
এক ব্যাগ রক্ত, অসংখ্য জীবনের আশা
রাত গভীর। হাসপাতালের করিডোরে উদ্বিগ্ন স্বজনদের ছোটাছুটি। অপারেশন থিয়েটারের বাইরে অপেক্ষা, একটাই প্রশ্ন—“রক্ত পাওয়া যাবে তো?” ঠিক এমন অসংখ্য সংকটময় মুহূর্তে নীরবে পাশে দাঁড়িয়েছে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি) ব্লাড ব্যাংক। প্রচারের আলো নয়, মানবতার দায়বদ্ধতাকেই শক্তি হিসেবে নিয়ে ২০১৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর কয়েকজন স্বপ্নবাজ শিক্ষার্থীর হাত ধরে শুরু হয়েছিল এই পথচলা। করোনা মহামারির দুঃসময়ে যখন রক্তের সংকটে অসহায় হয়ে পড়েছিল বহু মানুষ, তখনও থেমে থাকেনি এই সংগঠন। জরুরি রক্তের ব্যবস্থা করা, স্বেচ্ছায় রক্তদাতা খুঁজে দেওয়া এবং মানুষকে রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে যবিপ্রবি ব্লাড ব্যাংক আজ শুধু একটি সংগঠনের নাম নয়, হাজারো মানুষের আস্থার প্রতীক। দীর্ঘ পথচলার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে পূর্ণাঙ্গ অনুমোদন লাভের পর বর্তমানে চতুর্থ কার্যনির্বাহী পরিষদের নেতৃত্বে আরও সুসংগঠিতভাবে এগিয়ে চলছে মানবতার এই যাত্রা।
আড়াই হাজারের বেশি রক্তদান, দুই হাজারের বেশি মানুষের ফ্রি ব্লাড গ্রুপিং
পূর্ণাঙ্গ অনুমোদনের পর ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত যবিপ্রবি ব্লাড ব্যাংকের মাধ্যমে আনুমানিক আড়াই হাজারেরও বেশি ব্যাগ রক্ত রোগীদের কাছে পৌঁছেছে। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি, কারণ অনেক শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত উদ্যোগে রক্তদান করলেও তা সব সময় ডেটাবেজে যুক্ত হয় না। একই সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে আয়োজিত ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে দুই হাজারেরও বেশি মানুষের বিনামূল্যে ব্লাড গ্রুপিং করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে ৭০০-এর বেশি, ২০২৪ সালে ১৫০-এর বেশি, ২০২৫ সালে দুটি পৃথক ক্যাম্পেইনে ১৫০ ও ২০০-এর বেশি এবং ২০২৬ সালে দুটি বড় আয়োজনে ২৫০ ও ১৫০-এর বেশি মানুষের রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করা হয়। প্রতিটি আয়োজনেই রক্তদানের গুরুত্ব, নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে অন্তত ৫০ জন যবিপ্রবি শিক্ষার্থী নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদান করছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, যশোর শহরের সবচেয়ে বড় স্বেচ্ছায় রক্তদাতা কমিউনিটিগুলোর একটি এখন যবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের নিয়েই গড়ে উঠেছে।
রক্তদান ছাড়িয়ে মানবিকতার বিস্তৃত পরিসর
যবিপ্রবি ব্লাড ব্যাংকের কার্যক্রম কেবল রক্ত সংগ্রহ বা রক্তদাতা ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীনবরণ ও বিদায় সংবর্ধনায় স্বাস্থ্য ও রক্তদানবিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রম, ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্পেইন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ফ্রি ব্লাড গ্রুপিং, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এবং ডোনার সংবর্ধনার মতো বিভিন্ন আয়োজন নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে। এ ছাড়া যবিপ্রবি স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে ব্লাড গ্রুপিং ক্যাম্পেইন ও স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক আলোচনা সভার মাধ্যমে ছোটবেলা থেকেই মানবিক মূল্যবোধ ও স্বেচ্ছায় রক্তদানের গুরুত্ব তুলে ধরা হচ্ছে। গত বছর থেকে নিয়মিত রক্তদাতাদের সম্মান জানাতে চালু হয়েছে ‘সিলভার হার্ট অ্যাওয়ার্ড’ ও ‘গোল্ডেন হার্ট অ্যাওয়ার্ড’, যা নতুন প্রজন্মকে রক্তদানে আরও উৎসাহিত করছে।
একটি সংগঠন নয়, মানবতার এক অনন্য আন্দোলন
এই দীর্ঘ যাত্রায় প্রথম কার্যনির্বাহী পরিষদে নেতৃত্ব দেন মোস্তাফিজুর রহমান ও প্রান্ত কুমার। দ্বিতীয় পরিষদে ছিলেন ফারুক হোসেন ও জুয়েল রানা, তৃতীয় পরিষদের নেতৃত্বে ছিলেন মাসুম বিল্লা ও মুর্তজা বশির এবং বর্তমানে চতুর্থ কার্যনির্বাহী পরিষদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জসিম উদ্দীন ও সাকলায়েন মোস্তাক। তাঁদের ধারাবাহিক নেতৃত্বে যবিপ্রবি ব্লাড ব্যাংক আজ এমন এক মানবিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে, যেখানে একটি রক্তের ব্যাগ মানে শুধু চিকিৎসার উপকরণ নয়; এটি একজন মায়ের মুখে হাসি, একটি পরিবারের স্বস্তি, একটি শিশুর নতুন জীবন কিংবা মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা একজন মানুষের গল্প। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংগঠন প্রমাণ করেছে, মানবতার সবচেয়ে বড় পরিচয় পদবি বা পরিচয়ে নয়; বরং নিঃস্বার্থভাবে অন্যের জীবনের জন্য এগিয়ে আসার মধ্যেই। সেই বিশ্বাস নিয়েই যবিপ্রবি ব্লাড ব্যাংক আজও লিখে চলেছে মানবতার অনন্য এক ইতিহাস।
আরটিভি/টিআর




