
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) উত্তরণ-২ বাসে ‘জুনিয়র’ হওয়ায় আসন ছেড়ে দিতে চাপ দেওয়ার প্রতিবাদ করায় সাংবাদিক সুজনকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী শিহাব ও জুবায়েরের বিরুদ্ধে। সুজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের শিক্ষার্থী ও স্বাধীন ২৪ নিউজের সাংবাদিক।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ফটকের কাছে এ ঘটনা ঘটে। এতে তিনি আহত হন। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কার্যালয়ে অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী।
জানা যায়, সুজন মিরপুর-১ থেকে উত্তরণ-২ বাসে উঠে আসন খালি থাকায় বসেন। পরে বাংলা কলেজ মোড় থেকে বাসে ওঠেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী শিহাব ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী জুবায়ের। তারা সুজনকে আসন ছেড়ে দিতে বলেন। এ সময় সুজন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন প্রশাসকের নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে জানান, আগে বাসে উঠলে আগে আসনে বসার সুযোগ রয়েছে। বাসে থাকা অন্য শিক্ষার্থীরাও তার আসনে বসে থাকার পক্ষে মত দেন।
একপর্যায়ে বাসটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ফটকের কাছে পৌঁছালে আসন ছেড়ে না দেওয়াকে কেন্দ্র করে সুজনের সঙ্গে শিহাব ও জুবায়েরের বিরোধ হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, এ সময় তারা সুজনকে মারধর করেন। এতে তিনি আহত ও রক্তাক্ত হন। পরে সুজন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কার্যালয়ে গিয়ে ঘটনার বিচার দাবি করেন।
আহত সাংবাদিক সুজন বলেন, ‘আমি নিয়মিত উত্তরণ-২ বাসে যাতায়াত করি। মিরপুর-১ থেকে বাসে উঠে আসন খালি থাকায় বসেছিলাম। পরে শিহাব ও জুবায়ের ভাই আমাকে আসন ছেড়ে দিতে বলেন। আমি তাদের জানাই, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন প্রশাসক স্যার বলেছেন, আগে যে আসবে, সে আগে বসবে। তাহলে আমি কেন আসন ছেড়ে দেব? এরপর তারা আমাকে হুমকি দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস ক্যাম্পাসে পৌঁছানোর পর তৃতীয় ফটকের কাছে তারা আমার ওপর হামলা চালায়। এতে আমি গুরুতর আহত ও রক্তাক্ত হই। পরে প্রক্টর স্যারের কাছে অভিযোগ দিয়েছি।’
এদিকে, ঘটনার বিষয়ে জানতে গেলে উত্তরণ-২ বাসের সভাপতি হৃদয়ের সঙ্গেও অভিযুক্তদের বাগ্বিতণ্ডা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। হৃদয় বলেন, ‘ঘটনার কথা শুনে শিহাব ও জুবায়েরের সঙ্গে কথা বলতে যাই। তখন তারা আমার ওপরও চড়াও হন। তারা বলেন, “ওকে মেরেছি, আপনি কী করবেন, পারলে করেন।” আমি তাদের সিনিয়র হওয়া সত্ত্বেও তারা আমার সঙ্গে এমন আচরণ করেন, এমনকি মারতে আসার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেন।’
অভিযোগের বিষয়ে শিহাব বলেন, ‘আমি তাকে আসন থেকে উঠতে বলেছিলাম, কিন্তু সে ওঠেনি। পরে বাস থামার পর আমরা তাকে আটকাই। সে নাশতা করতে যাবে বললে আমি রেগে গিয়ে তার গায়ে হাত তুলি।’
অন্য অভিযুক্ত জুবায়ের বলেন, ‘বাস থামার পর আমরা তাকে আটকাই এবং কথা আছে বলে জানাই। সে নাশতা করতে যাবে বললে শিহাব তেড়ে এসে তাকে মারধর করে।’
ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির মধ্যস্থতায় অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে মারধরের মতো অভিযোগে সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করাই যথেষ্ট কিনা, তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।
শিক্ষার্থীদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে মারধর, হেনস্তা কিংবা র্যাগিংয়ের মতো অভিযোগ উঠলে শুধু আপসের মাধ্যমে বিষয়টি শেষ করে দেওয়া হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা থেকে যায়। তাদের মতে, কোনো ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে শুধু সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি মিটিয়ে দিলে তা অন্যদের জন্যও ভুল বার্তা দিতে পারে।
শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, বিভিন্ন ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কথা বলা হলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ কতটা হচ্ছে? তাদের মতে, শুধু নোটিশ বা সতর্কবার্তা দিয়ে দায়িত্ব শেষ না করে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন তারা।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন প্রশাসক তারেক বিন আতিক বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনায় কোনো ছাড় দেওয়া উচিত নয়। আমি এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে। প্রক্টর স্যার যে ব্যবস্থা নেবেন, আমরা তার পক্ষেই থাকব। আমি চাই, এ ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক বিচার হোক।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. আজম খান বলেন, ‘আপাতত আমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দিয়েছি। আবারও অভিযোগ এলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে আসনে বসাকে কেন্দ্র করে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রক্টর বলেন, এ বিষয়ে একটি নোটিশ দিয়ে দেওয়া হবে।
আরটিভি/এসএস



