
‘ঘেটুপুত্র কমলা’র কমলা চরিত্রে অভিনয় করে দর্শক মনে জায়গা করে নিয়ে ছিলেন অভিনেতা হাসান ফেরদৌস মামুন। শুধু তাই নয় ছবিটিতে দুর্দান্ত অভিনয় করে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতে নেন মামুন। তবে ঘেটুপুত্রের পরই কেমন যেন শোবিজ অঙ্গন থেকে হারাতে শুরু করেন মামুন। ধীরে ধীরে তিনি চলে যান অভিনয় জগতের বাইরে।
এখন অভিনয় ছেড়ে ব্যবসায় মনোযোগ দিয়েছেন মামুন। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী এই শিল্পী সাত বছর ধরে আর ক্যামেরার সামনে দাঁড়াননি। এখন তিনি সময় কাটান মোহাম্মদপুরে ভগ্নিপতির সঙ্গে নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসা নিয়ে। রড-সিমেন্টের হিসাব মেলানোই এখন তার প্রতিদিনের কাজ, যেখানে এক সময় দিন কাটত লাইট, ক্যামেরা আর অ্যাকশনের ভেতর।

সম্প্রতি দেশের এক সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন মামুন। এখনো সেই অভিজ্ঞতাকে স্বপ্ন হিসেবেই স্মরণ করেন এ অভিনেতা। জানালেন, নিজের শোবিজ অঙ্গনের সোনালি দিনগুলোর কথা। সেইসব দিনের স্মৃতিচারণা করে মামুন বলেন, আমাদের দলে অনেকেই অডিশন দিয়েছিল। এতজনের মধ্যে আমি নির্বাচিত হব, তা ভাবিনি। শেষ পর্যন্ত হুমায়ূন স্যার আমাকেই বেছে নেন।
শুটিংয়ের সময় হুমায়ূন আহমেদের আন্তরিকতা তাকে গভীরভাবে ছুঁয়ে গেছে। মামুন বলেন, স্যার সব সময় খেয়াল রাখতেন আমি খেয়েছি কি না। আমি না খাওয়া পর্যন্ত উনি খেতেন না। ঘেটুপুত্র হয়ে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান মামুন। সেই স্মৃতি স্মরণ করে অভিনেতা বলেন, ‘পুরস্কারটি যখন পেলাম, তখন মা বেঁচে নেই। হুমায়ূন আহমেদ স্যারেরও এর আগে মৃত্যু হয়। সব মিলিয়ে দিনটি আমার জন্য খুব কষ্টের ছিল। অনেক কান্না করেছি সেদিন। তাই এ পুরস্কারটি আমার কাছে হারিয়ে অর্জিত পুরস্কার।

বর্তমানে মামুনের বয়স ২৮। তিন বছর আগে বিয়ে করেছেন শৈশবের থিয়েটার-সঙ্গীকে। এখন স্ত্রী ও পরিবার নিয়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুরেই থাকেন। ভগ্নিপতির সঙ্গে পরিচালনা করছেন নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসা। ব্যস্ততা এখন ব্যবসায় ঘিরে থাকলেও মাঝেমধ্যে ইউটিউবে পুরনো কাজ দেখে নস্টালজিয়ায় ডুবে যান।
নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বলেন, এত গুণী মানুষদের সঙ্গে কাজ করতে পেরেছি, সেটাই আমার জন্য বড় পাওয়া। কোনো আক্ষেপ নেই, আলহামদুলিল্লাহ নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি।
মাত্র চার বছর বয়সে বড় বোনের হাত ধরে ‘টোকাই’ নাট্যদলের হয়ে মঞ্চে ওঠেন মামুন। সেই দলের প্রযোজনাগুলোতেই শুরু হয় তার অভিনয়যাত্রা। ছোট পর্দায় অভিষেক হয় বিটিভির ‘হারমোনিয়াম’ নাটক দিয়ে। এরপর আরও কিছু নাটক ও বিজ্ঞাপনে শিশুশিল্পী হিসেবে পরিচিতি পান তিনি।
বিশেষ করে দেশের জনপ্রিয় একটি মোবাইল সিমের বিজ্ঞাপন ‘দিনবদলের পালা’ তাকে দর্শকদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত করে তোলে। সেই বিজ্ঞাপনের সংলাপ—“কি বাবা, বলছিলাম না আজকে অনেক মাছ উঠব, আমারে কিন্তু মেলায় নিয়া যাইতে হবে”—আজও অনেকের মনে নস্টালজিয়া জাগায়।

তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রাণ জুসের বিজ্ঞাপন তার ক্যারিয়ারের বড় বাঁক ঘুরিয়ে দেয়। বিজ্ঞাপনে তার মুখের সংলাপ, তাইলে দশ টাকা দেন, ম্যাঙ্গো জুস খামু—তৎকালীন শিশুশিল্পীদের ভিড়ে আলাদা করে তোলে তাকে। বিজ্ঞাপনটির জন্য মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারে মনোনয়নও পান। এরপর ধারাবাহিকভাবে বেশ কিছু বিজ্ঞাপন ও নাটকে অভিনয় করে জনপ্রিয়তা বাড়ান তিনি।
নাটক ও বিজ্ঞাপনে নিয়মিত কাজের পাশাপাশি সিনেমায়ও ডাক পান মামুন। শফিকুল ইসলামের ‘ওপারে আকাশ’ ছিল তার প্রথম ছবি। এরপর মুরাদ পারভেজের ‘চন্দ্রগ্রহণ’ এবং আবু সুফিয়ানের ‘বন্ধু মায়া লাগাইছে’ ও ‘ভাড়াটে প্রেমিক’-এ অভিনয় করেন। তবে তার জীবনের বড় মোড় আসে হুমায়ূন আহমেদের শেষ চলচ্চিত্র ‘ঘেটুপুত্র কমলা’-তে। অসংখ্য শিশুশিল্পীর মধ্যে অডিশন শেষে ‘কমলা’ চরিত্রের জন্য তাকেই বেছে নেন হুমায়ূন আহমেদ।
২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আটটি বিভাগে পুরস্কৃত হয়। মামুন শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পান। এরপর থেকেই শোবিজে মামুনের উপস্থিতি কমতে থাকে। সর্বশেষ ২০১৮ সালে রুবেল আনুশের ‘প্রেমকাহন’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। এরপর আর কোনো কাজে দেখা যায়নি তাকে।
তিনি জানান, উপযুক্ত চরিত্র না পাওয়ায় নিজে থেকেই অভিনয় থেকে বিরতি নিয়েছেন। যদিও ভালো কাজের সুযোগ এলে আবার অভিনয়ে ফিরতে চান বলেও জানিয়েছেন মামুন।
আরটিভি/এএ




