ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩

ইংরেজি নববর্ষ

যে কারণে ইংরেজি নতুন বছর মাঝরাতে আসে

আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ৩১ ডিসেম্বর ২০২২, ০৬:২৭ পিএম

৩১ ডিসেম্বর রাত ১২টা বাজার পরপরই নানান আয়োজনের মাধ্যমে শুরু হয় ইংরেজি বর্ষবরণ। বিশেষ করে এ সময় চারদিক কাঁপিয়ে বাজি ফুটতে থাকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। আতশবাজির আলোয় আকাশ ঝলমল করে ওঠে।

বাজির শব্দ আর আলো সবাইকে জানিয়ে দেয়, নতুন ইংরেজি বছর এসে গেছে। নতুন বছরটা মাঝরাতে শুরু না হলে কি এত আনন্দ হতো? আকাশ কি আলোয় ঝলমল করে তোলা যেত? এখন তো বোঝার কথা ইংরেজি নতুন বছর কেন মাঝরাতে শুরু হয়!

কিন্তু রাত ১০টায় কি হতে পারত না? না, কারণ তাহলে ভারসাম্য নষ্ট হতো। সূর্যাস্ত আর সূর্যোদয়ের মাঝবরাবর সময়টাকে ধরে নেওয়া হয়েছে মাঝরাত। কারণ, এর পর থেকেই পূর্ব দিগন্তে সূর্যোদয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়। সে জন্যই ইংরেজি নতুন বছর আসে মাঝরাতে।

বাংলা নববর্ষ অবশ্য সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়। কিন্তু সূর্যোদয়ের নির্দিষ্ট সময় থাকে না। ইংরেজি নতুন বছর শুরুর হিসাব ঠিক রাখার জন্য রাত ১২টা থেকে নতুন দিনের শুরু হলো বলে ধরা হয়।

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
বর্ষবরণের রাত অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি থেকে কতটা নিরাপদ
২০২২ শেষে চলে এলো ২০২৩। খ্রিষ্টীয় নতুন বছরকে বরণ করার বৈশ্বিক আয়োজন এখন বঙ্গদেশেও ‘প্রথা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষবরণের এই রাতে দেশের আকাশেও আলোর ফুলকি ছোটে। হাওয়ায় ভাসে ফানুস। চোখে ধরা পড়ে দৃষ্টিনন্দন সব আয়োজন। কিন্তু ঘনবসতির দেশে এসব আয়োজন নিরাপদ নয়। অনেক সময় নতুন বছর উদযাপনের এই আচরণ ঠিক সভ্যতার সীমার মধ্যেও থাকে না। নানান সব আয়োজনের মধ্যে গত কয়েক বছর ধরে বর্ষবরণের নতুন অনুষঙ্গ হিসেবে যোগ হয়েছে ফানুস ওড়ানো। রাতের আঁধারে হাজার হাজার ফানুস দৃষ্টিসীমাজুড়ে নান্দনিকতা তৈরি করলেও অগ্নি দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। আর রাজধানীর উন্মুক্ত স্থানে থাকা বিদ্যুতের তারে গিয়ে ফানুস পড়লেও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আর পুরান ঢাকায় রাসায়নিকের গুদাম থাকায় সেখানে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি আরও বেশি। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্যমতে, শীতের এই সময় আবহাওয়া ও নগরের অবকাঠামো শুষ্ক থাকায় এমনিতেই অগ্নিঝুঁকি বেশি থাকে। আর এ সময় যদি আনন্দের নামে এভাবে ফানুস উড়ালে, এ ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। শুভ ইচ্ছায় উড়িয়ে দেওয়া ফানুস, দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। উড়ন্ত ফানুস কোথায় আটকে যাচ্ছে কিংবা জ্বলন্ত অবস্থায় কোথায় গিয়ে পড়ছে, তা হয়তো জানতেও পারছেন না। এভাবেই ‘দুর্ঘটনা’ ঘটে যেতে পারে যত্রতত্র। এতে ক্ষতি হতে পারে মানুষের জীবনের। তাই এবার রাজধানীতে এসব দুর্ঘটনা এড়াতে কিছু নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। বিশেষ করে ফানুস ওড়ানোর ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। শনিবার (৩১ ডিসেম্বর) পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে থার্টিফার্স্টের নিরাপত্তাসংক্রান্ত ব্রিফিংয়ে ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, ‘থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপনে কোথাও আতশবাজি, পটকা ফোটানো ও ফানুস ওড়ানো যাবে না।’ তিনি বলেন, ঢাকা শহর যেহেতু অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং এর আগেও আমরা দেখেছি ফানুস ওড়ানোর কারণে নানা ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, ফলে এবার আমরা ফানুস ওড়ানো থেকে বিরত থাকার জন্য নির্দেশনা দিচ্ছি। এর ব্যত্যয় হলে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেব। এজন্য থার্টিফার্স্টে রাজধানীজুড়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত সাদাপোশাকে এবং নিজেদের পোশাকে পুলিশ নিয়োজিত থাকবে। ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে চেকপোস্ট বসানো হবে, যেন কোনো ধরনের নাশকতার উদ্দেশে জঙ্গি বা সন্ত্রাসীরা যাতায়াত করতে না পারে। পাশাপাশি উগ্র ও জঙ্গিগোষ্ঠী যেন কোনো ধরনের নাশকতার তৎপরতা চালাতে না পারে, সে জন্য আমরা সতর্ক থাকব। সোয়াট, বম্ব ডিসপোজাল টিম এবং ডগ স্কোয়াড প্রস্তুত থাকবে।’ ২০২১-এর ৩১ ডিসেম্বর ইউসুফ রায়হান নামের এক বাবার ফেসবুক পোস্ট সবার মনে থাকার কথা। তবুও এখানে তুলে ধরছি- ‘কী ভীষণ শব্দে আতশবাজি! আমার ছোট্ট বাচ্চাটি এমনিতেই হার্টের রোগী। আতশবাজির প্রচণ্ড শব্দে শিশু বাচ্চাটি আমার ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে ওঠে। খুব ভয় পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। খুবই আতঙ্কের মধ্যে সময়টা পার করছি।’ পরে তার আরেক পোস্টে জানা যায়, শিশুটিকে ঢাকার হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে নিতে হয় এবং নতুন বছরের প্রথম দিনই মারা যায় সে। অন্যদের আনন্দ উদযাপন নতুন বছরের শুরুতেই একটি পরিবারে শোক ডেকে আনল। শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক আহমেদুর রহমান ফেসবুক পোস্টে লিখেছিলেন- ‘একটা বাচ্চা এসেছে ফানুস ওড়াতে গিয়ে মোম পড়েছে চোখে-মুখে। একজন তরুণের সরাসরি চোখেই আগুন হালকা লেগেছে। একজন পথচারীর মুখ ফানুসের আগুনে পুড়েছে। এক মাদরাসাছাত্র ফানুসের আগুনে বৈদ্যুতিক তার পুড়ছে দেখে সেটা নেভাতে গিয়ে নিজের হাত ইলেকট্রিক বার্ন নিয়ে এসেছে (সেই হাতে একটা বড় অপারেশন লাগবে)। একজন ‘বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু’ আতশবাজি কাছ থেকে দেখতে গিয়ে চোখ-মুখ পুড়িয়েছে; বেচারা তার সমস্যার কথা বলতেও পারছে না। এ রকম বেশ কয়েকজন এসেছেন যাদের পটকায় এক বা একাধিক আঙুল উড়ে গেছে।’ এসব চিত্র এক বছর আগের। এখন আরেকটি থার্টি ফার্স্ট নাইট সন্নিকটে। আমরা কি গতবারের থেকে শিক্ষা নেব? নাকি আগামীকালও শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউট বা অন্য কোনো হাসপাতালে একই করুণ পরিস্থিতি দেখতে হবে? অবশ্যই সেটি কেউ-ই চাই না। কিন্তু আমাদের চাওয়া আর বাস্তবতার মধ্যে অনেক সময় ফারাক থেকে যায়, ফলে আশঙ্কা করতে হয়। হাজার হাজার মানুষ যদি আতশবাজি ফোটায় আর ফানুশ ওড়ায়, তাদের বিরুদ্ধে কীভাবে ব্যবস্থা নেবে পুলিশ। এরপরেও আমরা বিশ্বাস করি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চাইলে সেটি পারে। ২০২২ সালের শুরুতে যে করুণ সংবাদ আমরা পেয়েছি, তার আর না আসুক! তাই ফানুস নামের অনুষঙ্গটিকে বাদ দিয়েই উৎসব করুন। সচেতন মানুষ হিসেবে এটি সকলের দায়িত্ব। তবে মনের আকাশে উড়াতে পারেন কল্পনার ফানুস।
বর্ষবরণের রাত অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি থেকে কতটা নিরাপদ
বিশ্বজুড়ে ইংরেজি নববর্ষ পালনের যত রীতি
কয়েক ঘণ্টা পরেই শেষ হতে যাচ্ছে ২০২২ সাল। এরপর নতুন বছর ২০২৩ সাল। নতুন বছরের আগমনকে ঘিরে উৎসাহ-উদ্দীপনার শেষ নেই। বর্ষবরণের এই রাতে আকাশেও আলোর ফুলকি ছোটে। হাওয়ায় ভাসে ফানুস। দৃষ্টিনন্দন সব আয়োজন। এর মাধ্যমে ২০২২কে বিদায় জানিয়ে ২০২৩ সালকে বরণ করে নেবে বিশ্ব। চলুন জেনে নেওয়া যাক কোন দেশ কীভাবে পালন করে নতুন বছর— স্কটল্যান্ড স্কটল্যান্ডে তিন দিনব্যাপী বর্ষবরণ উৎসব চলে। মানুষ টর্চলাইট হাতে নিয়ে রাস্তায় ‘রিভার অব ফায়ার বা আগুনে নদী’ তৈরি করেন। সেই শোভাযাত্রার তালে চলতে থাকে ড্রাম ও বংশীবাদকের দল। এরপর তারা একটি পারিবারিক মিলনমেলার আয়োজন করে, যেখানে তাদের আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধবরা অংশ নেন। নিজেদের তৈরি মদ পান করেন সবাই। সেই সঙ্গে চলে স্কটিশ মিউজিক ও ট্র্যাডিশনাল নাচ ও গল্প। এই অনুষ্ঠানকে বলা হয় ‘সিলিধ’। সবাই তাদের বন্ধুবান্ধবদের বাসায় লবণ, কয়লা, পাউরুটি ও হুইস্কি ইত্যাদি উপহার হিসেবে নিয়ে যান। ডেনমার্ক ড্যানিশরা নববর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে প্রতিবেশীদের বাড়ির সামনে বাসনপত্র ছোড়াছুড়ি করেন। তাদের বিশ্বাস, যার বাড়ির সামনে সবচেয়ে বেশি বাসন থাকবে, সে সবচেয়ে বেশি সৌভাগ্যবান। কারণ তার সবচেয়ে বেশি ভালো বন্ধু আছে। জার্মানি প্রতিবছর ‘নিউ ইয়ার ইভ’, অর্থাৎ নববর্ষের আগের রাতে জার্মানরা ব্রিটিশ শো ‘ডিনার ফর ওয়ান’ দেখে নববর্ষ উদযাপন শুরু করে। ১৯৭২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এই এক শো দেখে নববর্ষ উদযাপন করছে তারা। স্পেন ১২টি আঙুর খেয়ে স্পেনের মানুষ নতুন বছর বরণ করেন। ৩১ ডিসেম্বর রাত ১২টা বাজার আগেই মাদ্রিদের প্লাজা ডি এস্পানায় জড়ো হয় অসংখ্য মানুষ। তারপর বছরের শেষ ১২ সেকেন্ডে প্রতি সেকেন্ডে একটি করে আঙুর খাওয়া হয়। এভাবেই নতুন বছরকে বরণ করে নেয় স্প্যানিশরা। ইকুয়েডর কাকতাড়ুয়া পোড়ানোর মধ্য দিয়ে ইকুয়েডরে নববর্ষ পালন করা হয়। এভাবে নতুন বছরে খারাপ ভাগ্যকে বিদায় দেন ইকুয়েডরবাসীরা। কাকতাড়ুয়া তৈরি করে প্রতিটি পরিবার মাঝরাতে তা পোড়ায়। তাদের বিশ্বাস, কাকতাড়ুয়া পোড়ালে তা সবার জন্য নতুন বছরে সৌভাগ্য বয়ে আনবে। ফিলিপাইন গোল আকৃতিকে সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করেন ফিলিপাইনের মানুষেরা। তাই নববর্ষে গোল জিনিস দিয়ে মাতিয়ে তোলেন। উপহারে গোল কয়েন দেন। বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে এদিন তারা খান গোলাকৃতির খাবার। জাপান জাপানের মানুষরা নতুন বছরকে বরণ করে নেয় ঘণ্টা বাজিয়ে। মন্দিরের ঘণ্টা ১০৮ বার বাজিয়ে নতুন বছরের আগমন উদযাপন করে তারা। তাদের ধারণা, ১০৮ বার ঘণ্টা বাজালে জীবনের ১০৮টি ইচ্ছা পূরণ হবে ও ১০৮টি বিপদ কেটে যাবে। সুইজারল্যান্ড আইসক্রিম খেয়ে ও মেঝেতে ফেলে বর্ষবরণ করেন তারা। তাদের বিশ্বাস, এতে তাদের জীবনে সৌভাগ্য এবং সমৃদ্ধি আসবে। চীন চীনের বর্ষবরণ উৎসবে থাকে রঙের ছড়াছড়ি। তারা বাড়ির সামনের দরজায় লাল রং করেন। বড়রা লাল খামে টাকা ভরে তাদের ছোটদের দেন। আকাশে দেখা যায়, আতশবাজির ছটা। তাদের মতে, আতশবাজির শব্দ অশুভ আত্মাকে দূরে ঠেলে দেয়। মেক্সিকো মেক্সিকানরাও মৃত ব্যক্তিদের আত্মার সঙ্গে যোগাযোগ করে ও তাদের নববর্ষের শুভেচ্ছা জানায়। তারা বিশ্বাস করে, প্রিয় ব্যক্তিদের আত্মা তাদের কথা শুনতে পায়। তাই মৃত ব্যক্তিদের শুভেচ্ছা জানানোর মধ্য দিয়ে তারা নতুন বছর বরণ করে। আয়ারল্যান্ড আয়ারল্যান্ডের অবিবাহিত নারীরা অদ্ভুত এক রীতি পালন করেন নববর্ষের আগের রাতে। তারা বালিশের নিচে মিস্টলটো নামক লতানো গাছের পাতা রেখে দেয়। তাদের ধারণা, এই পাতা বালিশের নিচে রাখলে তারা ভালো বর পাবে ও দুঃখ-কষ্ট দূর হবে। দুবাই বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু বাড়ি দুবাইয়ের বুর্জ আল খলিফায় নতুন বছর উদযাপনের নানা আয়োজন করা হয়। আলোকসজ্জা ও আতশবাজির মাধ্যমে সেখানে নতুন বছর উদযাপন করা হয়। এর কিছুটা দূরে বুর্জ প্লাজাতেও বিপুল পরিমাণ আতশবাজির মধ্য দিয়ে নতুন বছর উদযাপন করা হয়। লন্ডন জাঁকজমক বর্ষবরণের তালিকায় লন্ডনের অবস্থান বেশ ওপরে। ইংল্যান্ডের টেমস নদীর ওপরের আলোকসজ্জা দেখার মতো দৃশ্যের সৃষ্টি করে। এ ছাড়া নতুন বছরের রাতে টেমস নদীতে ‘রিভার ক্রজ’ বিশেষভাবে আকর্ষণ করে দর্শকদের। ভিয়েতনাম ভিয়েতনামের অধিবাসীরা নতুন জামা পরে বর্ষবরণ করেন। আমস্টারডামে তাদের সবচেয়ে বড় উৎসব উদযাপিত হয়। রাস্তার ধারের রেঁস্তোরা থেকে ‘অলিবলেন’ নামের একধরণের খাবার কিনে খান। এগুলো খেলে নাকি তারা অশুভ জিনিস থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখতে পারবে। এ ছাড়াও, বেলজিয়ামের কৃষকেরা তাদের গরুকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানানোর মাধ্যমে নতুন বছর শুরু করেন। বলিভিয়ার বাসিন্দারা মিষ্টি ও কেকের মধ্যে কয়েন লুকিয়ে রাখেন। যে কয়েনটা খুঁজে পাবে, পুরো বছরটা তার জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনবে। আর কয়েন নদীতে ফেলে নতুন বছর উদযাপন করেন রোমানিয়ানরা।
বিশ্বজুড়ে ইংরেজি নববর্ষ পালনের যত রীতি
কীভাবে এলো ইংরেজি নববর্ষ
২০২২ শেষে চলে এলো ২০২৩। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে আবারও চলে এলো নতুন একটি বছর। থার্টি ফার্স্ট নাইট বা ইংরেজি নববর্ষর প্রথম প্রহরে উৎসব উদযাপনে মেতেছে গোটা বিশ্ব। পুরোনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে বিশ্বব্যাপী পালিত হয় নানা আয়োজন। কিন্তু কীভাবে এলো এই ইংরেজি নববর্ষ? ইংরেজি নববর্ষের ইতিহাস আধুনিক গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার ও জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে জানুয়ারির ১ তারিখ থেকে শুরু হয় নতুন বছর। তবে ইংরেজি নতুন বছর উদযাপনের ধারণাটি আসে খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দে। তখন মেসোপটেমিয় সভ্যতার (বর্তমান ইরাক) লোকেরা নতুন বছর উদযাপন শুরু করে। তারা তাদের নিজস্ব গণনা বছরের প্রথম দিন নববর্ষ উদযাপন করত। তবে রোমে নতুন বছর পালনের প্রচলন শুরু হয় খ্রিষ্টপূর্ব ১৫৩ সালে। পরে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬ অব্দে সম্রাট জুলিয়াস সিজার একটি নতুন বর্ষপঞ্জিকার প্রচলন করেন। যা জুলিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত। রোমে জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের অন্তর্গত বছরের প্রথম দিনটি জানুস দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়। জানুস প্রবেশপথ বা সূচনার দেবতা। তার নাম অনুসারেই বছরের প্রথম মাসের নাম জানুয়ারি করা হয়। এতো গেলো যিশুর জন্মের আগের কথা। যিশুখ্রিষ্টের জন্মের পর তার জন্মের বছর গণনা করে ১৫৮২ সালে পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি এই ক্যালেন্ডারের নতুন সংস্কার করেন। যা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত। বর্তমানে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই কার্যত দিনপঞ্জি হিসেবে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন বছর পালন শুরু হয় ১৯ শতক থেকে। নতুন বছরের আগের দিন অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর হচ্ছে ‘নিউ ইয়ার ইভ’। এদিন নতুন বছরের আগমনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিরাজ করে উৎসবমুখর পরিবেশ। এদিকে ইংরেজি নতুন বর্ষ পালনে ব্যতিক্রমও রয়েছে। যেমন ইসরায়েল, দেশটি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করলেও ইংরেজি নববর্ষ পালন করে না। কারণ বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী অ-ইহুদি উৎস হতে উৎপন্ন এই রীতি পালনের বিরোধিতা করে থাকে। আবার কিছু দেশ গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারকে গ্রহণই করেনি। যেমন- সৌদি আরব, নেপাল, ইরান, ইথিওপিয়া ও আফগানিস্তান। এসব দেশও ইংরেজি নববর্ষ পালন করে না।
কীভাবে এলো ইংরেজি নববর্ষ
মেট্রোরেল পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অগ্রগামী সৈনিক কামরুল ইসলাম সিদ্দিক
বীর মুক্তিযোদ্ধা কামরুল ইসলাম সিদ্দিক। বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়নে তিনি একজন ভ্যানগার্ড বা অগ্রগামী সৈনিক। তাকে বলা হয় গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের রূপকার। গ্রামীণ সড়কব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা এই ব্যক্তিত্ব আরও একটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। রাজধানীর সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়নে আজকের বহুল আলোচিত মেট্রোরেল প্রকল্প পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা কামরুল ইসলাম সিদ্দিক।  স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল বিভাগের প্রথম দিকের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে কামরুল ইসলাম সিদ্দিক গ্রামীণ ও সড়কব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি সাধন করার পর রাজধানীর মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নে অবদান রেখেছেন। কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) ঢাকার জন্য প্রথমবারের মতো মেট্রোরেল নির্মাণের সুপারিশ করা হয়। ২০০৫ থেকে ২০২৫ সাল মেয়াদী এ পরিকল্পনায় তিনটি মেট্রোরেল নির্মাণের সুপারিশ করা হয়, যার একটি উদ্বোধন হয়েছে গত ২৮ ডিসেম্বর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত এই মেট্রোরেলে চড়ে উদ্বোধন করেন। প্রকল্পের এসটিপি তৈরি করেছিল ঢাকা পরিবহন সমম্বয় বোর্ড (ডিটিসিবি)। ডিটিসিবি’র নির্বাহী পরিচালক হিসেবে এসটিপি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিক।  ১৯৬৭ সালে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন কামরুল ইসলাম সিদ্দিক। তিনি কুষ্টিয়া জেলা পরিষদে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৭১ সালে দেশের ডাকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি একইসঙ্গে দুটি মহান কাজ করেছেন। প্রথমত, পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধকালীন বিভিন্ন রাস্তা ও সেতুর নকশা তৈরি এবং বাস্তবায়ন করে সহযোদ্ধাদের বিভিন্ন অপারেশনে প্রকৌশলী হিসেবেও ভূমিকা রেখেছেন।  স্বাধীন বাংলাদেশে কামরুল ইসলাম সিদ্দিক পল্লী কর্মসূচির উপপ্রধান প্রকৌশলী এবং পরে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন নগর নির্মাণ কর্মসূচির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯৮৪ সালে মন্ত্রণালয়ের ওয়ার্কস প্রোগ্রাম উইংকে প্রকৌশল ব্যুরোর রূপ দেওয়া হলে এর কার্যক্রমে তিনি ব্যাপক সংস্কার আনেন। এই সংস্কারের ধারাবাহিকতাতেই ১৯৯২ সালের আগস্টে এলজিইবি রূপ নেয় এলজিইডিতে। সেসময় সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। তার হাত ধরেই দেশের গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসে। ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত তিনি এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন করেন।  কামরুল ইসলাম সিদ্দিক বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন বেসরকারিকরণ কমিশনের চেয়ারম্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।  ঢাকা পরিবহন সমম্বয় বোর্ডে (ডিটিসিবি) নির্বাহী পরিচালক হিসেবে ২০০৩ সালের ১২ মে যোগ দেন কামরুল ইসলাম সিদ্দিক। সেখানে তিনি এসটিপি প্রণয়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এ বিষয়ে তারই সহকর্মী সেসময়ের সংস্থাটির অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. এম এম সালেহউদ্দিন বলেন, এসটিপিতে ঢাকার জন্য ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট বা এমআরটি ও বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট বা বিআরটি অন্তর্ভুক্ত করতে যে ক’জন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম কামরুল ইসলাম স্যার। তিনি একজন কর্মবীর ও মেধাবী মানুষ। তিনি ঢাকার জন্য এমন একটি গণপরিবহন ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন যাতে একসঙ্গে অনেক মানুষকে সেবা দিতে পারে।  কামরুল ইসলাম সিদ্দিককে স্মরণ করে  ড. এম এম সালেহউদ্দিন বলেন, তিনি অতুলনীয়। তিনি সবসময় কর্মতৎপর ছিলেন। ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগেও তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়েছিল। তিনি আমাকে যুক্তরাষ্ট্রে একটি সেমিনারে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তিনি বেঁচে থাকলে গ্রামীণ যোগাযোগের পাশাপাশি নগরের অবকাঠামো উন্নয়নেও বেশি ভূমিকা রাখতে পারতেন। 
মেট্রোরেল পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অগ্রগামী সৈনিক কামরুল ইসলাম সিদ্দিক
মেট্রোরেলের ইতিহাস
মেট্রো শব্দটি ‘প্যারিস মেট্রোপলিটান’-এর একটি সংক্ষিপ্ত নাম যা দ্রুতই মেট্রোতে রূপান্তরিত হয়। এটাকে দ্রুত ট্রানজিট সিস্টেম বলা হয়। ৫৫টি দেশে ১৬৮টি মেট্রো সিস্টেম তালিকাভুক্ত আছে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের রাজধানীতে মেট্রোরেল ব্যবস্থা চালু হয়েছে। যা আনুষ্ঠানিকভাবে ম্যাস র‍্যাপিড ট্রানজিট নামে পরিচিত। ঢাকা মহানগরীর ক্রমবর্ধমান যানবাহন সমস্যা ও পথের যানজট কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ২০১৩ সালে কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। যার অধীনে প্রথমবারের মতো ঢাকায় মেট্রোরেল স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়। পৃথিবীতে মেট্রো সিস্টেমের উৎস, উৎপত্তি ও ইতিহাস ওয়ার্ল্ডের প্রথম শহুরে ভূগর্ভস্থ রেলওয়ে হলো মেট্রোপলিটান রেলওয়ে, যা ১৮৬৩ সালের ১০ জানুয়ারি লন্ডনে মেট্রোপলিটন রেলওয়ে খোলার মাধ্যমে দ্রুত ট্রানজিটের ইতিহাস শুরু হয়। ওই সময় প্যাডিংটন থেকে ফারিংডন পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার বিশেষ রেলপথ খুলে দেওয়া হয় জনগণের জন্য। সঙ্গে সঙ্গে হুমড়ি খেয়ে পড়ে মানুষ। প্রথমদিনেই চলাচল করে ৩৮ হাজার যাত্রী। আর প্রথম বছরে যাতায়াত করে ৯৫ লাখ। দ্বিতীয় বছর সে সংখ্যা দাঁড়ায় এক কোটি ২০ লাখে। এখান থেকেই শুরু মেট্রোরেলের রূপকথার। নর্স পুরাণে উল্লেখিত থরের রথটা যেন বাস্তবেই তৈরি করে ফেলেছে মানুষ। তারপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। লন্ডনের চৌহদ্দি ছাপিয়ে বাতাসের বেগে মেট্রোরেল ছড়িয়ে পড়ে সারা পৃথিবীতে। ইউরোপ শিল্প বিপ্লবের পর রূপকথার মতো সমৃদ্ধি অর্জন করে। বিশেষ করে আয়তন ও জনসংখ্যায় অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে ওঠে লন্ডন। নগরীর রাস্তাগুলোয় ক্রমেই বেড়ে উঠতে থাকে যানজট। প্রতিদিন ভিড় লেগে থাকত গাড়ি ও ট্রেনে। ১৮৫০ সাল নাগাদ অন্তত সাতটি রেললাইন প্রতিষ্ঠার পরও বর্ধমান চাপ সামাল দেওয়া যাচ্ছিল না। নতুন রেলপথ স্থাপনেও নারাজ কর্তৃপক্ষ। বিকল্প হিসেবে আন্ডারগ্রাউন্ড রেল যোগাযোগের ধারণা নিয়ে হাজির হন চার্লস পিয়ারসন। বিল পাস হয় ১৮৫২ সালে। ঠিক পরের বছর রেলওয়ে কোম্পানিগুলোর পরিচালকরা একটা বৈঠক করে ইঞ্জিনিয়ার নিযুক্ত করেন জন ফাউলারকে। টানাপড়েনের পর সংসদ থেকেও পাওয়া যায় অনুমতি। নর্থ মেট্রোপলিটন রেলওয়ে অ্যাক্টের অধীনে ১৮৫৪ সালের ৭ আগস্ট জন্ম নেয় মেট্রোপলিটন রেলওয়ে প্রকল্পের কাজ। ১৮৬২ সালে শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত খরচ পড়েছে ১৩ লাখ পাউন্ড। পরিচালনা পর্ষদের নজরদারি ও নিরাপত্তাবিষয়ক সতর্কতা শেষে ১০ জানুয়ারি পরিবহনের উপযুক্ত ঘোষণা করা হয় মেট্রোরেলকে। অবশ্য যার মস্তিষ্কপ্রসূত এ আয়োজন, সেই চার্লস পিয়ারসন দেখে যেতে পারেননি। ঠিক আগের বছর সেপ্টেম্বরে মৃত্যুবরণ করেন মেট্রোরেলের স্বপ্নদ্রষ্টা। লন্ডনের সফলতার গল্প অনুপ্রেরণা হয়ে কাজ করে পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য। ১৯৭২ সালের জুলাইয়ে নেওয়া হয় নতুন উদ্যোগ ‘দ্য মেট্রোপলিটন রেলওয়ে অব কনস্টান্টিনোপল টু গালাট পেরা’। ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে এর কাজ শেষ হয়। যাত্রী পরিবহন শুরু করে ১৮৭৫ সালের ১৭ জানুয়ারি। আটলান্টিকের অন্য পাশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রেও পৌঁছে যায় জয়রথ। ১৮৯৭ সালে বোস্টনে নির্মিত সাবওয়ে টানেল এখন পর্যন্ত ব্যবহৃত হচ্ছে। আমেরিকার সবচেয়ে পুরোনো মেট্রো প্রকল্প এটি। এর সূত্র ধরেই পরবর্তী সময়ে যাত্রা করেছে আধুনিকতার সাবওয়ে লাইন। বিশেষ করে নিউইয়র্ক শহরে নয় মাইল বিস্তার নিয়ে রয়েছে চার ট্র্যাকের লাইন। দক্ষিণ গোলার্ধে সবচেয়ে পুরোনো সাবওয়ে অবস্থিত আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আয়ার্সে। ১৯১৩ সালে নির্মিত সাবওয়েটি প্রতিদিন ১ লাখ ৯০ হাজার যাত্রী পরিবহন করে। এর ঠিক পাঁচ বছর পরে ১৯১৯ সালের ১৭ অক্টোবর চালু হয় মাদ্রিদ মেট্রো। পৃথিবীর দীর্ঘতম মেট্রোগুলোর একটি এটি। স্পেনের রাজা ত্রয়োদশ আলফানসো নিজে তত্ত্বাবধান করেন প্রকল্পটি। ১৯২৪ সালে চালু হয় বার্সেলোনা মেট্রো। যোগাযোগ ব্যবস্থায় এ আধুনিকায়নের বাতাস আমেরিকা ও ইউরোপের মাটি ছেড়ে হানা দেয় সোভিয়েত ইউনিয়নেও। ১৯৩৫ সালে মস্কোয় প্রতিষ্ঠিত হওয়া মস্কো মেট্রো পৃথিবীর সবচেয়ে নান্দনিক মেট্রোগুলোর একটি। বিশেষ সজ্জা ও আলোকায়নের জন্য মেট্রোর স্টেশনকে ভূগর্ভস্থ স্বর্গ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ২০১২ সালের হিসাব অনুযায়ী, মস্কো মেট্রোয় ৩০৮ কিলোমিটার রেলপথ ও ১৮৬টি স্টেশন। বিশ্বের ব্যস্ততম মেট্রোর তালিকায়ও রয়েছে এর নাম। ২০ শতকের পরবর্তী দিনগুলোয় চারদিকেই ছড়িয়ে পড়তে থাকে মেট্রোরেল। একই সঙ্গে আসতে থাকে বিবর্তন। ১৯৫৪ সালে নির্মাণ শেষ হয় টরন্টো সাবওয়ের কাজ। কানাডার দ্বিতীয় সাবওয়ে হিসেবে মন্ট্রিল মেট্রোর যাত্রা ১৯৬৬ সালে। দক্ষিণ আমেরিকার পরাশক্তি ব্রাজিল অবশ্য এদিক থেকে পিছিয়ে ছিল। মেট্রোর এ মিছিলে দেশটি যুক্ত হয় ১৯৭৪ সালে। কাছাকাছি সময়েই চিলিতে স্থাপিত হয় মেট্রো ডি সান্তিয়াগো। ৮৫টি স্টেশন ও পাঁচটি লাইন নিয়ে নির্মিত এ মেট্রো। দক্ষিণ আমেরিকায় রাবারের টায়ারযুক্ত একমাত্র মেট্রোও এটি। আফ্রিকার দেশ হিসেবে মেট্রোয় প্রথম নাম লেখায় মিসর। ১৯৮৭ সালে কায়রোয় চালু হয় মেট্রোরেল। এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে মেট্রোরেলে নাম লেখায় জাপান। ১৯২৭ সালে সাবওয়ে লাইন প্রতিষ্ঠিত হয় টোকিওতে। মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে ১৯৩৩ সালে ওসাকায় নির্মিত হয় দ্বিতীয় মেট্রো। এ জগতে চীনের যাত্রা দেরিতেই বলতে হবে। দেশটির প্রথম মেট্রো বেইজিং সাবওয়ে যাত্রা করে ১৯৭১ সালে। তবে খুব দ্রুতই তা ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য শহরে। ১৯৭৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার কয়েকটি শহরেও চালু হয় যোগাযোগের এ নতুন স্রোত। ক্রমে যুক্ত হয় আরও কিছু দেশের নাম। সিঙ্গাপুরে ১৯৮৭ সালে প্রথম হেভি রেল সিস্টেম চালু হয়। তাইওয়ানে মেট্রোরেলের যাত্রা ১৯৯৬ সালে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানে মেট্রো চালু হয় ১৯৯৯ সালে, আরব আমিরাতে ২০০৯ ও সৌদি আরবে ২০১১ সালে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের কলকাতা শহরে ২৪ অক্টোবর ১৯৮৪ সালে মেট্রোরেল চালু হয়। শুরু হওয়া প্রকল্প বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছেন এলাট্টুভালাপিল শ্রীধরন। এটি প্রথমে এসপেলেনডি থেকে ভবানীপুর (বর্তমান নেতাজী ভবন) মোট ৩.৪ কিলোমিটার এলাকায় ১৭টি স্টেশনে চলাচল করত। এ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর ১৯৭২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি স্থাপন করা হয়। বর্তমানে কলকাতা মেট্রোর দুটি সক্রিয় যাত্রাপথ রয়েছে, একটি দক্ষিণেশ্বর থেকে কবি সুভাষ পর্যন্ত দীর্ঘ ৩১.৩৬৫ কিমি মেট্রোলাইন এবং অপরটি ৯.১ কিমি দীর্ঘ সল্ট-লেক সেক্টর ফাইভ থেকে শিয়ালদহ মেট্রোলাইন। এখানে ৩৪টি মেট্রো স্টেশন বিদ্যমান, যার মধ্যে ১৭টি স্টেশন ভূগর্ভস্থ, ১৫টি স্টেশন উত্তোলিত এবং ২টি স্টেশন ভূমিগত। এ ছাড়া ২০০২ সালে সম্পূর্ণ আধুনিকতা নিয়ে চালু হয় দিল্লি মেট্রো। মেট্রোরেলের দীর্ঘ ইতিহাস বিবর্তিতও হয়েছে নানাভাবে। যুক্ত হয়েছে নানা রকম সুবিধা। যোগাযোগ ব্যবস্থার বিবর্তনে মেট্রোরেল একটা বিস্ময়কর গল্পের নাম। সেই গল্পে এবার যুক্ত হলো বাংলাদেশের নাম। বাংলাদেশে মেট্রোরেলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড। ২০১৬ সালে প্রণীত সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা অনুসারে ঢাকায় নির্মিতব্য মেট্রোরেলের লাইনের সংখ্যা ৩টি থেকে বাড়িয়ে ৫টি করা হয়। প্রথম পর্যায়ে নির্মাণের জন্য উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০.১ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন ৬-কে নির্বাচন করা হয়। ২০১৬ সালের ২৬ জুন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এমআরটি লাইন-৬ এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। জাইকা ও ডিএমটিসিএল ২০৩০ সাল নাগাদ ১২৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের মোট ৬টি মেট্রো লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। এই নেটওয়ার্কে ৫১টি এলিভেটেড স্টেশন ও ৫৩টি আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশন থাকবে। ছয়টি লাইন মিলিতভাবে দিনে ৪৭ লাখ যাত্রী পরিবহন করতে পারবে। ২০১২ সালের ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার ঢাকা ম্যাস র‍্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট তথা মেট্রোরেল প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন লাভ করে। ২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর এমআরটি-১ নামক লাইনটির নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদিত হয়। এমআরটি-১ প্রকল্পের আওতায় বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর ও নতুনবাজার থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত মোট ৩১.২৪ কিলোমিটার পথে মেট্রোরেল নির্মিত হবে। এমআরটি-১ প্রকল্পে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১৬ দশমিক ২১ কিলোমিটার হবে পাতাল পথে এবং কুড়িল থেকে পূর্বাচল ডিপো পর্যন্ত ১১.৩৬ কিলোমিটার হবে উড়ালপথে। নতুন বাজার থেকে কুড়িল পর্যন্ত ৩.৬৫ কিলোমিটার আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রানজিশন লাইনসহ ৩১.২৪ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণ করা হবে। এই মেট্রোরেলের ১২টি স্টেশন থাকবে মাটির নিচে এবং ৭টি থাকবে উড়াল সেতুর ওপর। এমআরটি লাইন-১ হবে দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল। অবশেষে কাঙ্ক্ষিত প্রতীক্ষার অবসান হলো। স্বপ্ন এখন আর অধরা নয়, রাজধানীবাসীর হাতের মুঠোয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় মেট্রোরেল। বাংলাদেশের ইতিহাসে আজ প্রথমবার ঢাকার উড়াল রেললাইন দিয়ে হর্ণ বাজিয়ে ছুটল সমৃদ্ধ তথ্যপ্রযুক্তির যন্ত্রবাহন মেট্রোরেল। যা এতদিন উন্নত কোনো দেশের আভিজাত্যের প্রতীক ছিল।
মেট্রোরেলের ইতিহাস
আরও পড়ুন
নতুন বছরে জেল নয় প্রেম চাই : কঙ্গনা