
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও রাজবাড়ীর পদ্মায় ইলিশ শিকার চলতে থাকায় প্রশ্ন উঠেছে অভিযান কতটা কার্যকর হচ্ছে, আর প্রকৃত জেলেদের সহায়তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে কি না।
সাধরনত মৎস্য বিভাগ সকালে বা ভোররাতে পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় নদীতে অভিযানে নামছে। এতসব আয়োজনের পরও রাজবাড়ীর পদ্মার ডিমওয়ালা মা ইলিশ শিকার ঠেকানো যাচ্ছে না।
প্রকৃত জেলে ছাড়াও মৌসুমী জেলেরাও নিষেদ্ধার সময় ইলিশ মাছ বিনা বাঁধায় সাগর থেকে মিঠা পানির পদ্মায় চলে আসে বিধায় এ সময় মাছও বেশি পাওয়া যায়। তাই অনেকে শ্রমিকরাও অন্যান্য কাজ বাদ দিয়ে ২২ দিন মাছ ধরেত নদী চলে যায়।
অভিযান চলছে, তবু থামছে না ইলিশ শিকার
ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন নদীতে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ। এ সময় মাছ পরিবহন, মজুদ, বাজারজাতকরণ, কেনাবেচা ও বিনিময়ও নিষিদ্ধ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ।
তবে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই রাজবাড়ীর পদ্মা নদীতে শত শত নৌকায় ইলিশ শিকারের অভিযোগ রয়েছে। জেলেরা জাল ফেলে কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর তা তুলে মাছ নিয়ে নদীর পাড়ে আসছেন। সেখানে জাল গোছানোর পাশাপাশি চলছে মাছ বিক্রি। বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারাও আসছেন মাছ কিনতে। প্রশাসনকে ফাঁকি দিয়ে অনেকটা চোর- পুলিশ খেলার মত করে চলছে ইলিশ শিকার।
এদিকে সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কথা বলছে মৎস্য বিভাগ। রাজবাড়ী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুব উল হক বলেন, নদীতে সার্বক্ষণিক পাহারা দেওয়ার মতো সক্ষমতা তাদের নেই। তবে প্রতিদিন সকাল, দুপুর, বিকেল বা সন্ধ্যায় অভিযান চালানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, যখন আমাদের টিম নদীতে থাকছে না, তখন হয়তো জেলেরা নামছে। তারপরও অভিযান সফল করতে সাধ্যমতো চেষ্টা করছি।
প্রকাশ্যে মাছ ধরা ও বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, বিষয়টি তিনি শুনেছেন। তবে এসব কার্যক্রম নদীর পাড়ের চর এলাকায় হচ্ছে বলে জানান তিনি। সেখানে নৌ-পুলিশসহ প্রশাসন অভিযান চালিয়েছে এবং অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
রাজবাড়ীর বরাট এলাকার প্রকৃত জেলে মফিজুদ্দিন
দুটি মাছ ধরার নৌকা আছে। অথচ জেলে কার্ড নেই, মেলে না সরকারি সহায়তাও। অন্যদিকে সংসারের খরচ থেমে নেই। তাই মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চললেও জীবিকার তাগিদে পদ্মা নদীতে নামতে হচ্ছে তাকে। প্রশাসনের টহল এড়িয়ে জাল ফেলছেন, মাছ ধরছেন, আবার অভিযান আসার খবর পেলে ফিরছেন তীরে।
মফিজ উদ্দিন বলেন, আমার দুটি মাছ ধরার নৌকা থাকার পরও জেলে কার্ড পাইনি। কিন্তু সহায়তা পায় ভ্যানচালক-কৃষক, যারা কোনো মাছ ধরে নাই। তাহলে সরকারের দেওয়া অবরোধ কীভাবে মানব? সংসার আছে তো। সেখানে তো কোনো অবরোধ চলে না। আর অন্য কোনো কাজও জানি না। ফলে বাধ্য হয়েই নদীতে নামছি। সরকার সব ধরনের সহযোগিতা করুক, তারপর আর নদীতে নামব না।
মফিজউদ্দিন জানান, শুক্রবার সকাল থেকে দুপুরের পর পর্যন্ত তিনবার নদীতে জাল ফেলে প্রায় এক কেজি মাছ পেয়েছেন। মাঝে মাঝে প্রশাসন এসে ধাওয়া দেয় বলেও জানান তিনি।
জেলেদের ভাষ্য, প্রশাসনের দল নদীতে নামলে তারা খবর পেয়ে তীরে চলে আসেন। অভিযান শেষ হলে আবার নৌকা নিয়ে নদীতে নামেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নৌকায়ও ইলিশ ধরা হচ্ছে। তবে মৎস্য বিভাগ বলছে, জনবল ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা থাকলেও নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও পদ্মায় ইলিশ শিকার চলতে থাকায় প্রশ্ন উঠেছে অভিযান কতটা কার্যকর হচ্ছে, আর প্রকৃত জেলেদের সহায়তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে কি না।
অভিযান চলছে, তবু থামছে না ইলিশ শিকার
ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন নদীতে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ। এ সময় মাছ পরিবহন, মজুদ, বাজারজাতকরণ, কেনাবেচা ও বিনিময়ও নিষিদ্ধ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ।
তবে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই রাজবাড়ীর পদ্মা নদীতে শত শত নৌকায় ইলিশ শিকারের অভিযোগ রয়েছে। জেলেরা জাল ফেলে কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর তা তুলে মাছ নিয়ে নদীর পাড়ে আসছেন। সেখানে জাল গোছানোর পাশাপাশি চলছে মাছ বিক্রি। বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারাও আসছেন মাছ কিনতে।
রাজবাড়ীতে চালবঞ্চিত ৭১২ জেলে, কার্ড পেয়েছেন অমৎস্যজীবীরা
এদিকে মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানের প্রথম ৯ দিনে রাজবাড়ীর পদ্মা নদীতে ৩১টি অভিযান ও পাঁচটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ সময় ২ লাখ ৮৮ হাজার মিটার জাল ও ১০০ কেজি ইলিশ জব্দ করা হয়েছে। আটক করা হয়েছে ২১ জেলেকে। তাদের মধ্যে ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ১০ জনের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া ১২ হাজার টাকা জরিমানা আদায় এবং জব্দ করা মাছ নিলামে বিক্রি করে ২১ হাজার টাকা আয় হয়েছে।
এর মধ্যে দৌলতদিয়া নৌ-পুলিশ প্রায় দেড় লাখ মিটার জাল ও ৫২ কেজি ইলিশসহ ১০ জেলেকে আটক করেছে। এত অভিযান, জাল জব্দ ও আটকের পরও নদীতে মাছ ধরা চলতে থাকায় অভিযানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সহায়তা না পেয়ে নদীতে নামছেন জেলেরা
রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি ছাড়া জেলার চার উপজেলা—রাজবাড়ী সদর, পাংশা, কালুখালী ও গোয়ালন্দ পদ্মা নদীবেষ্টিত। জেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১৪ হাজার ১০২ জন। এর মধ্যে ইলিশ শিকারের সঙ্গে জড়িত কার্ডধারী জেলে রয়েছেন ৬ হাজার ৩০৪ জন। তবে বরাদ্দের স্বল্পতায় এবার সরকারি সহায়তার চাল পাননি ৭১২ জন কার্ডধারী জেলে।
জেলেদের একাংশের অভিযোগ, মাছ ধরা বন্ধ থাকলেও সংসার চালানোর বিকল্প ব্যবস্থা নেই। আবার অনেকে বছরের পর বছর মাছ ধরলেও জেলে কার্ড পাননি। ফলে নিষেধাজ্ঞার সময় সরকারি সহায়তা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।
মা ইলিশকে প্রজনন মৌসুমে নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ দিন
তিনি বলেন, মূলত সাগরে ইলিশ মাছ মেরে ফেলায় নদীতে মাছ কমে গেছে। সাগরে মাছ ধরা বন্ধ করতে পারলে নদীতে ডিম ছাড়তে মাছ আসবে। আর নিষেধাজ্ঞার সময় সব ধরনের সহায়তা করলে আমরাও নিষেধাজ্ঞা মানব।
আরেক জেলে ইমরান মিয়া বলেন, আগের অভিযানের সময় নদীতে অনেক মাছ পাওয়া গেলেও এবার তেমন মাছ নেই। সারা দিন লুকিয়ে লুকিয়ে মাছ ধরেও যা পাওয়া যায়, তাতে তেলের খরচই ওঠে না।
কার্ড নেই, তবু মাছ ধরাই জীবিকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জেলে বলেন, ছয়-সাত বছর ধরে নদীতে মাছ ধরলেও তাদের জেলে কার্ড হয়নি। অথচ মাছ ধরাই তাদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। দীর্ঘ সময় মাছ ধরা বন্ধ থাকলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে প্রশাসনের নজর এড়িয়ে নদীতে নামছেন তারা।
তাদের ভাষ্য, নদীতে নামার পর প্রশাসনের লোকজনের উপস্থিতির খবর পেলে তারা তীরে চলে আসেন। এরপরও কখনো আটক, জেল-জরিমানা এবং জাল-নৌকা নষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
জেলেরা আরও জানান, এবার বড় ইলিশের তুলনায় ছোট মাছ বেশি পাওয়া যাচ্ছে। নদী থেকে মাছ ধরে তীরেই বিক্রি করছেন তারা। মাছ কেনার জন্য বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ এসে অপেক্ষা করেন বলেও জানান তারা।
প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, দিন-রাত পদ্মায় শত শত নৌকায় মাছ ধরা হচ্ছে। পুলিশ আসার আগেই জেলেরা খবর পেয়ে তীরে চলে আসেন। কিছুক্ষণ পর আবার নদীতে নামেন।
তিনি অভিযোগ করেন, এ কার্যক্রমের সঙ্গে একটি প্রভাবশালী মহল জড়িত, যাদের নিজস্ব নৌকা রয়েছে। তারা অন্যদের দিয়ে মাছ ধরান। সরকারি সহায়তা পাওয়া ও না পাওয়া—দুই ধরনের জেলেরাই মাছ ধরছেন। তবে প্রকৃত জেলেদের অনেকে সহায়তা কম পান।
স্থানীয় বাসিন্দা সিদ্দিক খান বলেন, নদীতে যেভাবে মাছ ধরা হচ্ছে, তাতে অভিযান চলছে বলে মনে হয় না। প্রকাশ্যে শত শত নৌকায় মাছ ধরা হচ্ছে এবং নদীর পাড়েই সেগুলো বিক্রি হচ্ছে। অনলাইনেও মাছ বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তবে প্রভাবশালী মহলের সম্পৃক্ততা এবং প্রকাশ্যে মাছ ধরা ও বিক্রির এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, মা ইলিশ সংরক্ষণের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য ইলিশের প্রজনন নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করা। কিন্তু নদীতে মাছ ধরা ও বিক্রি অব্যাহত থাকলে এ উদ্যোগের কাঙ্ক্ষিত ফল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আরটিভি/এমএম


