ঢাকা মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩

সরকারি অর্থ আত্মসাত: ধরা পড়তেই ৬৮ হাজার টাকা ফেরত

মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০২৬, ১০:১৭ পিএম
ছবি : সংগৃহীত

মানিকগঞ্জের সিংগাইর পৌরসভায় সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে ধরা পড়ে পৌর রাজস্ব কোষাগারে ৬৮ হাজার টাকা ফেরত দিয়েছেন পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা বেগম ইরানি আক্তার। এ ঘটনায় তাকে শোকজ করা হয়েছে, আরটিভির হাতে আসা গোপন নথিতে এসব অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। বারবার এই নারী কর্মকর্তার অনিয়ম করে ধরা পড়লেও অদৃশ্য কারণে শুধুমাত্র শোকজ লেটারে সীমাবদ্ধ থাকে শাস্তি।

জানা গেছে, ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে সিংগাইর পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডে নতুন স্থাপনার তালিকা প্রস্তুত এবং বার্ষিক হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণের লক্ষ্যে জরিপ পরিচালনা করা হয়। প্রায় এক মাস ধরে পৌরসভার ২০ থেকে ২২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন। এ কাজে প্রত্যেকের জন্য দৈনিক ৫০০ টাকা করে ভাতা নির্ধারণ করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, জরিপকাজের বিল অনুমোদনের সময় সিংগাইর পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা ইরানি আক্তার, কর নির্ধারক মো. সোলাইমান সিদ্দিকীকে চাপ দিয়ে জোরপূর্বক কারসাজির মাধ্যমে অতিরিক্ত ৬৮ হাজার টাকার বিল সংযুক্ত করেন এবং ওই অর্থ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন। পরে বিষয়টি সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভার প্রশাসক খায়রুন্নাহার (পপি)-এর নজরে আসে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পর সংশ্লিষ্টদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হলে তারা অতিরিক্ত ৬৮ হাজার টাকার বিল করার বিষয়টি স্বীকার করেন বলে জানা গেছে। পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসকের নির্দেশে গত ৪ আগস্ট অতিরিক্ত বিলের ৬৮ হাজার টাকা সিংগাইর পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত হিসাবরক্ষক মুকুল মিয়ার মাধ্যমে পৌরসভার রাজস্ব কোষাগারে জমা দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন

৬৮ হাজার টাকা অর্থ আত্মসাৎ-এর পর ৫৫ হাজার টাকা নেন পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা ইরানি আক্তার এবং বাকি ১৩ হাজার টাকা দুইজন কর্মচারীর নামে উত্তোলন দেখানো হয় নথিতে। এই মোট ৬৮ হাজার টাকা আত্মসাত করে ফেলে ইরানি। টাকা ভাগ-বাটোয়ারার একটি গোপন নথি আসে আরটিভির এই প্রতিবেদকের কাছে। সেখানে প্রত্যেকের নামের বিপরীতে টাকার পরিমাণসহ তাদের স্বাক্ষর দেখা যায়। এছাড়াও স্বাক্ষর করে টাকা নেওয়ার মূল রেজুলেশন বই নিজের বাসায় লুকিয়ে রেখেছেন পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা ইরানি আক্তার।

তবে যাদের নামে ১৩ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে তারা কিছুই জানেন না। পৌরসভার সাবেক হিসাবরক্ষক আনিস ইতোমধ্যেই বদলি হয়ে গেছে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া পৌরসভায়, যার নামে পাঁচ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বলে নথিতে দেখানো হয় ।

পাঁচ হাজার টাকা গ্রহণ ও অতিরিক্ত বিল এটাচমেন্ট এর বিষয়ে জানতে চাইলে, হিসাব রক্ষক আনিসুর রহমান বলেন, আমি এই বিল পাস করানোর আগেই বদলি হয়ে চলে এসেছি। আর পাঁচ হাজার টাকা আমাকে সোলাইমান দিয়েছে। তবে আমি নিতে চাইনি, আমি ক্ষুব্ধ ও হয়েছি তাদের উপর এই কারণে।

বর্তমান হিসাবরক্ষকের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে রয়েছেন মো. মুকুল মিয়া। তার নামেও নথিতে ৮ হাজার টাকা উত্তোলন দেখানো হয়। ৮ হাজার টাকার প্রসঙ্গে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত হিসাব রক্ষক মুকুল বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছুই জানিনা। তবে আমি জানি ইরানি বেগম অ্যাসেসমেন্ট এর টাকা নিছে। সেটা প্রশাসক জানার পর আবার ফেরত দিছে। ওই ৮ হাজার টাকার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আর ফাইলে আগেই সাইন করা ছিল আমার। পরে যখন জানতে পারলাম এরকম তখন আমরা সবাই জানলাম সে আসলে টাকা নিছে। এ জন্য প্রশাসক তাকে শোকজ করেছে, এরপর তিনি টাকা ফেরত দিয়েছেন।

তিনি আরও জানান, ঘটনাগুলো তার দায়িত্ব গ্রহণের আগেই ঘটেছে এবং পরে তিনি জানতে পারেন তার নাম ব্যবহার করে এসব জালিয়াতি করা হয়েছে।

এর আগে, গত বছর (২০২৫) ইরানি আক্তার ও তৎকালীন কম্পিউটার অপারেটর মিলে চেয়ারম্যান সার্টিফিকেট ফি দেখিয়ে ৫০ টাকা করে আত্মসাৎ করে। যার অর্থ একসময় গিয়ে দাঁড়ায় এক লক্ষ দশ হাজার টাকা। পরবর্তীতে বিষয়টি জানাজানি হলে তৎকালীন পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ কামরুল হাসান টাকাগুলো পৌর রাজস্ব কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং তাকে শোকজ করেন।

আরও পড়ুন

আইনে বলা আছে, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ (The Prevention of Corruption Act, 1947) ৫(২) ধারা (দুর্নীতিমূলক অসদাচরণ) অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি অর্থ বা সম্পদ নিজের কিংবা অন্যের লাভের জন্য আত্মসাৎ বা অপচয় করেন, তবে সেটি এই ধারার অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড। এর পাশাপাশি অপরাধের সঙ্গে জড়িত অর্জিত অর্থ বা অবৈধ সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত (Confiscation) করার নির্দেশ দিতে পারে আদালত।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পৌরসভার নিরাপত্তা প্রহরী বলেন, আমরা হলো গ্রাম দিয়া অ্যাসেসমেন্ট এর কাজ করছি, আমাগো চুক্তি আছিল ৫০০ করে ট্যাকা দিব। আমরা কাজটা করছি কাজ করার পরে মাঝখানে একটা বিল দিলো। ফাইনাল বিল করছে সেই বিলের সময় ইরানি আক্তার সাইন করে না, সে কইতাছে আমারে ৭০হাজার ট্যাকা দেওন লাগবো। এই কইরা কইরা কমপক্ষে দুই মাস চলে গেল তাও আমাকে বিল দেয় না। সর্বশেষ চাপ দিয়া ৬৮ হাজার টাকা নেয়। পরে বিলে সাইন করে সবার টাকা দিয়া, অতিরিক্ত টাকা সে নিজের রাইখা দিছে।

তিনি আরও বলেন, এর আগেও জালিয়াতি করে এক লক্ষ দশ হাজার টাকা আত্মসাৎ করে পড়ে ধরা পড়ার পর আবার ফেরত দেয়। এই পৌরসভায় যে দুর্নীতিগুলো হচ্ছে তার কোন বিচার নাই।

সিংগাইর পৌরসভার কর নির্ধারক মো. সোলাইমান সিদ্দিকী জানান, আমাদের পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা ইরানি আক্তার ৬৮ হাজার টাকা নিজে নিয়েছেন। আগে যে একাউন্টেন্ট ছিল তাকে দিয়েছে পাঁচ হাজার টাকা বর্তমান যে একাউন্ট আছে তাকে দিয়েছে আট হাজার টাকা এবং নিজে রেখেছে ৫৫ হাজার টাকা। বিষয়টি আমি জানতে পেরে প্রশাসক স্যারের শরণাপন্ন হই। তাকে বিষয়টি বলার পর তিনি নিজে এসে হিসাব দেখলেন সত্যিই গরমিল। পরে উনি নির্দেশ দিয়ে গেলেন তিন কার্য দিবসের ভেতর টাকাগুলো জমা দিয়ে যেতে। পরে উনি দ্রুত এসে টাকাগুলো জমা দিয়ে গেছেন।

তিনি আরও বলেন, যে কয়জন লেবার আমি খাটিয়েছি তাদের মাস্টাররোল প্রস্তাব করি। পরে বিষয়টি সচিব ম্যাডামের সঙ্গে আলোচনা করি তখন তিনি আমাকে বলেন আপনার এখান থেকে আমাকে কিছু টাকা পয়সা দিতে হবে। তখন আমি বললাম আমি কীভাবে দিব এটা জানিনা, আমার যে কজন লেবার খাটছে ওই কয়জনের টাকা দিতে পারব। তারপর উনি বলল ঠিক আছে, একাউন্টসে উনি বলে দিল, বলে দেওয়ার পর তারা মাস্টার রোল বানাইছে। তারপর উনি অতিরিক্ত ৬৮ হাজার টাকা নিয়েছে।

আরও পড়ুন

এ সকল অভিযোগের বিষয়ে জানতে দুপুর সাড়ে তিনটার ৩ দিকে সিংগাইর পৌরসভায় গিয়ে ইরানি আক্তারকে অফিস টাইম চলাকালীন সময়েও পাওয়া যায়নি। এরপর তার কক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

এ বিষয়ে সাবেক সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পৌর প্রশাসক মো. কামরুল হাসান বলেন, এর আগে ইরানি আক্তারকে অর্থ আত্মসাৎ এর দায়ে শোকজ করা হয়েছিল। পরে তিনি আত্মসাৎ কৃত টাকা পৌর রাজস্ব কোষাগারে জমা দিয়েছিলেন। আর আমি বদলি হয়ে আসছি, নথি দেখা ছাড়া টাকার হিসাব সঠিকভাবে বলতে পারছি না। তবে এই বিষয়টি সবাই জানে।

বর্তমান সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পৌর প্রশাসক খায়রুন্নাহার পপি আরটিভিকে বলেন, আমাদের পৌরসভার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অ্যাসেসমেন্ট কার্যক্রম চলছিল। তার অংশ হিসেবে অ্যাসেসমেন্ট কার্যক্রম যখন শেষ হয়েছে তখন আমি অ্যাসেসমেন্ট শাখাটা পরিদর্শন করি। পরিদর্শন কালে ৬৮ হাজার টাকার একটা গরমিল পাই। পরে দেখা গেল পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মাস্টার রোল দেখিয়ে টাকা তুলে নিয়েছে। পরে উনাকে টাকাগুলো কোষাগারে জমা দিতে বলি। এখন উনাকে শোকজ করা হয়েছে। আগামী তিন কার্য দিবসের ভেতরে তিনি তার উত্তর দেবেন। পরবর্তীতে আমরা আইনি ব্যবস্থা নেব।
আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করব, কর্তৃপক্ষ যদি মনে করে তাহলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিবে বলেও জানান তিনি।

আরটিভি/এমএম

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
ভোলায় ভূমি কর্মকর্তার ঘুষ নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল
ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার সাচড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সেবা দিতে টাকা দাবি ও দরকষাকষির মাধ্যমে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা বজলুর রহমান ও তার ব্যক্তিগত সহকারী পরিচয় দেওয়া মো. রাকিবের বিরুদ্ধে।
ভোলায় ভূমি কর্মকর্তার ঘুষ নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল
মোটরসাইকেলের ধাক্কায় তিনদিন ঝোপে পড়ে ছিলেন গৃহবধূ, দুর্গন্ধে মিলল মরদেহ
জামালপুরের বকশীগঞ্জে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় সড়কের পাশের ঝোপে ছিটকে পড়ে তিনদিন নিখোঁজ ছিলেন রোজিনা আক্তার (৩০) নামে এক গৃহবধূ। সোমবার (১২ অক্টোবর) সকালে ঝোপ থেকে দুর্গন্ধ ছড়ালে তার অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মোটরসাইকেলচালক মো. সোহানকে (২০) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
মোটরসাইকেলের ধাক্কায় তিনদিন ঝোপে পড়ে ছিলেন গৃহবধূ, দুর্গন্ধে মিলল মরদেহ
প্রতিপক্ষের গুলিতে শীর্ষ সন্ত্রাসী সাহেব আলী নিহত
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে প্রতিপক্ষের গুলিতে আহত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাহেব আলী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছেন।
প্রতিপক্ষের গুলিতে শীর্ষ সন্ত্রাসী সাহেব আলী নিহত
পাগলা মসজিদের দানবাক্সে মিলল ১৭ দেশের মুদ্রাসহ ২৪ কেজি সোনা-রুপা
কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের দানবাক্সে জমা পড়েছে ১৭ দেশের মুদ্রাসহ ২৪ কেজি সোনা-রুপা। 
পাগলা মসজিদের দানবাক্সে মিলল ১৭ দেশের মুদ্রাসহ ২৪ কেজি সোনা-রুপা
নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পদ্মায় চলছে মা ইলিশ নিধন, প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে পাড়ে
সরকারি নিষেধাজ্ঞা তোয়াক্কা না করে শরীয়তপুরের জাজিরায় পদ্মা নদীতে অবাধে চলছে মা ইলিশ শিকার। শুধু শিকারই নয়, নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন পয়েন্টে প্রকাশ্যে বিক্রিও হচ্ছে এসব মাছ।
নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পদ্মায় চলছে মা ইলিশ নিধন, প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে পাড়ে
আরও পড়ুন
শ্রেণিকক্ষে অপেক্ষায় শিক্ষার্থীরা, ‘ও বন্ধু লাল গোলাপী’ গানে আনন্দ-উল্লাস করছেন শিক্ষকরা
সারের ডিলারশিপ পাননি যুবদল নেতা, বললেন ‘গুডবাই’
শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও দেশপ্রেমে সমৃদ্ধ মানুষ হতে হবে: খাদ্যমন্ত্রী
মানিকগঞ্জে ‘শেখ হাসিনার বাংলাদেশ’ লেখা ব্যানারে শিক্ষক দিবস পালন, প্রধান শিক্ষক গ্রেপ্তার