সবাইকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আপনাদের বাড়িতে একটি চিঠি দিলাম, আশা করি বিকল্প চিন্তা করবেন না। মনে রাখবেন, জীবন গেলে যাবে আপনাদের পরিবারের। ভালো মনে ২০ হাজার টাকা দিয়ে দেবেন। কোনো মানুষকে জানাবেন না, যদি কেউ জানতে পারে তাহলে আপনাদের পরিবারের লাশ রাস্তায় পড়ে থাকবে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টাকা দিতে হবে, যদি টাকা দিতে না পারেন সময় খুব খারাপ যাবে। সব হিন্দু পরিবারের জন্য চিঠিটি দেওয়া হলো। এই চিঠি যে পাবেন সবাইকে বলে দিবেন আপনাদের হিন্দু ধর্মের মধ্যে (অনুসারীদের)। আপনাদের পরিবার ভালো রাখার জন্য সেভেন স্টার আপনাদের সবসময় পাশে থাকবে।’
ভুক্তভোগী নারায়ণ কুমার পাল বলেন, কে বা কারা আমার বাড়ির বারান্দায় কম্পিউটার কম্পোজ করা একটি খোলা চিঠি রেখে যায়। রাতে আমার ছেলে অরুণ কুমার পাল বারান্দায় গেলে সে প্রথমে চিঠিটি দেখতে পায়। পরে চিঠির বিষয়টি পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের জানায়। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার পর থেকে পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি।
লালপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেন, নারায়ণ কুমার পাল স্বর্ণের ব্যবসা করেন। তিনি আমাকে ফোন করে জানান, তার বাড়িতে রাতের অন্ধকারে চাঁদা চেয়ে একটি খোলা চিঠি রেখে গেছে। এ বিষয়ে তাদেরকে থানায় জিডি করার পরামর্শ দিয়েছি। আগে কখনও লালপুর ইউনিয়নে এমন ঘটনা ঘটেনি।
উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হারুনার রশিদ পাপ্পু বলেন, মোবাইলে হুমকির শিকার পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতার কথা বলেছি।
তিনি আরও বলেন, লালপুরে সব ধর্মের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করে আসছে। বিএনপি ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বলেন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব। খুব শিগগিরই আমরা আতঙ্কিত পরিবারগুলোর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করব। পাশাপাশি তাদের পাশে থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করব।
এদিকে খোলা চিঠিতে দেওয়া মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।
এ ঘটনার পর থেকে পালপাড়ার হিন্দু পরিবারগুলোর মধ্যে ভয় ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে। দ্রুত দোষী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে তারা।
লালপুর উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দীপেন্দ্রনাথ সাহা বলেন, ঘটনা শোনার পর আমি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) জানাই। ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের সঙ্গেও কথা বলি। আমরা চাই, দ্রুত তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইন-আদালতে সোপর্দ করা হোক। তা না হলে আমাদের সম্প্রদায়ের লোকজনের আতঙ্ক কাটবে না।
খবর পেয়ে শনিবার রাতেই লালপুর থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং চিঠি জব্দ করে। পুলিশ এর উৎস শনাক্ত ও জড়িত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে তদন্ত শুরু করেছে।
এ বিষয়ে লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। চিঠিটি জব্দ করা হয়েছে এবং এর উৎস অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
ওসি বলেন, চিঠিতে দেওয়া বিকাশ নম্বরটি বন্ধ রয়েছে। নম্বরটি সিলেট এলাকার। আমরা তাদের ধরার চেষ্টা করছি।
আরটিভি/আইএম



