
আন্তর্জাতিক বিনোদনজগতের অন্যতম আলোচিত তারকা কাইলি জেনার। কখনো তার ঠোঁটের আকৃতি, কখনো প্রসাধনী ব্যবসার বিপুল সাফল্য, আবার কখনো প্রেমের সম্পর্ক বছরের পর বছর আলোচনার কেন্দ্রে থেকেছেন তিনি। কার্ডাশিয়ান-জেনার পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্যদের একজন হলেও নিজের পরিচয়কে শুধু পারিবারিক খ্যাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি কাইলি। বরং গত এক দশকে নিজের নামকেই পরিণত করেছেন একটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে।
১০ আগস্ট ২৯ বছরে পা দিয়েছেন কাইলি। জন্মদিন উপলক্ষে বেভারলি হিলসের বাড়িতে আয়োজন করা হয় ‘প্রিন্সেস কিটি’ থিমের বিশেষ পার্টি। গোলাপি সাজে সেখানে হাজির ছিলেন কিম কার্ডাশিয়ান, ক্লোয়ি কার্ডাশিয়ান, কেন্ডাল জেনার ও হেইলি বিবারসহ কাইলির ঘনিষ্ঠজনেরা। তবে তার দীর্ঘদিনের প্রেমিক টিমোথি শ্যালামে অনুষ্ঠানে ছিলেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
কাইলির পরিচিতি শুরু হয় রিয়েলিটি শো ‘কিপিং আপ উইথ দ্য কার্ডাশিয়ানস’ দিয়ে। ছোট বয়স থেকেই ক্যামেরার সামনে বেড়ে ওঠা কাইলি ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন, শুধু রিয়েলিটি শোর তারকা হয়ে থাকলে চলবে না। নিজের জনপ্রিয়তাকে ব্যবসায় কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করেন তিনি।
২০১৫ সালে নিজের উপার্জনের ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার বিনিয়োগ করে শুরু করেন ‘কাইলি কসমেটিকস’। প্রথম পণ্য ছিল লিপ কিট লিপ লাইনার ও লিপস্টিকের জুটি। প্রথম দফার ১৫ হাজার কিট অল্প সময়ের মধ্যেই প্রায় বিক্রি হয়ে যায়।
কাইলির ব্যবসার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার নিজের জনপ্রিয়তা। ইনস্টাগ্রামে নিজের ছবি, মেকআপের ভিডিও এবং নতুন পণ্যের প্রচারণাকে তিনি সরাসরি ব্যবসার বিপণন কৌশলে পরিণত করেন। ফলে একটি প্রসাধনী পণ্যের সঙ্গে যুক্ত হয় তারকার ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড।

এই ব্যবসায়িক মডেল পরবর্তী সময়ে অসংখ্য তারকা ও ইনফ্লুয়েন্সার অনুসরণ করেন। কাইলির ব্যবসায়িক জীবনের বড় মোড় আসে ২০২০ সালে। সে বছর সৌন্দর্যপণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের ৫১ শতাংশ অংশীদারত্ব ৬০০ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়। ফোর্বসের হিসাবে, এই চুক্তি থেকে কর দেওয়ার আগে কাইলির আয় ছিল আনুমানিক ৫৪০ মিলিয়ন ডলার। একই সময়ে তিনি কোম্পানির প্রায় ৪৪ শতাংশ মালিকানা ধরে রাখেন।
এর আগে ২০১৯ সালে ফোর্বস কাইলিকে বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সী ‘সেলফ-মেড বিলিয়নিয়ার’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। কিন্তু পরের বছর সেই হিসাবই প্রশ্নের মুখে পড়ে। ফোর্বস জানায়, কাইলি কসমেটিকসের প্রকৃত বিক্রি ও ব্যবসার আকার পরিবারটির দেওয়া হিসাবের তুলনায় অনেক ছোট ছিল। পরে তাঁর সম্পদের হিসাব নতুন করে করে কাইলিকে আর বিলিয়নিয়ার হিসেবে বিবেচনা করেনি সাময়িকীটি।
২০২০ সালে ফোর্বসের হিসাবে কাইলির সম্পদের পরিমাণ ছিল ৯০০ মিলিয়ন ডলারের সামান্য কম। তবে কাইলি ও তার প্রতিনিধিরা অভিযোগটি প্রত্যাখ্যান করেন। কাইলির দাবি ছিল, বিলিয়নিয়ার পরিচয় পাওয়ার জন্য তিনি কখনো মিথ্যা বলেননি।

ফোর্বসের ২০২৫ সালের হিসাবে কাইলি জেনারের সম্পদের পরিমাণ আনুমানিক ৬৭০ মিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি।কাইলির ব্যবসার পরিধি এখন প্রসাধনীর গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক দূর। ‘কাইলি কসমেটিকস’-এর পাশাপাশি রয়েছে ‘কাইলি স্কিন’। এ ছাড়া পানীয় ও পোশাকের ব্যবসাতেও যুক্ত হয়েছেন তিনি।
২০২৩ সালে চালু হওয়া তার পোশাকের ব্র্যান্ড সাম্প্রতিক সময়ে নতুনভাবে সাজানো হয়েছে। ২০২৬ সালে ব্র্যান্ডটির ব্যবসায়িক মডেল ও নকশায় পরিবর্তন এনে নতুনভাবে বাজারে ফিরেছেন কাইলি। লক্ষ্য দ্রুত বদলে যাওয়া ফ্যাশন ট্রেন্ডের পেছনে না ছুটে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও নিজস্ব পরিচয় তৈরি করা।
ব্যবসার বিভিন্ন পর্যায়েও ব্যক্তিগতভাবে যুক্ত থাকেন কাইলি। পণ্যের নমুনা দেখা থেকে শুরু করে অনুপ্রেরণার বোর্ড তৈরি ব্র্যান্ডের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে।

কাইলিকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল ব্যবসা প্রতিষ্ঠার আগেই। কিশোরী বয়সে তার ঠোঁট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। হঠাৎ ঠোঁটের আকৃতি বদলে যাওয়ার কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে।
২০১৫ সালে কাইলি স্বীকার করেন, তিনি ঠোঁটে অস্থায়ী ফিলার নিয়েছিলেন। তার ভাষ্য ছিল, এটি তার নিজের অনিশ্চয়তার একটি জায়গা ছিল এবং তিনি সেটি পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন।
পরবর্তীতে তার ঠোঁটই হয়ে ওঠে ব্যবসার অন্যতম পরিচয়ের অংশ। কাইলিকে অনুসরণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ‘কাইলি জেনার চ্যালেঞ্জ’। অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে ঠোঁট ফুলিয়ে তার মতো দেখানোর চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায় যে কাইলিকেই ভক্তদের সতর্ক করতে হয়, তাঁকে অনুকরণ করতে গিয়ে যেন কেউ বিপজ্জনক পদ্ধতি ব্যবহার না করেন।
কাইলির জনপ্রিয়তার সঙ্গে বিতর্কও কম নেই। তার মোটা ঠোঁট, নির্দিষ্ট মুখের গড়ন ও শরীরের আকৃতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট সৌন্দর্যের ধারণাকে জনপ্রিয় করেছে বলে দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনা রয়েছে।

২০১৯ সালে যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এএসএ কাইলির ছবি ব্যবহার করে প্রচারিত কয়েকটি প্রসাধনী চিকিৎসার বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করে। ওই বিজ্ঞাপনগুলোতে কাইলির মতো দেখতে হওয়ার দাবি করা হয়েছিল।
তবে সময়ের সঙ্গে সৌন্দর্য নিয়ে কাইলির নিজের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন এসেছে। ২০২৩ সালে ‘দ্য কার্ডাশিয়ানস’-এর এক পর্বে তিনি সৌন্দর্যের মানদণ্ড নিয়ে পরিবারের আরও বড় ধরনের আলোচনা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন। নিজের অতীতের প্রসাধনী পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে মেয়ের ওপর একই ধরনের চাপ না পড়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
কাইলির ব্যক্তিজীবনও বরাবরই আলোচিত। তরুণ বয়সে র্যাপার টাইগার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। ২০১৬ সালে সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। এরপর ২০১৭ সালে র্যাপার ট্রাভিস স্কটের সঙ্গে কাইলির সম্পর্কের খবর সামনে আসে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাঁদের প্রথম সন্তান স্টর্মির জন্ম হয়। ২০২২ সালে জন্ম নেয় তাদের দ্বিতীয় সন্তান, ছেলে আইয়ার। তবে কাইলি ও ট্রাভিসের সম্পর্ক ছিল বারবার ভাঙা-গড়ার। ২০১৯ সালে বিচ্ছেদের পর আবার সম্পর্ক জোড়া লাগলেও ২০২৩ সালের শুরুতে তারা ফের আলাদা হয়ে যান।

তখন তাদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছিল, দুজনের জীবনযাপন ছিল অনেকটাই আলাদা। কাইলি ছিলেন সন্তান ও পরিবারকেন্দ্রিক, অন্যদিকে ট্রাভিসের জীবন ছিল স্টুডিও, রাতের অনুষ্ঠান ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোকে ঘিরে।
ট্রাভিস স্কটের পর কাইলির জীবনে সবচেয়ে আলোচিত নাম টিমোথি শ্যালামে। ২০২৩ সালে তাদের সম্পর্কের খবর প্রকাশ্যে আসে। শুরুতে এই জুটি অনেকের কাছেই ছিল অপ্রত্যাশিত। একদিকে রিয়েলিটি টিভি ও ব্যবসার দুনিয়ার কাইলি, অন্যদিকে হলিউডের অন্যতম আলোচিত অভিনেতা শ্যালামে।
তবে সময়ের সঙ্গে সম্পর্কটি টিকে গেছে। পিপলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিন বছরের বেশি সময় ধরে একসঙ্গে থাকা কাইলি ও টিমোথি এখনো সম্পর্কে আছেন। বিয়ের ব্যাপারেও তারা তাড়াহুড়া করছেন না বলে জানা গেছে।
চলতি বছর অস্কার, ক্রিটিকস চয়েস অ্যাওয়ার্ডস ও বিশ্বকাপ ফাইনালসহ বেশ কিছু বড় আয়োজনে তাদের একসঙ্গে দেখা গেছে। কাইলির বিতর্কের তালিকায় রয়েছে তার ব্যক্তিগত জেট ব্যবহারের বিষয়টিও। ২০২২ সালে খুব স্বল্প দূরত্বের একটি ব্যক্তিগত বিমানযাত্রার তথ্য সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। পরিবেশের ওপর ব্যক্তিগত জেটের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাকে আক্রমণ করেন অনেকে।

তবে এসব বিতর্ক তার জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রেই বিতর্ক তার নামকে আরও বেশি মানুষের সামনে নিয়ে এসেছে।কাইলির ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের অন্যতম বড় শক্তি তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনুসারী। ২০২৬ সালের হিসাবে ইনস্টাগ্রামে তার অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ৩৯ কোটি।
এ বিশাল অনুসারীই কাইলির ব্যবসাগুলোর জন্য কার্যত সরাসরি বিপণনশক্তি হিসেবে কাজ করে। নতুন কোনো লিপস্টিক, পোশাক, সুগন্ধি কিংবা পানীয় বাজারে আনার পর কাইলি নিজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করলেই সেটি মুহূর্তে কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
কাইলির ব্যবসায়িক মডেলের বিশেষত্ব এখানেই। তিনি শুধু পণ্য বিক্রি করেন না; নিজের জীবনধারা, চেহারা, ফ্যাশন ও পরিচিতিকেও পণ্যের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেন।
২৯ বছরে এসে কাইলি জেনারের পরিচয় আর শুধু ‘কার্ডাশিয়ান-জেনার পরিবারের ছোট মেয়ে’ নয়। তিনি এখন উদ্যোক্তা, প্রসাধনী ব্যবসার মালিক, ফ্যাশন ব্র্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অন্যতম প্রভাবশালী তারকা। একই সঙ্গে তিনি দুই সন্তানের মা।

মেয়ে স্টর্মি ও ছেলে আইয়ার এখন তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্যবসা নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নিজের প্রতিষ্ঠানগুলো সন্তানদের হাতে তুলে দেওয়ার স্বপ্নের কথাও জানিয়েছেন কাইলি। বিশেষ করে কাইলি কসমেটিকসকে দীর্ঘস্থায়ী পারিবারিক ব্র্যান্ড হিসেবে দেখতে চান তিনি।
ব্যবসায়িক সাফল্য, প্রেম, বিতর্ক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিপুল প্রভাব সব মিলিয়ে ২৯ বছর বয়সেও কাইলি জেনার যে বিনোদন ও ব্যবসাজগতের আলোচনার কেন্দ্রে, তার জন্মদিনের আয়োজন যেন তারই আরেকটি প্রমাণ।
আরটিভি/এসকে




