
রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডিএনএ মিলেছে ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন আলামতে। খেজুরের বিচিতে মুগ্ধ দাসের, শসার টুকরায় সিদ্ধার্থ দাসের এবং বিড়ির শেষাংশে দুজনেরই ডিএনএ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর গলায় প্যাঁচানো গামছায় শুধু মুগ্ধ দাসের ডিএনএ শনাক্ত হয়েছে।
রোববার (১১ অক্টোবর) দুপুরে রংপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিদর্শক জিন্নাত আলী এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, ঢাকার অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা শেষে গত বৃহস্পতিবার ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। এর আগে গত ৩১ আগস্ট ও ১ সেপ্টেম্বর ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা ৩১ ধরনের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। এসব নমুনার মধ্যে ছিল খেজুরের বিচি, শসার অংশবিশেষ, ফল কাটার ছুরি, ইয়াবা সেবনের ফয়েল, সিগারেটের শেষাংশ, বেসিনের দাগ এবং দুই আসামির রক্তের নমুনা।
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন, উদ্ধার হওয়া আলামত, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং সাক্ষীদের বক্তব্য বিশ্লেষণে হত্যাকাণ্ডে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থলে নিহত চারজন ও এই দুই আসামি ছাড়া অন্য কারও উপস্থিতির প্রমাণ ডিএনএ পরীক্ষায় মেলেনি।
তদন্ত কর্মকর্তা জিন্নাত আলী জানান, গণপতি চক্রবর্তীকে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দুজন মিলে হত্যা করেন। তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তীকে হত্যা করেন মুগ্ধ দাস। তাদের কলেজপড়ুয়া মেয়ে আগামী চক্রবর্তীকে হত্যা করেন সিদ্ধার্থ দাস। আর ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকে হত্যা করেন দুই আসামি মিলে।
তিনি আরও জানান, চার হত্যাকাণ্ডের পর গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী ও মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ ছিল। বিষয়টি নিশ্চিত হতে মা-মেয়ের ভ্যাজাইনাল সোয়াবের নমুনা ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। তবে পরীক্ষার প্রতিবেদনে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।
হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে জিন্নাত আলী বলেন, আসামিরা খবর পেয়েছিলেন, অবসরের পর পাওয়া ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা ব্যাংক থেকে তুলে বাড়িতে রেখেছেন গণপতি চক্রবর্তী। এ ছাড়া বাড়িতে অনেক স্বর্ণালংকার রয়েছে বলেও তাদের ধারণা ছিল। মূলত চুরির উদ্দেশ্যে বাড়ির ছাদ দিয়ে প্রবেশ করে তারা পরিবারের সদস্যদের একে একে হত্যা করেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জানান, আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন এলাকার শান্ত দাস, সীমান্ত দাস, দুলাল শর্মা ও কেন্দ্রীয় মহাশ্মশানের কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ দাস। এ ছাড়া পুলিশের কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন ৫৬ জন। আদালতে আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিসহ এসব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডে প্রত্যেকের ভূমিকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, মামলাটির তদন্ত ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে দুই আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।
এর আগে গত ২২ আগস্ট রাতে রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় নিজ বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী এবং তাদের দুই সন্তান আগামী ও আয়ুশের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় ২৩ আগস্ট নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে রংপুর নগরের কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। পরে গণপতি চক্রবর্তীর প্রতিবেশী সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন তারা।
মামলাটি প্রথমে কোতোয়ালি থানা-পুলিশ তদন্ত করলেও পরে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় মহানগর ডিবি পুলিশকে।
গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন। তার মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছিলেন। ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। নির্মাণাধীন তিনতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় বসবাস করত পরিবারটি।
আরটিভি/এসকে


