
কখনো কখনো বাস্তব জীবনের গল্পও হার মানায় সিনেমার কাহিনীকে। তেমনই এক অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছে নেদারল্যান্ডসে বেড়ে ওঠা দুই নারীর জীবনে। দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ দুই বান্ধবী মিনা গেলটিঙ্ক ও মিনাল টিজেন ৩০ বছর পর ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে জানতে পারেন তারা আসলে একই বাবা-মায়ের সন্তান, অর্থাৎ আপন বোন।
আশির দশকে ভারতের মুম্বাইয়ে জন্ম নেওয়া মিনা ও মিনালকে জন্মের কয়েক মাস পর দুটি আলাদা অনাথ আশ্রম থেকে দুই ডাচ দম্পতি দত্তক নেন। এরপর নেদারল্যান্ডসের কাছাকাছি এলাকায় বড় হন তারা।
কৈশোরের শুরুতে একটি দত্তক গ্রহণকারী সংস্থার অনুষ্ঠানে প্রথম দেখা হয় তাদের। প্রথম দেখাতেই দুজনের চেহারা ও অঙ্গভঙ্গিতে অদ্ভুত মিল দেখে অবাক হয়েছিলেন তারা। বন্ধুদেরও বিষয়টি চোখে পড়ে। এমনকি মিনা তখন বলেছিলেন, মিনালের নাক ও হাসি তাঁর নিজের মতো।
সেই সাক্ষাতের পর ফোন নম্বর ও ঠিকানা বিনিময় করেন তারা। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে গভীর বন্ধুত্ব। বছরের পর বছর একে অপরকে চিঠি লিখেছেন। চিঠিতে নিজেদের স্কুল, বন্ধু, সম্পর্ক, ভ্রমণ, নাচ, খেলাধুলা ও সংগীত নিয়ে কথা বলতেন। মজার বিষয়, দুজনেরই প্রিয় ব্যান্ড ছিল ব্যাকস্ট্রিট বয়েজ।
তবে প্রায় ১৫ বছর আগে তাঁদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মিনাল ফ্রান্সে চলে যান। অন্যদিকে, প্রথম সন্তানের মা হওয়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন মিনা।
২০১৭ সালে ভারতে জন্ম নেওয়া দত্তক সন্তানদের একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে মিনা ডিএনএ পরীক্ষার বিষয়ে জানতে পারেন। পরে নিজেও পরীক্ষা করান। তবে তখন কোনো উল্লেখযোগ্য মিল পাওয়া যায়নি। একসময় ফোনের মেমোরি পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় তিনি ডিএনএ পরীক্ষার অ্যাপটিও মুছে দেন।
এরপর চলতি বছরের ২০ মে ফেসবুকে মিনালের একটি বার্তা পান মিনা। সেখানে লেখা ছিল, আমাকে মনে আছে?
বার্তার সঙ্গে মিনাল তার ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলের একটি স্ক্রিনশটও পাঠান। তিনি এপ্রিল মাসে নেদারল্যান্ডসে নিজের দত্তক বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে ডিএনএ পরীক্ষা করেছিলেন।
বার্তা পাওয়ার পর মিনা আবার সেই অ্যাপ ইনস্টল করেন। ফলাফল দেখে তিনি হতবাক হয়ে যান। পরীক্ষায় দেখা যায়, তাদের ডিএনএ শতভাগ মিলে গেছে। অর্থাৎ তারা একই জৈবিক বাবা-মায়ের সন্তান।
মিনা বলেন, ফলাফল দেখে তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন। তার ভাষায়, মিনাল যেন তাঁর জীবনের হারিয়ে যাওয়া ধাঁধার সেই অংশ, যার জন্য তিনি এতদিন অপেক্ষা করছিলেন।
এরপর আগস্টের এক রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে দুই পুরোনো বন্ধু প্রথমবারের মতো বোন হিসেবে দেখা করেন। তাদের সেই আবেগঘন পুনর্মিলনে ছিল কান্না, আলিঙ্গন আর হাসি। এরপর তারা একসঙ্গে প্রথমবারের মতো সেলফিও তোলেন।
তিন সন্তানের মা মিনা বলেন, অসাধারণ অনুভূতি ছিল। মনে হলো, ঘরে ফিরে এসেছি।
ফ্রান্সে সঙ্গী ও দুই ছেলেকে নিয়ে থাকা মিনালও বিষয়টিকে অবিশ্বাস্য বলে মনে করেন। তিনি বলেন, বোন হওয়ার আগে আমরা বন্ধু ছিলাম। আমরা পুরো সময়টাই বোন ছিলাম, শুধু আমরা তা জানতাম না।
ডিএনএ পরীক্ষার পর থেকে দুজন প্রায় এক দিন পরপর কথা বলছেন। তারা একে অপরের পরিবার, সন্তান, সঙ্গী এবং বাবা-মায়ের সঙ্গেও দেখা করেছেন। তাদের কথাবার্তা ও আচরণেও রয়েছে বিস্ময়কর মিল। পরিবারের সদস্যরা লক্ষ্য করেছেন, তারা একে অপরের কথা শেষ করে দেন, একইভাবে মাথা নাড়েন এবং হাঁটেন।
মিনা জানান, তাদের এখন সবচেয়ে বড় ইচ্ছা যে জায়গা থেকে তাদের গল্পের শুরু, সেখানে আবার একসঙ্গে ফিরে যাওয়া। কোনো একদিন তাঁরা ভারতে গিয়ে মুম্বাইয়ের রাস্তায় পাশাপাশি হাঁটতে চান।
তবে এত বছর একে অপরের পাশে থাকতে না পারার আক্ষেপও রয়েছে মিনার। জীবনের কঠিন সময়ে বাবাকে হারানো কিংবা কোনো সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার মতো মুহূর্তে দুজন কেউই জানতেন না, তা দের পাশে থাকার মতো একজন আপন বোন পৃথিবীর অন্য প্রান্তে রয়েছেন।
দীর্ঘ তিন দশকের বন্ধুত্বের পর ডিএনএ পরীক্ষা তাদের সম্পর্কের নতুন পরিচয় দিয়েছে। বন্ধুত্ব থেকে বোনত্বে বদলে যাওয়া এই গল্প যেন প্রমাণ করে রক্তের সম্পর্ক কখনো কখনো অজান্তেই মানুষকে একে অপরের কাছে টেনে রাখে।
আরটিভি/এসকে


