
নতুন ক্যাম্পাসে ভর্তি হওয়ার পর সিনিয়র বড় ভাইদের আড্ডায় প্রথম শুনেছিলাম পুরান ঢাকার এক ঐতিহাসিক জায়গার কথা। ভাইরা বলছিলেন, ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সেখানে ১৭ জন মানুষকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে হত্যা করেছিল। শহীদদের সেই বীরত্বগাথা আর আমাদের রক্তভেজা গৌরবময় ইতিহাসকে ধারণ করে জায়গাটি আজও টিকে আছে, হয়ে উঠেছে ইতিহাসপ্রেমীদের এক অনন্যস্থান। ঘর থেকে বের হয়ে পড়লাম একদিন; বাসা কাছেই হওয়ায় ছুটির দিনে দুপুরে হেঁটে হেঁটে রওনা হলাম সেই ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখতে।
রাজধানীর পুরান ঢাকার বাংলাবাজারের সরু গলি আর সদরঘাটের পরিচিত গন্ধ পেরিয়ে মানুষকে জিজ্ঞেস করতে করতে হাজির হলাম কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। চোখের সামনে ভেসে উঠল সুন্দর এক তোরণ, সাইনবোর্ডে বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘বিউটি বোডিং’ ফুলগাছ আর মেহগনি-আমগাছের সুশীতল ছায়ায় পাতা চেয়ার-টেবিলে বসে মানুষের আড্ডা, খুনসুটি আর প্রাণখোলা হাসির মেলা।
একটু এগোতেই নজরে এল ঐতিহ্যবাহী দোতলা ভবনটি। তিন দিকে দেয়ালঘেরা উন্মুক্ত বারান্দা, ওপরের ছাদ যেন খোলা আকাশের নিচে হেঁটে বেড়ানোর এক মুক্ত আঙিনা। প্রাচীন এই ভবনের সূক্ষ্ম কারুকাজ চোখ জুড়িয়ে দেয়। ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির আবহে ছবি তুলতে তরুণ-তরুণীরা এসেছেন বর্ণিল শাড়ি ও পাঞ্জাবিতে; কেউ সেলফি তুলছেন, কেউবা ঘুরে ঘুরে দেখছেন শতাব্দীর ইতিহাস।
তবে সব আনন্দ ও বিস্ময়ের মাঝে সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটির মুখোমুখি হতে হলো প্রাঙ্গণের একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে। গাছের সাথে টাঙানো একটি সাইনবোর্ডে লেখা ‘১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ শহীদ হওয়া বীর সন্তানেরা’। সেখানে শহীদদের পরিচয় ও আত্মত্যাগের স্থান বিস্তারিত উল্লেখ আছে। ঠিক পাশেই একটি বিলবোর্ডে বোর্ডিংয়ের তৎকালীন স্বত্বাধিকারী শহীদ প্রহলাদ চন্দ্র সাহার ছবিসহ লেখা রয়েছে, সেদিন কীভাবে পাকিস্তানি সৈন্যরা এই স্বত্বাধিকারী, তার ম্যানেজার ও বোর্ডারসহ ১৭ জনকে হত্যা করেছিল। লেখাগুলো পড়ার পর অজান্তেই বুকজুড়ে এক গভীর শ্রদ্ধাবোধ ও বিষাদ জাগে।
স্মৃতিফলকের পাশেই রয়েছে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবারের রেস্তোরাঁ। আর তার লাগোয়া একটি ছোট দোকান যেন স্মৃতির এক ছোট মিউজিয়াম। সবকিছু সেখানে কারিগরদের হাতে তৈরি। চোখে পড়ে পরিচিত ব্যক্তিত্বদের স্কেচ, পুরোনো আমলের হ্যারিকেন, মাটির কলস, হাতে তৈরি চামড়ার জুতা, ছোট ব্যাগ, চেরাগ ও কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো চশমা।
হলুদ পলেস্তারার প্রাচীন ভবনের দেয়ালজুড়ে অতীতের কারুকাজ আর চারপাশে ফুলগাছের মিষ্টি সুবাস পুরো পরিবেশকে এক স্নিগ্ধ শান্তিতে ভরিয়ে রেখেছে। প্রবীণ পুরান ঢাকাইয়াদের সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের এই মেলবন্ধনে বসে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চায়ের কাপে চুমুক দিলে মনে হয় যান্ত্রিক শহরের সমস্ত ক্লান্তি মুহূর্তেই ধুয়েমুছে গেল।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকেই বিউটি বোর্ডিং হয়ে উঠেছিল বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতির দিকপালদের প্রাণকেন্দ্র। কবি শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, নির্মলেন্দু গুণসহ বহু গুণীজন ও বুদ্ধিজীবীর পদচারণায় মুখরিত ছিল এই আঙিনা। বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মানুষ’-এর পরিকল্পনার ছক কিংবা বহু কালজয়ী গানের সুর বাঁধাও হয়েছিল এই বিউটি বোর্ডিংয়ের কাঠের টেবিলে বসে।
কিন্তু কালক্রমে ঐতিহ্যবাহী এই জায়গাটির বর্তমান অবস্থা বুক চেপে ধরে। সরু গলির ভেতরে থাকা জরাজীর্ণ এই ভবন আজ সঠিক পরিচর্যা ও সংরক্ষণের অভাবে ধুঁকছে। দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে, জীর্ণ কাঠ আর পুরানো বারান্দাগুলো কোনোমতে টিকে আছে অতীতকে আঁকড়ে ধরে। বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী এই স্থানটি আগলে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রহলাদ চন্দ্র সাহার ছেলে সমর সাহা।
বিউটি বোর্ডিং কেবল কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা কতগুলো ইটের দেয়াল নয়; এটি আমাদের ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতির শেকড়ের গল্প। প্রত্নতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কর্তৃপক্ষের সঠিক সংরক্ষণ ও একটু নজরদারি পেলে শতবর্ষী এই বিউটি বোর্ডিং নতুন প্রাণ পেতে পারে, যা পরবর্তী প্রজন্মকে আমাদের প্রকৃত শেকড় ও ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড় করাবে।
কথা হয় বিউটি বোর্ডিংয়ের বর্তমান পরিচালনা ও দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা সমর সাহার সঙ্গে। স্মৃতিকাতর কণ্ঠে তিনি জানান, একসময় এই বিউটি বোর্ডিং ছিল দেশবরেণ্য কবি, লেখক ও সংস্কৃতিসেবীদের প্রাণবন্ত আড্ডাস্থল। বিউটি বোর্ডিং এর জন্মলগ্ন থেকেই এখানে আড্ডা দিতেন প্রথিতযশা কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাংবাদিক, চিত্রপরিচালক, নৃত্যশিল্পী, গায়ক, অভিনেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। অতীতের সেই জৌলুশ কিছুটা কমলেও পুরান ঢাকার এই অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্যকে স্বচক্ষে দেখতে এবং ইতিহাস ছুঁয়ে দেখতে আজও প্রতিদিন ভিড় জমান দূর-দূরান্ত থেকে আসা পথচারী ও ভ্রমণপিপাসুরা। অনেকে আবার ইতিহাসকে অনুভবে নিতে রাত কাটাতে বোর্ডার হিসেবেও ওঠেন এখানে।
তবে দীর্ঘদিনের এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস টিকিয়ে রাখার লড়াইটা মোটেও সহজ হচ্ছে না বলে জানান সমর সাহা। তিনি আরও বলেন, শতবর্ষী এই বিউটি বোর্ডিংয়ের অমূল্য ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য রক্ষায় এখন পর্যন্ত সরকার দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেয়নি। কর্তৃপক্ষের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মেলেনি কোনো ইতিবাচক সাড়া।তার আশা যে শীঘ্রই সরকার থেকে এর ঐতিহ্য রক্ষার্থে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
আরটিভি/এমএম


