
দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়ায় প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের এই জনপদে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে, নৌকাডুবি ও আত্মহত্যাসহ নানা অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় স্বজন হারানোর শোকের সঙ্গে যুক্ত হয় মরদেহ নিয়ে ছুটে চলার আরেক দুর্ভোগ।
মঠবাড়িয়া উপজেলায় নেই ময়নাতদন্তের কোনো ব্যবস্থা। ফলে আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ময়নাতদন্তের প্রয়োজন হলে মরদেহ নিয়ে যেতে হয় প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের পিরোজপুর জেলা সদর হাসপাতালে। নদী পারাপারসহ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়েন স্বজনেরা। বৈরী আবহাওয়ায় এই দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
শুধু মঠবাড়িয়াই নয়, পিরোজপুর জেলার অন্যান্য উপজেলাতেও একই চিত্র। জেলার সাত উপজেলার বাসিন্দাদেরই অপমৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ নিয়ে যেতে হয় জেলা সদরে।
জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করছেন চয়ন লাল ডোম। তার বাবা পান্না লাল ডোম দীর্ঘদিন ওই হাসপাতালে ডোম হিসেবে কাজ করেছেন। ছয় বছর আগে তিনি অবসরে যাওয়ার পর থেকে স্বেচ্ছায় সেই দায়িত্ব পালন করে আসছেন ছেলে চয়ন।
লাশকাটা ঘরের কর্মী হিসেবে পরিচিত ‘ডোম’। মর্গের আশপাশে ডোম দেখলে অনেকেই আঁতকে ওঠেন। কেউ কেউ আবার নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকান। তবে মানুষের ভয়, কৌতূহল কিংবা বাঁকা দৃষ্টির আড়ালে ডোমদেরও রয়েছে পরিবার, স্বপ্ন ও সামাজিক পরিচয়।
জেলা হাসপাতালের ডোম চয়ন লালের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের-
আরটিভি: এই পেশায় কীভাবে এলেন?
চয়ন লাল: আমার বাবা পান্না লাল ডোম জেলা হাসপাতালের মর্গে দীর্ঘদিন ডোম হিসেবে কাজ করেছেন। বাবার সূত্র ধরেই আমি এই পেশায় এসেছি। বাবা অবসর নেওয়ার পর গত ছয় বছর ধরে আমি এখানে কাজ করছি।
আরটিভি: আপনার বাবা সম্পর্কে কিছু বলুন।
চয়ন লাল: আমার বাবা অত্যন্ত সাহসী একজন মানুষ ছিলেন। ছোটবেলা থেকে বাবার কাছেই আমার লাশ কাটার কাজের হাতেখড়ি। বাবা অবসর নেওয়ার পর এই হাসপাতালে কোনো ডোম ছিল না। তাই বাধ্য হয়েই ছয় বছর আগে থেকে স্বেচ্ছায় কাজ শুরু করি।
আরটিভি: সমাজের মানুষের সঙ্গে আপনার ও পরিবারের সদস্যদের সম্পর্ক কেমন?
চয়ন লাল: আমার সমাজ বলতে আমার পরিবারই। শহরের ছোট্ট একটি বাসা নিয়ে থাকি। মরদেহ কাটাছেঁড়ার কাজ শেষ করে বাড়িতে ফিরে যাই, আবার কর্মস্থলে চলে আসি। সমাজের অনেকেই আমাকে ঘৃণার চোখে দেখে। অনেকে বাঁকা দৃষ্টিতে তাকায়। অথচ আমিও একজন মানুষ। পরিবারের সদস্যদের কথা ভেবেই এই পেশায় থেকে গেছি। এখন মানুষের নিন্দা আর গায়ে লাগে না।
তবে আমার স্কুলপড়ুয়া মেয়েকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা হয়। স্কুলে প্রায়ই অনেক ছাত্র তাদের ‘ডোমের সন্তান’ বলে কটাক্ষ করে। আমার সন্তানরা জীবনে যা-ই হোক, অন্তত আমি চাই না তারা ডোম হিসেবে পরিচিত হোক।
আরটিভি: সরকারি সুযোগ-সুবিধা কেমন পাচ্ছেন?
চয়ন লাল: আমার কোনো সরকারি বেতন নেই। বাবা অবসরে যাওয়ার পর থেকে আমি স্বেচ্ছায় এই কাজ করে যাচ্ছি। কেউ খুশি হয়ে ৫০০ বা ১ হাজার টাকা দিলে, সেটাই নিয়ে সংসার চালাতে হয়। আমাদের সরকারি করার কথা বলা হলেও তা আর হয়নি। বাবার যে পদটি ছিল, সেটিও এখন শূন্য রয়েছে। সেখানে আমাকে নিয়োগ দিলে আমি নিয়মিতভাবে কাজ করতে পারতাম। সংসারের খরচ ও সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে আমাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়। লাশের স্বজনরা যে টাকা দিয়ে যান, সেটি দিয়ে সুই-সুতা, সাবানসহ প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে হয়। এরপর অল্প কিছু টাকা বাঁচে, সেটি দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে।
সন্তানরা যত বড় হচ্ছে, দুশ্চিন্তাও তত বাড়ছে। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সব সময় চিন্তায় থাকি। পরিবারে আর কারও চাকরি নেই। মাঝে মাঝে বড় ভাই আমাকে সহযোগিতা করেন।
আরটিভি: মরদেহ কাটাছেঁড়া করতে ভয় লাগে?
চয়ন লাল: চাকরির প্রথম দিকে খুব ভয় লাগত। একসময় রাতে ঠিকমতো ঘুমাতেও পারতাম না। মরদেহগুলোর ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠত। তবে এখন আর লাশ দেখে ভয় লাগে না। গত ছয় বছরে কতগুলো মরদেহ কাটাছেঁড়া করেছি, তার হিসাব নেই।
কোনো মাসে ৮ থেকে ১০টি মরদেহ কাটতে হয়েছে, আবার কোনো মাসে একটিও কাটতে হয়নি। অনেক মরদেহ অর্ধগলিত থাকে। নিহতের স্বজনেরাও নাকে-মুখে কাপড় দেন। কিন্তু আমি মুখ ঢাকতে পারি না।
আরটিভি: সরকারের কাছে আপনার কিছু চাওয়ার আছে?
চয়ন লাল: আমার চাকরিটা স্থায়ী করলে সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে সুবিধা হতো। সেই সঙ্গে ভাতা, বোনাস ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পেলে অভাব-অনটন কিছুটা হলেও ঘুচত।
এ ছাড়া ‘ডোম’ নামটা শুনলে অনেকেই ঘৃণার চোখে দেখেন। এই নামটি পরিবর্তন করা হলে সমাজের মানুষের কাছে কিছুটা হলেও মূল্যায়ন পেতাম।
আরটিভি/এমএ




