
একপ্রান্তে দেশের সর্বউত্তরের সীমান্তবর্তী এলাকা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা, অন্য প্রান্তে দক্ষিণের কক্সবাজারের টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ। মাঝখানে পেরোতে হয়েছে একের পর এক জেলা, দীর্ঘ সড়ক আর নানা প্রতিকূলতা। সেই পথ কোনো যানবাহনে নয়, পায়ে হেঁটেই পাড়ি দিয়েছেন মানিকগঞ্জের দুই যুবক।
মাত্র ২৮ দিনে প্রায় ৯৫৬ কিলোমিটার পথ হেঁটে তারা পৌঁছেছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। এই দীর্ঘ যাত্রায় অতিক্রম করেছেন ১৬টি জেলা। ব্যতিক্রমী এই ভ্রমণে তাদের সঙ্গী ছিল কখনো ক্লান্তি, কখনো শারীরিক অসুস্থতা, আবার কখনো রাতে থাকার জায়গা নিয়ে অনিশ্চয়তা। তবুও কোনো কিছুই তাদের থামাতে পারেনি।
এই দুই তরুণ হলেন মানিকগঞ্জ সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের গণিত বিভাগের অনার্স শেষ করা শিক্ষার্থী আব্দুল আহাদ হৃদয় এবং একই কলেজের অর্থনীতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. রুবাই হাসান।
গত ৯ আগস্ট দুপুরে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট থেকে শুরু হয় তাদের যাত্রা। লক্ষ্য ছিল পায়ে হেঁটে দেশের সর্বউত্তরের এই প্রান্ত থেকে সর্বদক্ষিণের টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ জিরো পয়েন্টে পৌঁছানো। দীর্ঘ ২৮ দিনের পথচলা শেষে গত ৭ সেপ্টেম্বর তারা পৌঁছান গন্তব্যে।
তাদের এই যাত্রার উদ্দেশ্য ছিল শুধু দূরত্ব অতিক্রম করা নয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের জীবনযাপন কাছ থেকে দেখা, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং নতুন জায়গা সম্পর্কে জানার আগ্রহ থেকেই এমন পরিকল্পনা করেন তারা।
তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের পথ ছিল সহজ নয়। প্রতিদিন দীর্ঘ সময় হাঁটতে গিয়ে পায়ে ব্যথা ও ক্লান্তির পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যায় পড়তে হয়েছে। এর সঙ্গে ছিল রাতে থাকার জায়গা খুঁজে পাওয়ার চ্যালেঞ্জ। কোনো রাতে মসজিদে থেকেছেন, আবার কোনো রাতে পুলিশের সহায়তায় থানায় আশ্রয় নিতে হয়েছে। পথ চলতে গিয়ে শুনতে হয়েছে নানা কটু কথাও।
এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও গন্তব্যে পৌঁছানোর লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি তারা।
সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের গণিত বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী আব্দুল আহাদ হৃদয় বলেন, আমরা ৯ আগস্ট দুপুরে বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট থেকে যাত্রা শুরু করি। প্রথমদিকে বেশ ভালোই যাচ্ছিল। পরবর্তীতে রাতে থাকা নিয়ে সমস্যা হয়েছে। একদিন ছিলাম মসজিদে, অন্যদিন একটি থানায় গিয়ে পুলিশের সহায়তায় আশ্রয় পেয়েছি। পথিমধ্যে বিভিন্ন রকমের শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও পড়তে হয়েছে। এর আগেও আমি ৪৯টি জেলা ভ্রমণ করেছি।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পেছনে তাদের ব্যক্তিগত আগ্রহও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ভ্রমণের মাধ্যমে শুধু নতুন স্থান দেখা নয়, বরং দেশের মানুষ ও জনপদকে কাছ থেকে জানার সুযোগ তৈরি করতেই তারা এমন ব্যতিক্রমী পথ বেছে নেন।
সরকারি দেবেন্দ্র কলেজের অর্থনীতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. রুবাই হাসান বলেন, আমার মূলত বিভিন্ন হবিস বা শখ এক্সপ্লোর করার নেশা। যার জন্য হচ্ছে বর্তমানে এই ঘোরাফেরার প্রতি প্যাশন কাজ করছে। যার পরিচয় হয়েছে বড় ভাই হৃদয়ের মাধ্যমে। ভাই বলল চল কোথাও থেকে ঘুরে আসি। সবাই তো ঘুরাফেরা করে, আমরা একটা এক্সট্রিম কিছু করার প্ল্যান করলাম। যেটা সবাই করে না। সেইখান থেকে ক্রস কান্ট্রির আইডিয়া টা মাথা আসে। ক্রস কান্ট্রির একটা বিষয় হচ্ছে মানুষ ও জনপদকে একদম ভেতর থেকে জানা যায়। সেই জানার আগ্রহ থেকেই আমার এবং ভাইয়ের একসাথে ক্রস কান্ট্রি ভ্রমণ শুরু করা।
আব্দুল আহাদ হৃদয় ও মো. রুবাই হাসানের এই যাত্রার পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের ভ্রমণপ্রীতি। বিশেষ করে আহাদ হৃদয় এর আগেও দেশের ৪৯টি জেলা ভ্রমণ করেছেন। এবার ছোট ভাই ও সহপাঠী রুবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পায়ে হেঁটে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন তিনি।
এই দীর্ঘ যাত্রায় তাদের প্রতিদিনের খরচও নিজেদের বহন করতে হয়েছে। পুরো যাত্রায় জনপ্রতি প্রায় ২০ হাজার টাকা করে খরচ হয়েছে। শুরুতে পরিবারের পক্ষ থেকে খুব একটা উৎসাহ না থাকলেও শেষ পর্যন্ত সফলভাবে যাত্রা শেষ করে বাড়ি ফেরায় পরিবারের সদস্যরা আনন্দিত হন।
আব্দুল আহাদ হৃদয়ের পরিবার থেকেও এই যাত্রায় সহযোগিতা ছিল বলে জানান তিনি।
আব্দুল আহাদ হৃদয় আরও বলেন, মানুষের জীবনযাপনকে কাছ থেকে দেখা এবং নতুন মানুষ ও নতুন স্থান সম্পর্কে জানার আগ্রহ থেকেই এমন যাত্রার চিন্তা আসে। বাবা ভ্রমণপ্রিয় হওয়ায় পরিবার থেকেও তিনি সহযোগিতা পেয়েছেন। সেই সমর্থন দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সাহস দিয়েছে।
তাদের এই ব্যতিক্রমী যাত্রার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বন্ধু, সহপাঠী ও স্থানীয়দের মধ্যেও তৈরি হয়েছে আগ্রহ। মাত্র ২৮ দিনে পায়ে হেঁটে ৯৫৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়াকে তারা দেখছেন ভিন্নধর্মী এক অভিজ্ঞতা হিসেবে।
দেবেন্দ্র কলেজের শিক্ষার্থী দীপক বলেন, তাদের এই অর্জন তরুণ যুবকদের অনুপ্রেরণা জোগাবে। আজকালকার ছেলেমেয়েরা বেশি একটা হাঁটতে পছন্দ করে না। তাদের এই অর্জনের মাধ্যমে তরুণ সমাজের কাছে নতুন একটি বার্তা বহন করবে।
মো. রুবাই হাসানের সহপাঠী সাদিয়া বলেন, আমার বন্ধু এবং বড় ভাই হৃদয় আমাদের সার্কেলে এই দুইজন ভ্রমণ করতে পছন্দ করে। ওরা আগে থেকেই অনেক জেলা ভ্রমণ করেছে। আমরা খুবই প্রাউড ফিল করছি, আমাদের দুজন বন্ধু তারা কিন্তু অনেক বড় চ্যালেঞ্জ নিয়েছিল, এবং তারা সেটা ভালোভাবে ওভারকাম করতে পেরেছে। তাদের জন্য অনেক অনেক শুভকামনা।
বাংলাবান্ধা থেকে টেকনাফ-দীর্ঘ এই পথচলায় তারা শুধু একটি দূরত্বই অতিক্রম করেননি; পথে দেখেছেন দেশের নানা প্রান্তের মানুষের জীবনযাপন, পরিচিত হয়েছেন নতুন মানুষের সঙ্গে, পেয়েছেন নানা ধরনের অভিজ্ঞতা।
কখনো শারীরিক কষ্ট, কখনো থাকার অনিশ্চয়তা, আবার কখনো মানুষের কটু কথার মধ্যেও হাঁটা থামাননি মানিকগঞ্জের এই দুই যুবক। শেষ পর্যন্ত ২৮ দিনের সেই পথচলা শেষ হয়েছে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ জিরো পয়েন্টে গিয়ে।
আর তাদের কাছে ৯৫৬ কিলোমিটারের এই যাত্রা হয়ে থাকল দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তকে পায়ে হেঁটে দেখার এক ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা।
আরটিভি/এমএইচজে


