ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩

২০২৪-২৫ অর্থবছর: সরকারের সর্বোচ্চ ঋণ গ্রহণের বছর

আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:৪৯ পিএম
গুগল এলএম নোটবুক ব্যবহার করে তৈরি গ্রাফিক্স: আরটিভি নিউজ

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অনেকেই প্রত্যাশা করেছিলেন যে, সরকার ব্যয় সংকোচনের পাশাপাশি ঋণ নেওয়ার পরিমাণ কমিয়ে আনবে। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই এক অর্থবছরে সর্বোচ্চ পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করা হয়েছে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ৩ লাখ ২৮ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। এতে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি ২২ লাখ ৫০ হাজার ৯০৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে ঋণের ফাঁদে পড়তে যাচ্ছে কি না, সেই শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও নীতি বিশ্লেষকরা ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে নেওয়া সরকারি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৫০ হাজার ৯০৪ কোটি টাকায়। এর মধ্যে দেশি ঋণ ১১ লাখ ৩ হাজার ৯৩৯ কোটি ও বিদেশি ঋণ ১১ লাখ ৪৬ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকা।

এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকারি ঋণের পরিমাণ ছিল ১৯ লাখ ২২ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে সরকারের ঋণ বেড়েছে ৩ লাখ ২৮ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাই বাদে বাকি সময়জুড়ে দায়িত্বে ছিল বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার।

গত দেড় দশকে পতিত আওয়ামী সরকারের ঘোষিত বাজেটে ঋণনির্ভরতা বেশি দেখা গেছে। যদিও কোনো অর্থবছরে বাজেটের পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। প্রতি বছরই বড় অংকের ঘাটতি বাজেট ঘোষণা করায় সরকারের ঋণের বোঝা কেবলই স্ফীত হয়েছে। ২০০৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখন সরকারের ঋণ স্থিতি ছিল মাত্র ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সরকারি ঋণের পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৭৩ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা। এর পরের অর্থবছরেই প্রথমবারের মতো ১০ লাখ কোটি টাকা ছাড়ায় সরকারের ঋণ। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সময় ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে ঋণের পরিমাণ বেড়ে ১৯ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। সেই হিসাবে আওয়ামী সরকারের সময়ে ঋণ স্থিতি বেড়েছে প্রায় ১৬ লাখ কোটি টাকা।

দেশি-বিদেশি উৎস থেকে নেওয়া সরকারের ঋণের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত সময়ে একক বছর হিসেবে সর্বোচ্চ ঋণ গ্রহণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে এ পরিমাণ ঋণ নিয়েছিল সরকার। তবে সে সময়ে কোনো অর্থবছরেই সরকারের নেয়া ঋণ আড়াই লাখ কোটি টাকার বেশি হয়নি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এসে প্রথমবারের মতো ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ ৩ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল) বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থা থেকে সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে। সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য বাজেট সহায়তা হিসেবে এ অর্থ পেয়েছে বাংলাদেশ। এটি সে সময় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। তাছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বকেয়া বাবদ আড়াই বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ পরিশোধ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এসব কারণে সরকারকে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিতে হয়েছে।

সরকার বলছে আওয়ামী লীগের সময়ে উন্নয়ন প্রকল্পের নামে অনেক অপ্রয়োজনীয় ঋণ নেওয়া হয়েছিল। এসব ঋনের সুদ পরিশোধ করতে সরকার হিমশিম খাচ্ছে। কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রাজস্ব আহরণ হয়নি। কিছু ব্যাংককে বাঁচাতে সরকারকে অর্থ দিতে হয়েছে। এসব কারণে অন্তর্বর্তী সরকারকে ঋণ নিতে হয়েছে বলে জানান অর্থ উপদেষ্টা ডক্টর সালেহ উদ্দিন আহমেদ।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৩০ কোটি টাকার সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে, যা আলোচ্য অর্থবছরে মোট সরকারি ব্যয়ের ২১ শতাংশের বেশি। চলতি অর্থবছরে সুদ বাবদ সরকারের ব্যয় আরো বাড়বে। তাছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে এক বছরের কম থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত মেয়াদের ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে সরকারের নেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকায়। সামনের দিনগুলোতে এসব বন্ডের মেয়াদ শেষে সরকারকে অর্থ ফেরত দিতে হবে। এক্ষেত্রে নতুন করে বন্ড ইস্যুর মাধ্যমেই এ অর্থ শোধ করতে হবে।

টাকার অংকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প হচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ২০১৬ সালে প্রকল্পটি নেওয়ার সময় এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯১ হাজার কোটি টাকা রাশিয়ার এক্সিম ব্যাংকের ঋণ। সম্প্রতি টাকার অবমূল্যায়নসহ জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণে এ প্রকল্পের ব্যয় ২৬ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ঋণের কিস্তি ২০২৭ সালের মার্চে নির্ধারিত থাকলেও সম্প্রতি সেটি ১৮ মাস বাড়িয়ে ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে ২০২৮-২৯ অর্থবছরে এ ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু করতে হবে সে সময়ের সরকারকে।

রূপপুর ছাড়া যোগাযোগ অবকাঠামো খাতের বেশ কিছু বড় প্রকল্পের ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে সরকারকে। এর মধ্যে সবার আগে ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়েছে দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথের। প্রকল্পটির জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ৯ হাজার ৯৩ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। ঋণ চুক্তি অনুযায়ী বর্তমানে বছরে প্রায় ৪২০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। ২০২৮ সালে কিস্তির পরিমাণ ৬৬০ কোটি টাকায় উন্নীত হবে। এর সঙ্গে ২ শতাংশ সুদ আলাদা পরিশোধ করতে হবে। প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ শেষ হবে ২০৪৮ সালে।

বিগত সরকারের আমলে বাস্তবায়ন করা দেশের যোগাযোগ অবকাঠামো খাতের আরেকটি বড় প্রকল্প উত্তরা মতিঝিল মেট্রোরেল। ২০২৩ সালে মেট্রোরেলের জন্য জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) কাছ থেকে নেয়া ঋণ পরিশোধ শুরু হয়েছে। মেট্রোরেল লাইন ৬ বাস্তবায়নের জন্য জাইকা ঋণ দিয়েছে ১৯ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা। ৩০ বছরে এ টাকা পরিশোধ করতে হবে। এ হিসাবে সুদ ব্যতীত বার্ষিক গড় কিস্তির পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৫৭ কোটি টাকা। প্রকল্পটির বিপরীতে জাইকা ঋণ দিয়েছে পাঁচ ধাপে। বর্তমানে প্রথম ধাপের কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব ধাপের কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে। মেট্রোরেলের ঋণ পরিশোধ করতে হবে ২০৬১-৬২ অর্থবছর পর্যন্ত।

চীনের ঋণে বাস্তবায়ন করা হয়েছে কর্ণফুলী টানেল প্রকল্প। প্রকল্পটিতে ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬ হাজার ৭০ কোটি টাকা ঋণ। চুক্তি অনুযায়ী ঋণ পরিশোধে ১৫ বছর সময় পাবে বাংলাদেশ। এ হিসাবে সুদ ব্যতীত বছরে গড়ে ঋণ শোধ করতে হবে ৪০৫ কোটি টাকা। এ প্রকল্প থেকে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হচ্ছে। চীনের ঋণে বাস্তবায়ন করা যোগাযোগ অবকাঠামো খাতের আরেক প্রকল্প পদ্মা সেতু রেল সংযোগ। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হচ্ছে ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঋণের পরিমাণ ২১ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য বলছে, ছয় বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ মোট ২০ বছরে এ ঋণ পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ ঋণ পরিশোধে বাংলাদেশ সময় পাচ্ছে ১৪ বছর। এ হিসাবে বার্ষিক গড় ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ হাজার ৫০২ কোটি টাকায়। ঋণের সুদহার ২ শতাংশ। সার্ভিস চার্জ আরো দশমিক ২৫ শতাংশ।

মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় রাজস্ব আহরণের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বের সর্বনিম্ন দেশগুলোর একটি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আহরণে ঘাটতি ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এ সময়ে রফতানি আয়ে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এ অবস্থায় সামনের দিনগুলোতে আয় বাড়ানো নিয়ে সরকারকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। তার মধ্যে ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের চাপ পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তুলতে পারে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন যে রাজনৈতিক সরকার গঠিত হবে, তাদের মেয়াদের পুরোটা সময়জুড়েই এ চাপ বহন করতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

উত্তরাধিকার সূত্রে অন্তর্বর্তী সরকার যে ঋণের বোঝা পেয়েছে, সেটি পরিশোধ করাই চ্যালেঞ্জের বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড.খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। রাজস্ব আহরণ থেকে সরকারের আয়ের যে পরিস্থিতি, তাতে ঋণের এ বোঝা সহসা কমবে বলে মনে হয় না। আর বেতন কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে সরকারের পরিচালন ব্যয় আরো ১ লাখ কোটি টাকা বেড়ে যাবে।তখন সরকার আরো চাপে পড়বে বলেও মনে করেন তিনি।

অর্থনীতিবিদ ও বিভিন্ন খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে বাছবিচার ছাড়া উন্নয়ন প্রকল্পের নামে বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে। উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও দাতা সংস্থার কাছ থেকে নেওয়া এসব ঋণের বড় একটি অংশ অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে আবার বিদেশে পাচারও হয়েছে আওয়ামী আমলে। অন্যদিকে এখন উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং ঋণের সুদ পরিশোধ ও সরকারের পরিচালন ব্যয় মেটানোর জন্য ঋণ নিতে হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সামনের দিনে ঋণের এ স্থিতি বাড়তে থাকবে এবং ঋণের মূল ও সুদ পরিশোধে নতুন যেকোনো সরকারকেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।

বিগত সরকারের সময়ে মেগা প্রকল্পের নামে যেসব বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছিল, তার বড় অংশ দেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে। এ ছাড়া প্রকল্পের ব্যয় দেখানো হয়েছিলো দুই-তিন গুণ বেশি। আগামী বছরগুলোতে দেশের সরকারের ওপর বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ ক্রমাগত বাড়বে। এ পরিস্থিতিতে বিদেশি ঋণ পরিশোধের জন্যও সরকারকে নতুন ঋণ নিতে হতে পারে। বিদেশি ঋণের অর্থ ব্যয় কোন খাতে করা হচ্ছে তা স্পষ্ট করার তাগিদও দেন অর্থনীতিবিদরা।

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
প্রাণিসম্পদ পণ্য রপ্তানি ছয় মাসে বেড়েছে ২১৭ শতাংশ
এ বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে দেশের গবাদিপশু পণ্যের রপ্তানি ২১৭ শতাংশ বেড়ে ১০৪.৬৪ লাখ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এর আগের ছয় মাসে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩২.৯৯ লাখ মার্কিন ডলার। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাংস ও ডিমের উৎপাদন জাতীয় চাহিদাকে ছাড়িয়ে গেছে। ফলে মাথাপিছু সরবরাহের পরিমাণ এখন ন্যূনতম পুষ্টি চাহিদার চেয়েও বেশি। দেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ৯০.৭০ লাখ টন মাংস এবং ২ হাজার ৫০৯.৪১ কোটি ডিম উৎপাদিত হয়। এর বিপরীতে বছরে আনুমানিক ৭৮.১৪ লাখ টন মাংস এবং ১ হাজার ৮৫৫.৩৬ কোটি ডিমের চাহিদা রয়েছে। তবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে দুধের উৎপাদন এখনো চাহিদার তুলনায় কম। উৎপাদন বাড়ার কারণে বর্তমানে প্রতিদিন মাংস পাওয়া যাচ্ছে মাথাপিছু ১৩৯.২৯ গ্রাম, যা ন্যূনতম ১২০ গ্রামের চাহিদার চেয়ে বেশি। বর্তমানে বাৎসরিক মাথাপিছু মাংসের প্রাপ্যতা ৫০.৮৪ কেজি, যেখানে ন্যূনতম চাহিদা ৪৩.৮ কেজি। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, বাৎসরিক মাথাপিছু মাংস খরচের পরিমাণ মাত্র ১৪ কেজি। একইভাবে, বাৎসরিক মাথাপিছু ডিমের প্রাপ্যতা ১৪০টি ছাড়িয়ে গেছে, যেখানে চাহিদা প্রায় ১০৪টি। ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত এই এক দশকে মাংস ও ডিমের উৎপাদন যথাক্রমে ২৬.৭৮ শতাংশ এবং ৬৮.০৪ শতাংশ বেড়েছে। মাংস উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশই আসে ব্রয়লার মুরগি থেকে, যা এখন জাতীয় চাহিদা মেটাতে সক্ষম। অন্যদিকে ডিমের উৎপাদনও জাতীয় চাহিদা পূরণের পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত এক দশকে দুধের উৎপাদন ৬৯.৭১ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১৫৭.৫৩ লাখ টনে পৌঁছালেও, তা এখনো বছরে ১৬২.৭৯ লাখ টনের বার্ষিক চাহিদার চেয়ে কম। প্রতিদিন মাথাপিছু দুধের প্রাপ্যতা প্রায় ২৪১ মিলিমিটার, যেখানে আনুমানিক চাহিদা ২৫০ মিলিমিটার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাংসের উৎপাদন পূর্ববর্তী অর্থবছরের ৮৯.৫৪ লাখ টন থেকে ১.১৬ লাখ টন বেড়ে ৯০.৭০ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। ডিমের উৎপাদনও ২.৮৩ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ৪৪০.৬৫ কোটি থেকে ২ হাজার ৫০৯.৪১ কোটি পিসে পৌঁছেছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান বাসস-এর সঙ্গে আলাপকালে এই উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে সরকারের নীতিগত সহায়তা, উদ্যোক্তা তৈরি এবং গরু ও পোল্ট্রির জাত উন্নয়নকে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সরবরাহ ব্যবস্থার সব পর্যায়ে অ্যান্টিবায়োটিক-মুক্ত উৎপাদন নিশ্চিত করার প্রচেষ্টাও এই খাতের অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখেছে। রপ্তানি পরিস্থিতির বিষয়ে শাহজামান জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) গবাদিপশু পণ্য রপ্তানি করে ১৫৪.৪৭ লাখ মার্কিন ডলার বা ১৯৩.০৮ কোটি টাকা আয় হয়েছে। যেখানে পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয়ের পরিমাণ ছিল ৮২.০৬ লাখ মার্কিন ডলার বা ১০২.৫৭ কোটি টাকা। তিনি বলেন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর পণ্যের গুণগত মান ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) প্রয়োজনীয়তা পূরণ, হিমাগার সুবিধার উন্নয়ন এবং রপ্তানি মূল্য প্রতিযোগিতামূলক করার লক্ষ্যে সংস্থাটি কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এই ধারা চলমান রাখতে নতুন নতুন রপ্তানি বাজার খোঁজার কাজও চলছে। এই খাতের উৎপাদনের সম্ভাবনা সম্পর্কে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুক বলেন, দেশের গবাদিপশু উৎপাদন বর্তমান স্তরের চেয়ে অন্তত তিন গুণ বাড়ানো প্রয়োজন।      তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ বছরে গড়ে ১৪০টির মতো ডিম খায়, অথচ উন্নত দেশগুলোতে এই সংখ্যা প্রায় ৪০০। বাংলাদেশে মুরগির মাংস খাওয়ার হারও উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম গবাদিপশু পণ্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, প্রধানত অদক্ষ উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশে মাংস, দুধ ও ডিমের দাম প্রতিবেশী ভারতের চেয়ে বেশি। তিনি তৃণমূল উদ্যোক্তাদের সহায়তা দিতে এবং কর্পোরেট গোষ্ঠী যাতে বাজার নিয়ন্ত্রণ বা দাম কারসাজি করতে না পারে, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। পশুপালন, দুগ্ধ ও পোল্ট্রি খামারিদের মধ্যে আধুনিক যন্ত্রপাতির বিস্তৃত বিতরণের তাগিদ দেন। এর মধ্যে রয়েছে মিল্কিং মেশিন, ঘাস কাটার যন্ত্র, ট্রাক্টর, খড় কাটার যন্ত্র, মিল্ক ক্যান, ক্রিম সেপারেটর ও পাস্তুরাইজেশন প্ল্যান্ট। ড. আলম বলেন, কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় যান্ত্রিকীকরণ এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। প্রতিটি খামারকে আধুনিক উৎপাদন ইউনিট হিসেবে গড়ে তোলা উচিত। বিএলআরআই-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. শহিদুল হক কৃষি খাতের মতো গবাদিপশু খামারিদেরও প্রণোদনা দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি পশু শনাক্তকরণ ও তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু, প্রাণিসম্পদ নীতি ও আইন আরও শক্তিশালী করা এবং প্রান্তিক খামারিদের সুরক্ষায় বিমা সুবিধার ওপর গুরুত্ব দেন।  গবেষণা এবং বিদেশ থেকে উপযুক্ত জাতসহ উচ্চফলনশীল ও সংকর জাত আনার মাধ্যমে গবাদিপশুর জাত উন্নয়নের পরামর্শ দেন তিনি। ড. হক বলেন, খামারি ও ভোক্তা উভয় পক্ষ যাতে ন্যায্যমূল্য পায়, সেজন্য সরকারের একটি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু করা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট কমানো উচিত। বিপণন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং খামারিদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে তিনি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীনে একটি প্রাণিসম্পদ বিপণন বিভাগ গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন। তিনি উল্লেখ করেন, বছরে প্রায় এক শতাংশ হারে কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে গবাদিপশু উৎপাদন সম্প্রসারণের এখনো যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, গ্রামীণ পরিবারগুলো ব্রয়লার, লেয়ার, গরু, ছাগল ও ভেড়া পালন করে এই খাতের প্রসারে অবদান রাখতে পারে। যা মাংস, দুধ ও ডিমের রপ্তানি সম্ভাবনা নতুন খামার গড়ে তুলতে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে উৎসাহিত করবে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ছিল ১.৮১ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপিতে এর অবদান ছিল ১৬.৫৬ শতাংশ। দেশের প্রায় ৪৩.৬৪ শতাংশ পরিবার গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালনের সঙ্গে যুক্ত। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ প্রত্যক্ষভাবে এবং প্রায় ৫০ শতাংশ পরোক্ষভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি, খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য সম্মিলিতভাবে ৪৩,৩৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা জিডিপির ০.৬৩ শতাংশ। আরটিভি/এসআর  
প্রাণিসম্পদ পণ্য রপ্তানি ছয় মাসে বেড়েছে ২১৭ শতাংশ
তৈরি পোশাকের বাইরে রপ্তানিতে সুবাতাস, পাঁচ খাতে প্রবৃদ্ধি ১২-২৭ শতাংশ
দেশের রপ্তানি খাতে বহুমুখীকরণের সম্ভাবনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি রাসায়নিক পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, বিশেষায়িত বস্ত্র, চামড়া এবং প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে এসব খাতের প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে দেশের মোট রপ্তানি আয় আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৭০৯ কোটি মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে তৈরি পোশাক খাতের পাশাপাশি বিকাশমান পাঁচটি অপ্রচলিত রপ্তানি খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৪৪ শতাংশ থেকে ২৭ শতাংশ পর্যন্ত। খাতভিত্তিক হিসাবে রাসায়নিক পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ২৭ শতাংশ। পাট ও পাটজাত পণ্যে ২৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ, বিশেষায়িত বস্ত্রে ১৬ দশমিক ৫২ শতাংশ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে ১২ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং প্রকৌশল পণ্যে ১২ দশমিক ৪৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। রপ্তানির এই চিত্র তৈরি পোশাকনির্ভরতা কমিয়ে নতুন নতুন শিল্প খাতকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা তৈরি করছে। একই সঙ্গে উচ্চমূল্য সংযোজনকারী পণ্য উৎপাদন, নতুন বাজার সম্প্রসারণ এবং শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগও সৃষ্টি হচ্ছে। রাসায়নিক ও ওষুধশিল্পে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে রাসায়নিক পণ্য খাত। জুলাই-অক্টোবর সময়ে এ খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ১৫ কোটি ৭১ লাখ ৫০ হাজার ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৭ শতাংশ বেশি। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে দেশের ওষুধশিল্প। চার মাসে ওষুধ রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১০ কোটি ১৭ লাখ ৩০ হাজার ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ আয় বেড়েছে ৩৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ। শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মান ও কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা, নতুন বাজারে প্রবেশ এবং বিদেশের বাজারে বাংলাদেশি ওষুধের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায় এ খাতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হচ্ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ হাসান আরিফ বাসসকে বলেন, রাসায়নিক পণ্য, বিশেষ করে ওষুধশিল্পের এই অগ্রগতি দেশে উচ্চমূল্য সংযোজনকারী পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিফলন। রপ্তানি বহুমুখীকরণে এ খাত ক্রমেই সম্ভাবনাময় চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে। পাটপণ্যে বৈশ্বিক বাজারের নতুন সুযোগ পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি আয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে এ খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ৩৪ কোটি ৬৩ লাখ ৭০ হাজার ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ বেশি। বিশ্ববাজারে প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব ও সহজে পচনশীল পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের জন্য নতুন বাজার তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোতে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা এ শিল্পের সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে। ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান হাসান আরিফ বলেন, বিশ্বজুড়ে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার বাড়ায় বাংলাদেশের পাটশিল্পের সামনে বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ জুট গুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেজিইএ) ভাইস চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পাটপণ্যের চাহিদা ও রপ্তানির সুযোগ বাড়ায় এ খাতের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আফ্রিকার দেশগুলোসহ নতুন নতুন বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিদ্যমান বাজারে অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে হবে। কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধে সরকারের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে তিনি বলেন, এ উদ্যোগ স্থানীয় শিল্পের জন্য কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। এতে দেশে পাটের মূল্য সংযোজন বাড়বে এবং তৈরি পাটপণ্য রপ্তানিতে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। ড. কামরুজ্জামান বলেন, কাঁচা পাট রপ্তানির পরিবর্তে উচ্চমূল্যের পাটপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিতে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পাটশিল্পের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। বিশেষায়িত বস্ত্রে বাড়ছে সম্ভাবনা বিশেষায়িত বস্ত্র খাতেও ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। জুলাই-অক্টোবর সময়ে এ খাতের রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১৪ কোটি ২২ লাখ ২০ হাজার ডলারে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক ৫২ শতাংশ বেশি। প্রচলিত পোশাকের বাইরে শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত কাপড়, প্রযুক্তিনির্ভর বস্ত্র, স্বাস্থ্যসেবায় ব্যবহৃত বিশেষ উপকরণসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য এ খাতের অন্তর্ভুক্ত। এসব পণ্যে তুলনামূলক বেশি মূল্য সংযোজনের সুযোগ রয়েছে। ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান হাসান আরিফ বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, উৎপাদন সক্ষমতা উন্নত করা এবং উচ্চমূল্য সংযোজনের মাধ্যমে বিশেষায়িত বস্ত্র খাত রপ্তানি বহুমুখীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। চামড়াজাত পণ্যে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতও রপ্তানিতে ইতিবাচক ধারা বজায় রেখেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে এ খাত থেকে আয় হয়েছে ৪৬ কোটি ৫০ লাখ ৫০ হাজার ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেশি। আন্তর্জাতিক মান ও কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার উদ্যোগ, উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব এবং বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে এ খাতের রপ্তানি আয় বাড়ছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, স্থানীয় কাঁচামালের প্রাপ্যতা এবং পশ্চাৎ-সংযোগ শিল্পের সুযোগ থাকায় চামড়া খাত বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় অপ্রচলিত রপ্তানি খাত। ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান হাসান আরিফ বলেন, পণ্যের মান উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা এবং নতুন পণ্য উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিলে আন্তর্জাতিক বাজারের উচ্চমূল্যের অংশে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। প্রকৌশল পণ্যে বাড়ছে রপ্তানি আয় প্রকৌশল পণ্য খাতেও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। জুলাই-অক্টোবর সময়ে এ খাত থেকে আয় হয়েছে ২৪ কোটি ৭২ লাখ ৩০ হাজার ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ৪৪ শতাংশ বেশি। এ খাতের আওতায় রয়েছে সাইকেল, যন্ত্রপাতির যন্ত্রাংশ, শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণ এবং হালকা প্রকৌশল পণ্য। প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, উদ্ভাবন এবং উচ্চমূল্য সংযোজনের সুযোগ থাকায় প্রকৌশল পণ্যকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাত হিসেবে বিবেচনা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান হাসান আরিফ বলেন, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে প্রকৌশল পণ্য বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠতে পারে। রপ্তানি বহুমুখীকরণে অগ্রগতির ইঙ্গিত ইপিবির তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে উদীয়মান পাঁচটি রপ্তানি খাতের প্রতিটিতেই সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর মধ্যে রাসায়নিক পণ্যে প্রবৃদ্ধি সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধির প্রায় পাঁচ গুণ এবং পাট ও পাটজাত পণ্যে চার গুণের বেশি। অন্যদিকে বিশেষায়িত বস্ত্র, চামড়া ও প্রকৌশল পণ্যেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি এখনো তৈরি পোশাক খাত থেকে এলেও অন্যান্য খাতের এই অগ্রগতি রপ্তানি আয়ের উৎস সম্প্রসারণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান হাসান আরিফ বলেন, সর্বশেষ রপ্তানি পরিসংখ্যান দেশের রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণে উৎসাহব্যঞ্জক অগ্রগতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখতে নীতিগত সহায়তা, নতুন বাজার অনুসন্ধান, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং প্রযুক্তির উন্নয়ন জরুরি। তৈরি পোশাকশিল্পের পাশাপাশি নতুন নতুন রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বহুমুখী শিল্পভিত্তি গড়ে তোলার বিকল্প নেই। আরটিভি/এসআর  
তৈরি পোশাকের বাইরে রপ্তানিতে সুবাতাস, পাঁচ খাতে প্রবৃদ্ধি ১২-২৭ শতাংশ
বিনা জামানতে ২০ লাখ টাকার ঋণ কর্মসূচি নিয়ে সতর্ক করল বাংলাদেশ ব্যাংক
উপজেলাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি ‘উদ্যোগ’-এর আওতায় বিনা জামানতে ২০ লাখ টাকা ঋণ দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে পরিশোধ করতে হবে ১০ লাখ টাকা, আর ১০ লাখ মিলবে অনুদান হিসেবে। ১ নভেম্বর থেকে দেশের ৫৬টি জেলায় আবেদন গ্রহণও শুরু হয়েছে। এর আগে অক্টোবর মাসে আবেদন নেয়া হয়েছিল বাকি ৮ জেলা থেকে। তবে এবার এই ঋণ কর্মসূচি নিয়ে সতর্ক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এক বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটি জানিয়েছে, ঋণ পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভনে কিছু অসাধু ব্যক্তি বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং ও অন্যান্য মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচির সব কার্যক্রম স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এই ঋণ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা প্রদান কিংবা ঋণ পাইয়ে দেয়ার নামে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অর্থ প্রদান করা থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করেছে সংস্থাটি। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, ‘উদ্যোগ’ নামে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফেসবুকসহ অন্য কোনো অফিসিয়াল পেইজ বা চ্যানেল নেই। এ নামে কোনো ভুয়া পেইজ বা অ্যাকাউন্ট খুলে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার কিংবা প্রতারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারিও দেয়া হয়েছে। এ ধরনের প্রতারণা নিয়ে সতর্ক থেকে বিভ্রান্তিকর প্রচারণায় প্রভাবিত না হওয়ার জন্য অনুরোধ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আরটিভি/এসআর  
বিনা জামানতে ২০ লাখ টাকার ঋণ কর্মসূচি নিয়ে সতর্ক করল বাংলাদেশ ব্যাংক
আপনার যা লাগছে, সব মুক্ত অ্যাপে থাকছে
বাংলালিংকের মাইবিএল অ্যাপ এখন ‘মুক্ত’!
আপনার যা লাগছে, সব মুক্ত অ্যাপে থাকছে
ঢাকায় বেসরকারি খাতের অংশীদারদের নিয়ে আইডিই বাংলাদেশের সভা
গ্রামীণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে টেকসই পণ্য ও সেবা পৌঁছে দিতে বেসরকারি খাতের সঙ্গে সহযোগিতা, বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরিতে ঢাকায় সভা করেছে আইডিই বাংলাদেশ।  মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাজধানীর শেরাটন হোটেলে আয়োজিত এ সভায় বর্তমান ও সম্ভাব্য বেসরকারি খাতের অংশীদাররা অংশ নেন। এতে কৃষি, পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পুষ্টি এবং জলবায়ু-সহনশীল খাতের বিভিন্ন বাজারভিত্তিক উদ্ভাবন তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে আইডিই বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের অংশীদারদের পণ্য, নমুনা, প্রযুক্তি ও সেবা নিয়ে ১৭টি প্রদর্শনী স্টল ছিল। অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল গ্রামীণ ড্যানোন ফুডস লিমিটেড, এটেক, সিপিআইএল, আবেদিন ইকুইপমেন্ট লিমিটেড, বায়ার ক্রপসায়েন্স লিমিটেড বাংলাদেশ, টিএমএসএস, সার্পভ, আরএফএল, সেফপ্যাড বাংলাদেশ, মেটাল, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, এসিআই পিএলসি, লাল তীর সিড লিমিটেড, রুরাল সান পাওয়ার, এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসি ও এসএমসি। অনুষ্ঠানে বিশেষ বক্তব্য দেন আইডিই গ্লোবালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিড অ্যান্ড্রু পিটারসন। তিনি বাজারভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমে কীভাবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে পারে, তা তুলে ধরেন। কক্সবাজারে সাম্প্রতিক সফরের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিম্ন আয়ের মানুষ শুধু সহায়তা গ্রহণকারী নন; তাঁরা একই সঙ্গে ক্রেতা, উৎপাদক ও উদ্যোক্তা।  পণ্যের উপযোগী পরিবর্তন, সরবরাহব্যবস্থার শেষ ধাপ পর্যন্ত পৌঁছানোর নেটওয়ার্ক এবং যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে এসব জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ব্যবসায়িক সংযোগ তৈরিতে আইডিই কাজ করছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে ১০ লাখ উদ্যোক্তাকে ক্ষমতায়িত করার বৈশ্বিক লক্ষ্যও তুলে ধরেন তিনি। আইডিই বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর সমীর কারকি বলেন, বেসরকারি খাতের অংশীদারেরা এমন পণ্য ও সেবা সরবরাহের মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বাস্তব সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারেন, যা গ্রামীণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে পৌঁছায়। তিনি আইডিই বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ততা কৌশলের আওতায় যৌথ উদ্যোগ, সহবিনিয়োগ ও পণ্য উদ্ভাবনের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন। এ কৌশল আইডিইর বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক। অনুষ্ঠানে বেসরকারি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও বক্তব্য দেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন লাল তীর সিডের পরিচালক তাজওয়ার এম আওয়াল, এসএমসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তসলিম উদ্দিন, আরএফএলের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা সুকান্ত দাস, সেফপ্যাড বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাহমিদ কে. চৌধুরী, এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. তৌহিদুল আলম খান, বায়ার ক্রপসায়েন্স লিমিটেডের কান্ট্রি লিড, ফিল্ড সলিউশনস অ্যান্ড ক্রপসায়েন্স গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগের রাজাউল করিম, টিএমএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাদিদ জামিল, আবেদিন ইকুইপমেন্ট লিমিটেডের মো. আমির হোসেন এবং আরএসপির মো. নাজমুল হাসান। তাঁরা বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ ও বাজার উন্নয়ন নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আইডিই বাংলাদেশ সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই সমাধানের সুযোগ বাড়াতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বাণিজ্যিকভাবে টেকসই বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে এসব জনগোষ্ঠীর কাছে প্রয়োজনীয় পণ্য, সেবা ও অর্থনৈতিক সুযোগ পৌঁছে দেওয়া। আরটিভি/এসআর
ঢাকায় বেসরকারি খাতের অংশীদারদের নিয়ে আইডিই বাংলাদেশের সভা
আরও পড়ুন
‘গ্যাস সংকট মোকাবিলায় ৫২টি নতুন কূপ খনন করবে সরকার’
ক্ষমতা হারানোর পথে নেতানিয়াহু, সরকার গঠনে এগিয়ে আইজেনকট!
২০২৭ সালের সরকারি ছুটির তালিকা প্রকাশ করে প্রজ্ঞাপন
সারাদেশে ৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ সরকারের