
সোনা এখন আর শুধু অলংকার নয়, অনেকের কাছে বড় অঙ্কের বিনিয়োগও। দেশে সোনার দাম দুই লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় অলংকার কেনার সময় এর মান, ক্যারেট, হলমার্ক ও বিক্রির শর্ত নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ। প্রশ্ন উঠছে কত ক্যারেটের সোনা কিনলে লাভজনক হবে এবং প্রতারণা এড়াতে কী কী বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে?
দেশ স্বাধীন হওয়ার বছর, ১৯৭১ সালে দেশে এক ভরি সোনার দাম ছিল ১৭০ টাকা। ৫৫ বছরে সেই দাম বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৩৭০ গুণ। গত ২৯ জানুয়ারি ২২ ক্যারেট সোনার দাম বেড়ে প্রতি ভরি ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা হয়েছিল, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। বর্তমানে দাম কিছুটা কমে ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৩০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশে সাধারণত ২২, ২১ ও ১৮ ক্যারেট এবং সনাতন পদ্ধতির সোনার অলংকার বিক্রি হয়। ক্যারেট সোনার বিশুদ্ধতার মানদণ্ড। ২৪ ক্যারেটকে খাঁটি সোনা ধরা হয়। ২২, ২১ ও ১৮ ক্যারেটের সোনায় নির্দিষ্ট অনুপাতে রুপা, তামা বা দস্তার মতো অন্যান্য ধাতু মেশানো থাকে।
বিশ্বজুড়ে সোনার বিশুদ্ধতা বোঝাতে অলংকারে নির্দিষ্ট নম্বর বা চিহ্ন খোদাই করা হয়। এটিই হলমার্ক হিসেবে পরিচিত। ২৪ ক্যারেট সোনায় সাধারণত ‘২৪কে’ বা ‘৯৯৯’ লেখা থাকে, যা ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ বিশুদ্ধতা বোঝায়। ২২ ক্যারেটে থাকে ‘৯১৬’, অর্থাৎ ৯১ দশমিক ৬ শতাংশ; ২১ ক্যারেটে ‘৮৭৫’, অর্থাৎ ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ১৮ ক্যারেটে ‘৭৫০’, অর্থাৎ ৭৫ শতাংশ বিশুদ্ধতা।
একাধিক জুয়েলার্স মালিকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২১ ক্যারেটের অলংকারের বিক্রি বেশি। মেশিনে তৈরি চুড়ি, চেইন ও ব্রেসলেট সাধারণত ২২ ক্যারেটের হয়ে থাকে। তবে মেশিনে ২১ ও ১৮ ক্যারেটের অলংকারও তৈরি করা যায়। বেশি নকশা এবং ঝালাইয়ের প্রয়োজন হয় এমন অলংকারে তুলনামূলক কম ক্যারেটের সোনা ব্যবহারের প্রবণতা রয়েছে।
কোন ক্যারেটের সোনার অলংকার কেনা লাভজনক এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান আমিনুল ইসলাম বলেন, যেকোনো ক্যারেটের সোনার অলংকার কেনা যেতে পারে। কম ক্যারেটের সোনা মানেই নিম্নমানের এমন ধারণা সঠিক নয়। বিদেশে ৯ ক্যারেটের অলংকারও তৈরি হয়।
তবে যে ক্যারেটের অলংকারই কেনা হোক না কেন, সেটি হলমার্ক করা কি না, তা অবশ্যই দেখে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি ক্যাশমেমোতে ক্যারেট ও অন্যান্য তথ্য উল্লেখ আছে কি না, সেটিও যাচাই করতে হবে। জুয়েলার্স সমিতির সদস্য প্রতিষ্ঠান থেকে অলংকার কেনার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশে বেসরকারিভাবে ‘বাংলা গোল্ড’ ও ‘ঢাকা গোল্ড হলমার্ক’ নামের দুটি প্রতিষ্ঠান সোনা পরীক্ষা করে হলমার্ক করে থাকে বলে জানিয়েছেন দেওয়ান আমিনুল ইসলাম। পরীক্ষায় সোনার যে ক্যারেট পাওয়া যায়, সে অনুযায়ী অলংকারে লেজারের মাধ্যমে তা খোদাই করা হয়। পাশাপাশি দেওয়া হয় একটি সনদ, যা সংশ্লিষ্ট জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত থাকে।
ঢাকার বাইরের অনেক ব্যবসায়ী সোনার বিশুদ্ধতা যাচাইয়ে ‘টোনস মেশিন’ ব্যবহার করেন। জুয়েলার্স মালিকদের ভাষ্য, এই মেশিনে সোনার বিশুদ্ধতার কাছাকাছি তথ্য পাওয়া যায়।
হলমার্ক করা অলংকার ও ক্যাশমেমো থাকলে পরবর্তী সময়ে সোনা বিক্রি করাও তুলনামূলক সহজ হয়। পুরোনো অলংকার বিক্রির ক্ষেত্রে ১৮ শতাংশ এবং পুরোনো অলংকার দিয়ে নতুন অলংকার তৈরির ক্ষেত্রে ১২ শতাংশ বাদ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে।
এদিকে সোনার দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কম ক্যারেটের সোনা ও অন্যান্য ধাতু দিয়ে তৈরি অলংকারের চাহিদাও বাড়ছে। ব্রোঞ্জের সঙ্গে দুই থেকে তিন আনা সোনা মিশিয়ে তৈরি করা ‘সোনার’ চুড়ি ও বালা কিছু এলাকায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে এসব পণ্যে প্রকৃতপক্ষে কতটুকু সোনা রয়েছে, তা পরিমাপের নির্দিষ্ট মাপকাঠি না থাকায় গ্রাহকের প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এ কারণে গত ১০ সেপ্টেম্বর থেকে দেশের জুয়েলারি দোকানগুলোতে ব্রোঞ্জের সোনার চুড়ি ও বালা বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে জুয়েলার্স সমিতি। একই সঙ্গে গ্রাহকদেরও এ ধরনের পণ্য না কেনার অনুরোধ জানিয়েছে সংগঠনটি।
অন্যদিকে ঢাকার বাইরে কিছু এলাকার গুটিকয়েক জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান সমিতির নির্ধারিত দামের তুলনায় কম দামে সোনার অলংকার বিক্রির প্রস্তাব দিচ্ছে। অনলাইনেও মাঝেমধ্যে কম দামে সোনার অলংকার বিক্রির আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেখা যায়। অলংকার সরাসরি না দেখে অনেকে এসব বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়ে অর্ডারও করছেন।
দেওয়ান আমিনুল ইসলামের মতে, জুয়েলার্স সমিতির নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামে সোনা বিক্রির বাস্তবসম্মত সুযোগ নেই। কেউ কম দামে বিক্রি করলে সোনার মানে কোনো ধরনের ঘাপলা থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি। তাই যাচাই-বাছাই ছাড়া এমন বিক্রেতার কাছ থেকে সোনা কেনা উচিত নয়।
সোনা যেহেতু অত্যন্ত মূল্যবান ধাতু, তাই অলংকার কেনার সময় শুধু দাম নয়, ক্যারেট, হলমার্ক, ক্যাশমেমো, বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ভবিষ্যতে বিক্রির শর্ত সবকিছু যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরটিভি/এসকে



