
অনলাইন বেটিং ও জুয়ার মাধ্যমে সংগ্রহ করা অর্থ মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) ও ব্যাংক হিসাবে জমা করে পরে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তরের মাধ্যমে বিদেশে পাচারের অভিযোগে সংঘবদ্ধ চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) পাবনার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন, পাবনা সদর উপজেলার ঈদগাহ রোড বাইলেন এলাকার মো. মনোয়ার হোসেন (৪১), রামচন্দ্রপুরের মো. মারুফ হোসেন হলি (২৭) এবং সাঁথিয়া উপজেলার বনগ্রাম এলাকার মো. ইলিয়াস হোসেন রাজু (২৬)।
সিআইডি জানায়, গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও সিমকার্ড জব্দ করা হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে আতাইকুলা থানার বনগ্রাম বাজার এলাকা থেকে ইলিয়াস হোসেন রাজুকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে সাঁথিয়া থানার কাশিনাথপুর বাজার এলাকা থেকে মনোয়ার হোসেন ও মারুফ হোসেন হলিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ জানান, নিয়মিত সাইবার মনিটরিংয়ের সময় দেশে ও বিদেশে অবস্থানকারী একটি সংঘবদ্ধ চক্রের অনলাইন বেটিং ও জুয়া পরিচালনার তথ্য পাওয়া যায়। চক্রটি বিভিন্ন সময়ে নতুন নতুন নামে ওয়েবসাইট খুলে বেটিং ও জুয়ার কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। এসব ওয়েবসাইটের বিজ্ঞাপন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও প্রচার করা হতো।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলাকে কেন্দ্র করে টাকার বিনিময়ে বেটিংয়ের আয়োজন করত চক্রটি। জুয়ায় অংশ নিতে ব্যবহারকারীদের প্রথমে নির্দিষ্ট মাধ্যমে টাকা জমা বা ‘টপ-আপ’ করতে হতো। এজন্য বিভিন্ন এমএফএস, ব্যাংক হিসাব ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ জমার নির্দেশনা দেওয়া হতো।
সিআইডির প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, বেটিং সাইটে টাকা জমা ও উত্তোলনের জন্য ব্যবহৃত এমএফএস এজেন্ট নম্বর ও ব্যাংক হিসাব নিয়মিত পরিবর্তন করা হতো। এজন্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় এজেন্ট নিয়োগ করে তাদের কাছ থেকে একাধিক এমএফএস নম্বর ও ব্যাংক হিসাব সংগ্রহ করত চক্রটি।
পরে টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমে এসব হিসাব ও নম্বরের তথ্য বেটিং সাইট পরিচালনাকারীদের কাছে পাঠানো হতো। এরপর ওই হিসাবগুলো ব্যবহার করে বেটিংয়ের অর্থ লেনদেন করা হতো।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধ ই-ট্রানজেকশনের মাধ্যমে আসা অর্থ এসব এজেন্টের মাধ্যমে একত্র করা হতো। এজেন্টরা কমিশন রেখে বাকি অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করত। পরে সেই অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে বিদেশে পাচার করা হতো বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পেয়েছে সিআইডি।
সিআইডির দাবি, এভাবে অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে পাচার করা হয়ে থাকতে পারে।
এ ঘটনায় সিআইডি বাদী হয়ে গত ১৯ মে পল্টন থানায় মামলা করে। মামলায় সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ২০(২), ২১(২), ২৪(২) ও ২৭(২) ধারা উল্লেখ করা হয়েছে।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার ছুফি উল্লাহ জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা অনলাইন বেটিং চক্রের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা এবং জুয়ার টাকা সংগ্রহের বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন। তবে কী পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে, অর্থপাচারের পুরো প্রক্রিয়া এবং দেশের বাইরে অর্থ পাঠানোর সঙ্গে কারা জড়িত এসব বিষয় যাচাই করা হচ্ছে।
অনলাইন বেটিংয়ের সঙ্গে জড়িত দেশি-বিদেশি ব্যক্তি ও চক্রের সদস্যদের শনাক্ত, অবৈধ ই-ট্রানজেকশন ও অর্থপাচারের প্রকৃত পরিমাণ ও পদ্ধতি উদঘাটন এবং অন্য সহযোগীদের গ্রেপ্তারে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।
সংস্থাটি বলছে, অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের অবৈধ লেনদেন, অর্থপাচার এবং এর সঙ্গে জড়িত দেশি-বিদেশি চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্টের ২০২৫ সালের ২৮ মে জারি করা নির্দেশনায় অনলাইন জুয়ার কার্যক্রম বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এরপরও সংঘবদ্ধ চক্রটি অবৈধ অনলাইন বেটিং ও আর্থিক লেনদেন চালিয়ে আসছিল বলে সিআইডির তদন্তে উঠে এসেছে।
অনলাইন জুয়া ও বেটিং থেকে বিরত থাকতে সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সিআইডি। একই সঙ্গে এ ধরনের কার্যক্রমে অর্থ লেনদেন না করার এবং অনলাইন জুয়া বা অর্থপাচার সম্পর্কে কোনো তথ্য থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর অনুরোধ করেছে সংস্থাটি।
আরটিভি/এসকে


