
ছাত্রীর সঙ্গে পরকীয়ায় বাধা দেওয়ায় স্ত্রীকে মারধর ও গরম পানি ঢেলে হাত ঝলসে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় চট্টগ্রাম আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী নিশাত জাহান (৩০)।
শনিবার (২৩ ডিসেম্বর) দুপুরে মামলার বিষয়ে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন ভুক্তভোগী নিজেই। নিশাত জাহান চবির বাংলা বিভাগে এমফিল কোর্স করছেন। তিনি জামালপুর সদর থানার আরামবাগ বোস পাড়ার এস এম নজরুল ইসলামের মেয়ে। অভিযুক্ত অনাবিল ইহসান চবির সংগীত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক।
এদিকে নিয়মিত মামলা হিসেবে রেকর্ড করে তদন্তের জন্য হাটহাজারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) আদেশ দিয়েছেন আদালত।
আদালত সূত্রে জানা যায়, গত ২২ নভেম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক জান্নাতুল ফেরদাউস চৌধুরীর আদালতে মামলাটি দায়ের করা হয়। এরপর আদালতের আদেশ পেয়ে ৫ ডিসেম্বর ৩ আসামির বিরুদ্ধে হাটহাজারী থানায় মামলা দায়ের করা হয়।
মামলায় চবি শিক্ষক অনাবিল ইহসান ছাড়াও তার মা শরীফা আক্তার বানু (৫৩) এবং বাবা মো. আব্দুল খালেক বিশ্বাসকে (৬০) আসামি করা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে তথা দহনকারী গরম পানির মাধ্যমে ভুক্তভোগীর হাতের ক্ষতি, যৌতুকের দাবিতে মারাত্মক জখম ও সহায়তার অপরাধ-মামলায় উল্লেখ করা হয়।
মামলার এজাহারে লেখা হয়েছে, ২০১৯ সালের ১১ অক্টোবর পারিবারিকভাবে নিশাত জাহানের সঙ্গে অনাবিলের বিয়ে হয়। বিয়ের সময় বরযাত্রী আপ্যায়নের পাশাপাশি নিশাতের পরিবারের পক্ষ থেকে অনাবিলকে ৩৭ প্রকারের ফার্নিচার ও তৈজসপত্র উপহার দেওয়া হয়। বিয়ের সময় দেনমোহর ২ লাখ টাকা ধার্য করে এই মূল্যের স্বর্ণালঙ্কার নিশাতকে দেওয়া হয়। বিয়ের পর নিশাতকে অনাবিলের গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নিশাতের স্বর্ণালঙ্কার খুলে নেন তার শ্বশুর-শাশুড়ি। এরপর থেকে নানা সময় অনাবিলের জন্য মোটরসাইকেল এবং ভালো জিনিসপত্র উপহার না দেওয়ায় নিশাতকে অপমান করতেন শ্বশুর-শাশুড়ি।
একপর্যায়ে অনাবিল তার স্ত্রীকে নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট এলাকায় চলে আসেন। সেখানে আসার পর থেকে অনাবিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে জমি কেনার জন্য নিশাতকে তার বাবা ও ভাইয়ের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা এনে দিতে বলেন। বাসায় চাপ সৃষ্টি করে নিশাতকে কথায় কথায় মারধর করতেন অনাবিল।
এরই মধ্যে আসামি অনাবিল সংগীত বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। দুজনের মধ্যে আদান-প্রদান করা নানা মেসেজ দেখেন নিশাত। বিষয়টি অনাবিলের বাবা-মাকে জানালেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেননি। এসব বিষয় নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ১২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় চা বানানোর সময় নিশাতকে মারধর ও হাতে ফুটন্ত চায়ের পানি ঢেলে দেন অনাবিল। এতে নিশাতের বাম হাতের কনুই থেকে নিচের অংশ ঝলসে যায়। পরে ভুক্তভোগী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টার এবং সেখান থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
এ বিষয়ে নিশাত জাহান বলেন, আমার স্বামীর পরকীয়ার বিষয়টি গত ১০ সেপ্টেম্বরে জানতে পারি। এর দুদিন পর বিষয়টি নিয়ে তার সঙ্গে আমার বাগবিতণ্ডা হয়। এক পর্যায়ে তিনি আমাকে মারধর এবং গরম চা ঢেলে আমার হাত ঝলসে দেয়।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ, ডিন, প্রক্টর অফিস ও শিক্ষক সমিতিতে এই ঘটনার সমাধান চেয়ে অনুলিপি দিয়েছি। উপাচার্যের কার্যালয়েও গিয়েছে। এতেও সমাধান না হওয়ায় আমি আইনি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছি। তবে স্বামী অনাবিলের সঙ্গে তালাকের বিষয়টি অস্বীকার করেন নিশাত জাহান। তিনি বলেন, আমি কোনো আইনি নোটিশ পাইনি।
তবে স্ত্রীকে মারধর ও প্রেমের অভিযোগটি অস্বীকার করে চবি শিক্ষক অনাবিল ইহসান বলেন, আমি আমার স্ত্রীকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া মেনে গত ২৩ অক্টোবর তালাক দিয়েছি। দুই মাস পর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে সে আমার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এ ছাড়াও আমার সম্মানহানি করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্ষদে অভিযোগ দাখিল করে।
পরকীয়া অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। যার কথা নিশাত বলতে চাইছে, সে আমার ছাত্রী। আমার নৈতিক অবস্থানের দিক থেকে এটা কখনোই সম্ভব না।
হাটহাজারী থানার ওসি মনিরুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, মামলার তদন্ত চলছে। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




