
‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’, ‘গাড়ি চলে না চলে না’ কিংবা ‘বসন্ত বাতাসে সই গো’ এর মতো অসংখ্য কালজয়ী গানের রচিয়তা বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ ১২ সেপ্টেম্বর।
আজকের এই দিনে তিনি নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও বাংলা ভাষাভাষী ও বাঙালির হৃদয়ে চিরজাগরুক হয়ে আছেন এবং তার সুরের মূর্ছনা আজও বাজছে পৃথিবীর নানা কোণে।
কিংবদন্তি এই বাউলের জন্ম ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামে, যা বরাম হাওর ও কালনী নদীর তীরে অবস্থিত। দরিদ্র দিনমজুর ইব্রাহিম আলী ও নাইওরজান বিবি দম্পতির ছয় সন্তানের মধ্যে একমাত্র পুত্র ছিলেন তিনি। অভাবের সংসারে ছোটবেলা থেকেই তাকে শ্রম দিয়ে উপার্জন করতে হয়েছে এবং কোনো বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জনের সুযোগ পাননি।
পেটের দায়ে গ্রামের মোড়ল বাড়িতে গরু রাখালির কাজ করতে হতো তাকে। ছুটির দিনেও রেহাই না পাওয়ায় ছোটবেলায় তিনি লিখেছিলেন— মাঠে থাকি গরু রাখি, ঈদের দিনেও ছুটি নাই, এই দুঃখ কার কাছে জানাই।
মাঠে গরু চরানোর সময় হাতে থাকা দুই তারা বাজিয়ে তিনি মনের সুখে গান গাইতেন এবং নিজেই গান রচনা ও সুর করতেন। গ্রামের গানপাগল করম উদ্দিনের কাছে তিনি গানের তালিম নেন। পরবর্তীতে করম উদ্দিনের পুত্র ও পৌত্রদের সঙ্গেও তিনি মালজোড়া গানের আসর করেছেন।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও জীবদ্দশায় তিনি দেড় হাজারেরও বেশি গান রচনা ও সুর করেছেন। তার লেখা গান নিয়ে প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘আপ্তাব সংগীত’, ‘গণসংগীত’, ‘কালনীর ঢেউ’, ‘জাতির চিঠি’, ‘কালনীর তীরে’ ও ‘দোলমালা’। এছাড়াও বাংলা একাডেমি তার দশটি গান ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেছে।
শাহ আব্দুল করিম শুধু বাউল গানই নয়, গণমানুষের অধিকার ও সুন্দরের পক্ষেও কলম ধরেছেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১-এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ প্রতিটি গণআন্দোলনে তার গান দেশবাসীকে উজ্জীবিত করেছে। জীবদ্দশায় তিনি একুশে পদক ও চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডসহ দেশ-বিদেশে অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। তবে পুরস্কার বা সম্মানের কখনও তোয়াক্কা করেননি এই নির্মোহ বাউল।
বাউল সম্রাটের একমাত্র ছেলে শাহ নূর জালাল জানান, বাবার মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রতিবছর দেশের নানা প্রান্ত থেকে শত শত বাউল ভক্ত ও সাধক আসেন। আজ তাদের বাড়িতে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে উপজেলা নির্বাহী অফিসার উপস্থিত থাকবেন। সন্ধ্যার পর থেকে ভক্তরা গানে গানে স্মরণ করবেন বাউল সম্রাটকে। তবে ভক্তদের থাকার জায়গা সংকট দূর করতে দশ বছর আগে প্রতিশ্রুত ‘শাহ আব্দুল করিম সংগীতালয় ও কমপ্লেক্স’ প্রকল্পটি এখনও বাস্তবায়িত না হওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন তার পরিবার।
আরটিভি/এসএস


