ঢাকা শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩

প্রাণিসম্পদ পণ্য রপ্তানি ছয় মাসে বেড়েছে ২১৭ শতাংশ

বাসস

প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:২৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত

এ বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে দেশের গবাদিপশু পণ্যের রপ্তানি ২১৭ শতাংশ বেড়ে ১০৪.৬৪ লাখ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এর আগের ছয় মাসে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩২.৯৯ লাখ মার্কিন ডলার।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাংস ও ডিমের উৎপাদন জাতীয় চাহিদাকে ছাড়িয়ে গেছে। ফলে মাথাপিছু সরবরাহের পরিমাণ এখন ন্যূনতম পুষ্টি চাহিদার চেয়েও বেশি।

দেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ৯০.৭০ লাখ টন মাংস এবং ২ হাজার ৫০৯.৪১ কোটি ডিম উৎপাদিত হয়। এর বিপরীতে বছরে আনুমানিক ৭৮.১৪ লাখ টন মাংস এবং ১ হাজার ৮৫৫.৩৬ কোটি ডিমের চাহিদা রয়েছে।

তবে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে দুধের উৎপাদন এখনো চাহিদার তুলনায় কম।

উৎপাদন বাড়ার কারণে বর্তমানে প্রতিদিন মাংস পাওয়া যাচ্ছে মাথাপিছু ১৩৯.২৯ গ্রাম, যা ন্যূনতম ১২০ গ্রামের চাহিদার চেয়ে বেশি। বর্তমানে বাৎসরিক মাথাপিছু মাংসের প্রাপ্যতা ৫০.৮৪ কেজি, যেখানে ন্যূনতম চাহিদা ৪৩.৮ কেজি।

তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, বাৎসরিক মাথাপিছু মাংস খরচের পরিমাণ মাত্র ১৪ কেজি।

একইভাবে, বাৎসরিক মাথাপিছু ডিমের প্রাপ্যতা ১৪০টি ছাড়িয়ে গেছে, যেখানে চাহিদা প্রায় ১০৪টি।

২০১৬-১৭ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত এই এক দশকে মাংস ও ডিমের উৎপাদন যথাক্রমে ২৬.৭৮ শতাংশ এবং ৬৮.০৪ শতাংশ বেড়েছে।

মাংস উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশই আসে ব্রয়লার মুরগি থেকে, যা এখন জাতীয় চাহিদা মেটাতে সক্ষম। অন্যদিকে ডিমের উৎপাদনও জাতীয় চাহিদা পূরণের পর্যায়ে পৌঁছেছে।

গত এক দশকে দুধের উৎপাদন ৬৯.৭১ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১৫৭.৫৩ লাখ টনে পৌঁছালেও, তা এখনো বছরে ১৬২.৭৯ লাখ টনের বার্ষিক চাহিদার চেয়ে কম। প্রতিদিন মাথাপিছু দুধের প্রাপ্যতা প্রায় ২৪১ মিলিমিটার, যেখানে আনুমানিক চাহিদা ২৫০ মিলিমিটার।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাংসের উৎপাদন পূর্ববর্তী অর্থবছরের ৮৯.৫৪ লাখ টন থেকে ১.১৬ লাখ টন বেড়ে ৯০.৭০ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। ডিমের উৎপাদনও ২.৮৩ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ৪৪০.৬৫ কোটি থেকে ২ হাজার ৫০৯.৪১ কোটি পিসে পৌঁছেছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান বাসস-এর সঙ্গে আলাপকালে এই উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে সরকারের নীতিগত সহায়তা, উদ্যোক্তা তৈরি এবং গরু ও পোল্ট্রির জাত উন্নয়নকে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, সরবরাহ ব্যবস্থার সব পর্যায়ে অ্যান্টিবায়োটিক-মুক্ত উৎপাদন নিশ্চিত করার প্রচেষ্টাও এই খাতের অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখেছে।

রপ্তানি পরিস্থিতির বিষয়ে শাহজামান জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) গবাদিপশু পণ্য রপ্তানি করে ১৫৪.৪৭ লাখ মার্কিন ডলার বা ১৯৩.০৮ কোটি টাকা আয় হয়েছে। যেখানে পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয়ের পরিমাণ ছিল ৮২.০৬ লাখ মার্কিন ডলার বা ১০২.৫৭ কোটি টাকা।

তিনি বলেন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর পণ্যের গুণগত মান ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) প্রয়োজনীয়তা পূরণ, হিমাগার সুবিধার উন্নয়ন এবং রপ্তানি মূল্য প্রতিযোগিতামূলক করার লক্ষ্যে সংস্থাটি কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এই ধারা চলমান রাখতে নতুন নতুন রপ্তানি বাজার খোঁজার কাজও চলছে।

এই খাতের উৎপাদনের সম্ভাবনা সম্পর্কে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুক বলেন, দেশের গবাদিপশু উৎপাদন বর্তমান স্তরের চেয়ে অন্তত তিন গুণ বাড়ানো প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ বছরে গড়ে ১৪০টির মতো ডিম খায়, অথচ উন্নত দেশগুলোতে এই সংখ্যা প্রায় ৪০০। বাংলাদেশে মুরগির মাংস খাওয়ার হারও উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম গবাদিপশু পণ্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন।

তিনি বলেন, প্রধানত অদক্ষ উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশে মাংস, দুধ ও ডিমের দাম প্রতিবেশী ভারতের চেয়ে বেশি।

তিনি তৃণমূল উদ্যোক্তাদের সহায়তা দিতে এবং কর্পোরেট গোষ্ঠী যাতে বাজার নিয়ন্ত্রণ বা দাম কারসাজি করতে না পারে, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

পশুপালন, দুগ্ধ ও পোল্ট্রি খামারিদের মধ্যে আধুনিক যন্ত্রপাতির বিস্তৃত বিতরণের তাগিদ দেন। এর মধ্যে রয়েছে মিল্কিং মেশিন, ঘাস কাটার যন্ত্র, ট্রাক্টর, খড় কাটার যন্ত্র, মিল্ক ক্যান, ক্রিম সেপারেটর ও পাস্তুরাইজেশন প্ল্যান্ট।

ড. আলম বলেন, কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় যান্ত্রিকীকরণ এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। প্রতিটি খামারকে আধুনিক উৎপাদন ইউনিট হিসেবে গড়ে তোলা উচিত।

বিএলআরআই-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. শহিদুল হক কৃষি খাতের মতো গবাদিপশু খামারিদেরও প্রণোদনা দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

তিনি পশু শনাক্তকরণ ও তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু, প্রাণিসম্পদ নীতি ও আইন আরও শক্তিশালী করা এবং প্রান্তিক খামারিদের সুরক্ষায় বিমা সুবিধার ওপর গুরুত্ব দেন।

গবেষণা এবং বিদেশ থেকে উপযুক্ত জাতসহ উচ্চফলনশীল ও সংকর জাত আনার মাধ্যমে গবাদিপশুর জাত উন্নয়নের পরামর্শ দেন তিনি।

ড. হক বলেন, খামারি ও ভোক্তা উভয় পক্ষ যাতে ন্যায্যমূল্য পায়, সেজন্য সরকারের একটি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু করা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট কমানো উচিত।

বিপণন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং খামারিদের পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে তিনি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীনে একটি প্রাণিসম্পদ বিপণন বিভাগ গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন।

তিনি উল্লেখ করেন, বছরে প্রায় এক শতাংশ হারে কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে গবাদিপশু উৎপাদন সম্প্রসারণের এখনো যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, গ্রামীণ পরিবারগুলো ব্রয়লার, লেয়ার, গরু, ছাগল ও ভেড়া পালন করে এই খাতের প্রসারে অবদান রাখতে পারে। যা মাংস, দুধ ও ডিমের রপ্তানি সম্ভাবনা নতুন খামার গড়ে তুলতে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে উৎসাহিত করবে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ছিল ১.৮১ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপিতে এর অবদান ছিল ১৬.৫৬ শতাংশ। দেশের প্রায় ৪৩.৬৪ শতাংশ পরিবার গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালনের সঙ্গে যুক্ত।

দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ প্রত্যক্ষভাবে এবং প্রায় ৫০ শতাংশ পরোক্ষভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি, খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের জন্য সম্মিলিতভাবে ৪৩,৩৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা জিডিপির ০.৬৩ শতাংশ।

আরটিভি/এসআর


আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
মেঘনার বুকের নতুনচরে সম্ভাবনার হাতছানি
বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণে মেঘনার বুকে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় অবস্থিত বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া। এটি ১৯৮৩ সালে উপজেলা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও এই অঞ্চলের রয়েছে তিন হাজার বছরেরও বেশি ইতিহাস। নদী ভাঙন- যেমন এই জনপদের নিত্য সঙ্গী তেমনি নদীর বুকে জেগে ওঠা নতুন নতুন চরগুলো উঁকি দিচ্ছে সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে। গত চার দশকে দ্বীপ উপজেলাটির চারপাশে মেঘনার বুকে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩শ’র ও বেশি চর জেগেছে। এরইমধ্যে ১ লাখ ৬৪ হাজার একর চরাঞ্চলের জমি ভূমি মন্ত্রণালয়ে নথিভুক্ত হয়েছে।
মেঘনার বুকের নতুনচরে সম্ভাবনার হাতছানি
তাহিরপুরে বোরো আবাদে ব্যস্ত কৃষক, প্রণোদনার বীজ-সার নিয়ে ক্ষোভ
দেশের অন্যতম বৃহৎ হাওরাঞ্চল সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে শুরু হয়েছে বোরো মৌসুমের বীজতলা তৈরির কাজ। বর্ষায় পানিতে থইথই করা হাওরের বিস্তীর্ণ বুকে শুষ্ক মৌসুমে ফলবে সোনালি ধান। বছরের একমাত্র প্রধান ফসল বোরো ধানকে ঘিরেই আবর্তিত হয় এখানকার কৃষকদের জীবন জীবিকা। তবে গত মৌসুমে জলাবদ্ধতা ও ধানের গুণগত মানের অবনতিতে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছিলেন কৃষকরা। সেই ক্ষতি কাটিয়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশায় এবার আগেভাগেই বীজতলা তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন তারা। তবে কৃষি প্রণোদনার আওতায় সঠিক সময়ে বীজ ও সার না পাওয়ায় ক্ষোভ রয়েছে কৃষকদের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, অনেক সময় বীজতলা তৈরির কাজ শেষ হওয়ার পর কৃষি অফিস থেকে বীজ ও সার দেওয়া হয়। ফলে এসব সরকারি সহায়তা কাজে না এসে নষ্ট হচ্ছে।
তাহিরপুরে বোরো আবাদে ব্যস্ত কৃষক, প্রণোদনার বীজ-সার নিয়ে ক্ষোভ
কলা কি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে!
জলবায়ু পরিবর্তন এবং মারাত্মক সব উদ্ভিদ রোগের আক্রমণে বিশ্বজুড়ে কলা চাষ এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। তবে গবেষকরা জানিয়েছেন, ক্যাভেন্ডিশ জাতের কলা এখন অস্তিত্বের লড়াই করলেও সংকট কাটিয়ে ফলটিকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে এক নতুন আশার দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
কলা কি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে!
উৎপাদন বাড়লেও পুষ্টিমান হারাচ্ছে ফসল, যা বলছে গবেষকরা
আধুনিক নিবিড় কৃষি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মিলিত প্রভাবে বিশ্বব্যাপী খাদ্যশস্যের পুষ্টিগুণ দিন দিন কমতে কমতে ক্রমান্বয়ে তলানিতে ঠেকছে। গত কয়েক দশকে উৎপাদনমুখী চাষাবাদের কারণে শস্যের ফলন ও আকার বাড়লেও চাল, গম ও সবজিতে জিংক, আয়রন ও প্রোটিনের মতো জরুরি অণুপুষ্টির ঘনত্ব ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।  ফলে পেট ভরা খাবার পেয়েও প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের অভাবে কোটি কোটি মানুষ এক মারাত্মক ‘প্রচ্ছন্ন ক্ষুধা’ বা অদৃশ্য অপুষ্টির শিকার হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য নীতিনির্ধারকদের সামনে এক নতুন বৈশ্বিক সংকট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। যুক্তরাজ্যের অলাভজনক বিজ্ঞান সংস্থা ডিপ সায়েন্স ভেঞ্চারস (ডিএসভি) এবং মার্ক লিওনার্ড ট্রাস্ট-এর যৌথ উদ্যোগে ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসের শুরুতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত ‘হলো হারভেস্ট’ (ফাঁপা ফসল) নামক একটি বৈশ্বিক গবেষণা প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। এই প্রতিবেদনের পূর্ণ শিরোনাম হলো: ‘হলো হারভেস্ট: রিবিল্ডিং দ্য নিউট্রিশনাল ভ্যালু অব ক্রপস ইন অ্যান এজ অব আবান্ড্যান্ট ক্যালোরিজ’ (ফাঁপা ফসল: প্রচুর ক্যালোরির যুগে ফসলের পুষ্টিমান পুনর্গঠন)। নেদারল্যান্ডসের লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের ২০২৬ সালের একটি সাম্প্রতিক মেটা-অ্যানালাইসিসে ৪৩টি খাদ্যশস্যের প্রায় ৬০ হাজারটি পুষ্টিগত পরিমাপ পরীক্ষা করে দেখা গেছে, বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধির কারণে উদ্ভিদে শর্করা ও ক্যালোরির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু প্রোটিন, জিংক ও আয়রনের মতো খনিজ গড়ে ৩.২ শতাংশ কমে যাচ্ছে। এমনকি কিছু বিশেষ ফসলে জিংকের পরিমাণ ৩৭.৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাওয়ার প্রমাণ মিলেছে।  সাম্প্রতিক এই গবেষণাগুলোর ভয়াবহ তথ্য কৃষি ও পুষ্টিবিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক নিবিড় কৃষি পদ্ধতি, উচ্চ ফলনশীল জাতের একচেটিয়া চাষাবাদ এবং তীব্র জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে বিশ্বব্যাপী প্রধান প্রধান খাদ্যশস্যের পুষ্টির মান ও ঘনত্ব (নিউট্রিয়েন্ট ডেনসিটি) আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। গত কয়েক দশকে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শস্যের গুণগত মানের চেয়ে পরিমাণের ওপর বেশি জোর দেওয়ায় উৎপাদন বাড়লেও উৎপাদিত খাদ্যের পুষ্টিগুণ ক্রমান্বয়ে তলানিতে ঠেকছে। ফলে পেট ভরার মতো পর্যাপ্ত খাবার বা ক্যালোরি পেলেও প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের অভাবে কোটি কোটি মানুষ ‘প্রচ্ছন্ন ক্ষুধা’ বা তীব্র অণুপুষ্টির ঘাটতির (মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ডেফিসিয়েন্সি) শিকার হচ্ছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুষ্টি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এই সংকটের রূপ আরও স্পষ্ট। সর্বশেষ ‘জাতীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সার্ভে’-র তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৪৪ শতাংশ শিশু এবং ৫৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নারী তীব্র জিংক বা দস্তার ঘাটতিতে ভুগছেন। প্রধান খাদ্য হিসেবে প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে চাল বা ভাত খাওয়া সত্ত্বেও মানুষের শরীরে জিংক ও আয়রনের মতো অত্যাবশ্যকীয় খনিজের এই ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। মূলত প্রথাগত উচ্চ ফলনশীল সাদা চালের পুষ্টি ঘনত্ব কমে যাওয়া এবং সুষম খাদ্যাভ্যাসের অভাবই এর অন্যতম প্রধান কারণ। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ)-এর দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বিশ্লেষণ করে টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. ডোনাল্ড ডেভিস ও তার দল ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক ঐতিহাসিক গবেষণায় দেখিয়েছিলেন, ১৯৫০ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে উৎপাদিত ৪৩টি বিভিন্ন ফসলে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, ভিটামিন সি এবং প্রোটিনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। কৃষিবিজ্ঞানীরা একে ‘ডিলিউশন ইফেক্ট’ বলছেন; যেখানে আধুনিক শস্যের আকার ও ফলন বাড়লেও পুষ্টির ঘনত্ব আনুপাতিক হারে কমে যাচ্ছে। তাছাড়া রাসায়নিক সারের অত্যধিক ব্যবহার এবং নিবিড় চাষাবাদের ফলে মাটির গভীরে থাকা ‘মাইকোরাইজাল ছত্রাক’ ও উপকারী অণুজীবের নেটওয়ার্ক ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক মৃত্তিকা বিজ্ঞান সাময়িকীগুলোর গবেষণায় দেখা গেছে, এই অণুজীবগুলো উদ্ভিদের মূল বা শিকড়কে মাটি থেকে খনিজ পুষ্টি উপাদান শোষণে সরাসরি সাহায্য করে। এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত থাকায় উদ্ভিদ তার প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান পাচ্ছে না। দেশের সরকারি সংস্থা মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই)-এর বার্ষিক ও জাতীয় ভূমি অবক্ষয় প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিবিড় চাষাবাদের কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৭৬.২ শতাংশ আবাদি জমি মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার পুষ্টিহীনতার শিকার। সংস্থাটির দেশব্যাপী মৃত্তিকা পুষ্টি মানচিত্রের তথ্য বলছে, দেশের অর্ধেকেরও বেশি ফসলি জমির মাটিতে জৈব উপাদানের পরিমাণ আদর্শ মাত্রার চেয়ে কমে ১ থেকে ১.৫ শতাংশের নিচে নেমে গেছে এবং প্রায় সাড়ে ৫ মিলিয়ন হেক্টর চাষযোগ্য জমির মাটিতে দস্তা (জিঙ্ক), বোরন ও সালফারের মতো জরুরি অণুপুষ্টির তীব্র ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এদিকে আন্তর্জাতিক পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, ১৯৬০ সালের পর উদ্ভাবিত রুটি তৈরির গম বা ব্রেড-হুইটের তিন-চতুর্থাংশেরও কম জাত জিংকের ন্যূনতম আদর্শ মাত্রা পূরণ করতে পারছে। এই পুষ্টিহানি মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসকে অকার্যকর করে তুলছে। যেমন, আজ থেকে ৬০ বছর আগের একটি গাজর থেকে যে পরিমাণ পটাশিয়াম পাওয়া যেত, এখনকার গাজরে তার অর্ধেক পাওয়া যাচ্ছে, অর্থাৎ একই পুষ্টি পেতে একজনকে এখন দ্বিগুণ পরিমাণ গাজর খেতে হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও বিভিন্ন পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, খাদ্যশস্যের পুষ্টিমান কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানবদেহে। এর ফলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং সাব-সাহারা আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের মধ্যে রক্তস্বল্পতা, হাড় ক্ষয় এবং অপুষ্টিজনিত বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগ বাড়ছে। পর্যাপ্ত খাবার খাওয়ার পরও প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাবে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতের ওপর বিশাল আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। এটি ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি-২) ‘ক্ষুধা মুক্তি ও পুষ্টি নিশ্চিতকরণ’ এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথে বড় অন্তরায়। এই অপুষ্টির সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ইতিমধ্যে বায়োফর্টিফাইড বা জিঙ্কসমৃদ্ধ চালের জাত (যেমন- ব্রি ধান-৭৪, ব্রি ধান-১০০) উদ্ভাবন করেছে, যা মানুষের শরীরে জিংকের দৈনিক চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করতে সক্ষম। তবে ব্রির বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, ভোক্তা পর্যায়ে অতিরিক্ত ছাঁটা ও চকচকে ‘মিনিকেট’ চাল খাওয়ার প্রবণতার কারণে চাল মিলিং ও পলিশিংয়ের সময় এর উপরিভাগে থাকা জিংক ও আয়রনের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই নষ্ট হয়ে যায়। ফলে পুষ্টিসমৃদ্ধ জাত চাষের পাশাপাশি ভোক্তাদের আচরণ ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করাও জরুরি। ব্রির গবেষকরা এখন জিংক ও আয়রনের দ্বৈত সুবিধাযুক্ত আরও উন্নত জাতের ‘হেলদিয়ার রাইস’ উদ্ভাবনের লক্ষ্যে কাজ করছেন, যাতে একটি জাত থেকেই শরীরের অন্তত ৮০% জিংক এবং ৫০% আয়রনের চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়। বিশেষজ্ঞ মহল এই সংকট মোকাবিলায় অবিলম্বে প্রচলিত কৃষি নীতিতে আমূল পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন। তারা শুধু মোট ফলন বা ওজনের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং ফসলের পুষ্টির ঘনত্বের ওপর ভিত্তি করে কৃষকদের মূল্যায়ন ও প্রণোদনা দেওয়ার কথা বলছেন। পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জৈব সার, অণুজীব ইনোকুল্যান্ট এবং শস্য পর্যায় পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছেন তারা। এছাড়া প্রথাগত হাইব্রিড ধান-গমের পাশাপাশি জিংক ও আয়রনসমৃদ্ধ স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী শস্য ও মিলেট চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন। নীতিনির্ধারকদের মতে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কেবল খাদ্যের সহজলভ্যতা বা ক্যালোরি নিশ্চিত করা নয়, বরং পুষ্টিকর ও গুণগত মানসম্পন্ন খাদ্য নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। আরটিভি/এসআর
উৎপাদন বাড়লেও পুষ্টিমান হারাচ্ছে ফসল, যা বলছে গবেষকরা
আরও পড়ুন
বিশ্ব ডিম দিবস আজ
এসএসসি পাসেই প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে চাকরি, নিয়োগ ৫৩৮ জন
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে বিশাল নিয়োগ
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে বিশাল নিয়োগ, আবেদন যেভাবে