ঢাকা বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩

ছয় বছর ধরে স্বেচ্ছাশ্রমে মর্গে চয়ন, সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায় 

মঠবাড়িয়া (পিরোজপুর) প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৩ এএম

দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়ায় প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের এই জনপদে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে, নৌকাডুবি ও আত্মহত্যাসহ নানা অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় স্বজন হারানোর শোকের সঙ্গে যুক্ত হয় মরদেহ নিয়ে ছুটে চলার আরেক দুর্ভোগ।

মঠবাড়িয়া উপজেলায় নেই ময়নাতদন্তের কোনো ব্যবস্থা। ফলে আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ময়নাতদন্তের প্রয়োজন হলে মরদেহ নিয়ে যেতে হয় প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের পিরোজপুর জেলা সদর হাসপাতালে। নদী পারাপারসহ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়েন স্বজনেরা। বৈরী আবহাওয়ায় এই দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।

শুধু মঠবাড়িয়াই নয়, পিরোজপুর জেলার অন্যান্য উপজেলাতেও একই চিত্র। জেলার সাত উপজেলার বাসিন্দাদেরই অপমৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ নিয়ে যেতে হয় জেলা সদরে।

জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করছেন চয়ন লাল ডোম। তার বাবা পান্না লাল ডোম দীর্ঘদিন ওই হাসপাতালে ডোম হিসেবে কাজ করেছেন। ছয় বছর আগে তিনি অবসরে যাওয়ার পর থেকে স্বেচ্ছায় সেই দায়িত্ব পালন করে আসছেন ছেলে চয়ন।

লাশকাটা ঘরের কর্মী হিসেবে পরিচিত ‘ডোম’। মর্গের আশপাশে ডোম দেখলে অনেকেই আঁতকে ওঠেন। কেউ কেউ আবার নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকান। তবে মানুষের ভয়, কৌতূহল কিংবা বাঁকা দৃষ্টির আড়ালে ডোমদেরও রয়েছে পরিবার, স্বপ্ন ও সামাজিক পরিচয়।

জেলা হাসপাতালের ডোম চয়ন লালের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের-

আরটিভি: এই পেশায় কীভাবে এলেন?

চয়ন লাল: আমার বাবা পান্না লাল ডোম জেলা হাসপাতালের মর্গে দীর্ঘদিন ডোম হিসেবে কাজ করেছেন। বাবার সূত্র ধরেই আমি এই পেশায় এসেছি। বাবা অবসর নেওয়ার পর গত ছয় বছর ধরে আমি এখানে কাজ করছি।

আরটিভি: আপনার বাবা সম্পর্কে কিছু বলুন।

চয়ন লাল: আমার বাবা অত্যন্ত সাহসী একজন মানুষ ছিলেন। ছোটবেলা থেকে বাবার কাছেই আমার লাশ কাটার কাজের হাতেখড়ি। বাবা অবসর নেওয়ার পর এই হাসপাতালে কোনো ডোম ছিল না। তাই বাধ্য হয়েই ছয় বছর আগে থেকে স্বেচ্ছায় কাজ শুরু করি।

আরটিভি: সমাজের মানুষের সঙ্গে আপনার ও পরিবারের সদস্যদের সম্পর্ক কেমন?

চয়ন লাল: আমার সমাজ বলতে আমার পরিবারই। শহরের ছোট্ট একটি বাসা নিয়ে থাকি। মরদেহ কাটাছেঁড়ার কাজ শেষ করে বাড়িতে ফিরে যাই, আবার কর্মস্থলে চলে আসি। সমাজের অনেকেই আমাকে ঘৃণার চোখে দেখে। অনেকে বাঁকা দৃষ্টিতে তাকায়। অথচ আমিও একজন মানুষ। পরিবারের সদস্যদের কথা ভেবেই এই পেশায় থেকে গেছি। এখন মানুষের নিন্দা আর গায়ে লাগে না।

তবে আমার স্কুলপড়ুয়া মেয়েকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা হয়। স্কুলে প্রায়ই অনেক ছাত্র তাদের ‘ডোমের সন্তান’ বলে কটাক্ষ করে। আমার সন্তানরা জীবনে যা-ই হোক, অন্তত আমি চাই না তারা ডোম হিসেবে পরিচিত হোক।

আরটিভি: সরকারি সুযোগ-সুবিধা কেমন পাচ্ছেন?

চয়ন লাল: আমার কোনো সরকারি বেতন নেই। বাবা অবসরে যাওয়ার পর থেকে আমি স্বেচ্ছায় এই কাজ করে যাচ্ছি। কেউ খুশি হয়ে ৫০০ বা ১ হাজার টাকা দিলে, সেটাই নিয়ে সংসার চালাতে হয়। আমাদের সরকারি করার কথা বলা হলেও তা আর হয়নি। বাবার যে পদটি ছিল, সেটিও এখন শূন্য রয়েছে। সেখানে আমাকে নিয়োগ দিলে আমি নিয়মিতভাবে কাজ করতে পারতাম। সংসারের খরচ ও সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে আমাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়। লাশের স্বজনরা যে টাকা দিয়ে যান, সেটি দিয়ে সুই-সুতা, সাবানসহ প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে হয়। এরপর অল্প কিছু টাকা বাঁচে, সেটি দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে।

সন্তানরা যত বড় হচ্ছে, দুশ্চিন্তাও তত বাড়ছে। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সব সময় চিন্তায় থাকি। পরিবারে আর কারও চাকরি নেই। মাঝে মাঝে বড় ভাই আমাকে সহযোগিতা করেন।

আরটিভি: মরদেহ কাটাছেঁড়া করতে ভয় লাগে?

চয়ন লাল: চাকরির প্রথম দিকে খুব ভয় লাগত। একসময় রাতে ঠিকমতো ঘুমাতেও পারতাম না। মরদেহগুলোর ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠত। তবে এখন আর লাশ দেখে ভয় লাগে না। গত ছয় বছরে কতগুলো মরদেহ কাটাছেঁড়া করেছি, তার হিসাব নেই।

কোনো মাসে ৮ থেকে ১০টি মরদেহ কাটতে হয়েছে, আবার কোনো মাসে একটিও কাটতে হয়নি। অনেক মরদেহ অর্ধগলিত থাকে। নিহতের স্বজনেরাও নাকে-মুখে কাপড় দেন। কিন্তু আমি মুখ ঢাকতে পারি না।

আরটিভি: সরকারের কাছে আপনার কিছু চাওয়ার আছে?

চয়ন লাল: আমার চাকরিটা স্থায়ী করলে সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে সুবিধা হতো। সেই সঙ্গে ভাতা, বোনাস ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পেলে অভাব-অনটন কিছুটা হলেও ঘুচত।

এ ছাড়া ‘ডোম’ নামটা শুনলে অনেকেই ঘৃণার চোখে দেখেন। এই নামটি পরিবর্তন করা হলে সমাজের মানুষের কাছে কিছুটা হলেও মূল্যায়ন পেতাম।

আরটিভি/এমএ

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
কিশোরীকে উত্ত্যক্ত করাকে কেন্দ্র করে তুমুল মারামারি, পুলিশ মোতায়েন
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে এক কিশোরীকে উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় তার পরিবারের লোকজনের ওপর হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে রাকিব নামে এক যুবক ও তার স্বজনদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
কিশোরীকে উত্ত্যক্ত করাকে কেন্দ্র করে তুমুল মারামারি, পুলিশ মোতায়েন
আমনের মাঠে ইঁদুরের হানা, কৃষকের স্বপ্নে দুশ্চিন্তার ছায়া
সবুজে মোড়ানো মাঠ। বাতাসে দুলছে আমন ধানের গাছ। ধানগাছে শীষ আসার অপেক্ষায় বুক বেঁধেছেন কৃষক। সেচ, সার, শ্রম আর পরিচর্যায় গড়ে তোলা সেই স্বপ্নের ফসল ঘরে তোলার দিন গুনছেন তারা।
আমনের মাঠে ইঁদুরের হানা, কৃষকের স্বপ্নে দুশ্চিন্তার ছায়া
চুল কাটার টাকা নিয়ে দ্বন্দ্ব থেকে সেলুন ব্যবসায়ীকে ছুরিকাঘাত, অতঃপর...
ময়মনসিংহের ভালুকায় বাকিতে চুল কেটে না দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে রবেন্দ্র ঋষি (৪৩) নামে এক সেলুন ব্যবসায়ীকে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ উঠেছে সাদ্দাম হোসেন নামে এক বখাটের বিরুদ্ধে। 
চুল কাটার টাকা নিয়ে দ্বন্দ্ব থেকে সেলুন ব্যবসায়ীকে ছুরিকাঘাত, অতঃপর...
মায়ের ঠাঁই জীর্ণ ঘরে, শিক্ষক ছেলে ব্যস্ত বিলাসে!
কুড়িগ্রামের রাজারহাটে জমি লিখে না দেওয়ায় ৮০ বছরের বৃদ্ধ মাকে বাড়িছাড়া করার অভিযোগ উঠেছে নিজ সন্তান ও এক মাদরাসা ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে। 
মায়ের ঠাঁই জীর্ণ ঘরে, শিক্ষক ছেলে ব্যস্ত বিলাসে!
খুলনায় এবার বিএনপি নেতাকে গুলি
খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলায় অহিদুল ইসলাম বাদল (৩৫) নামে যুবদলের এক সাবেক নেতাকে গুলি করেছে দুর্বৃত্তরা। তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান স্থানীয় লোকজন।  মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টার দিকে উপজেলার জলমা ইউনিয়নের চক্রাখালী বাজারসংলগ্ন বাদশার দোকানের সামনে এ ঘটনা ঘটে। বাদল বটিয়াঘাটা উপজেলার তেঁতুলতলা গ্রামের আলতাফ হাওলাদারের ছেলে। তিনি জলমা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক সভাপতি। এ ছাড়া তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি পদপ্রার্থী। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে মোটরসাইকেলে করে আসা অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তরা বাদশার দোকানের সামনে বাদলকে গুলি করে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। খুলনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবির সিদ্দিকী শুভ্র জানান, খবর পেয়ে বটিয়াঘাটা থানা-পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চলছে। তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনে গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এর আগে, বেলা ১১টার পর নগরীর নিরালা আবাসিক এলাকায় এক সিগারেট কোম্পানির কর্মীকে গুলি করে তার ল্যাপটপসহ ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা। গুলিবিদ্ধ সালমান নগরীর নিরালা আবাসিক এলাকার সবুজবাগের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলমের ছেলে। তিনি ক্যামেল সিগারেট কোম্পানিতে কর্মরত। আরটিভি/এসআর
খুলনায় এবার বিএনপি নেতাকে গুলি
আরও পড়ুন
নামে ডিজিটাল হলেও বাস্তবে ময়লার ভাগাড় মঠবাড়িয়া টিএন্ডটি কার্যালয়
সাপে কাটা কৃষককে ওঝার বাড়িতে নিয়ে ঝাড়ফুঁক, অতঃপর...
দেশ ছেড়ে কেন প্রতিবেশী দেশে যাবেন, এ মাটিই আপনাদের: বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার
লালশাড়িতেই হারিয়ে যাচ্ছে ‘দৌড়ে বেড়ানো’ শৈশব!