
একই বয়সের দুটি শিশু। অথচ তাদের শৈশব দুই রকম। একজনের দিন শুরু হয় স্কুলের পোশাক পরে বই-খাতা গুছিয়ে। অন্যজনের দিন কাটে জীবিকার তাগিদে। একজন বেড়ে ওঠে বই, ইন্টারনেট ও পড়াশোনার অনুকূল পরিবেশে। অন্যজনের শৈশব কাটে অভাব, অপুষ্টি আর অনিরাপদ পরিবেশে। বৈষম্যের দেয়াল তাদের বেড়ে ওঠার পথ আলাদা করে দিচ্ছে।
বাংলাদেশে আজ ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিশু দিবস পালিত হচ্ছে। দেশে প্রতিবছর অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবার দিবসটি পালন করা হয়। শিশু অধিকার ও সুরক্ষার বিভিন্ন দিক সামনে রেখে এবারও দিবসটি পালিত হচ্ছে। তবে উদযাপনের পাশাপাশি দেশের সব শিশু সমান অধিকার ও সুযোগ নিয়ে বেড়ে উঠছে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
আন্তর্জাতিকভাবে জাতিসংঘ ঘোষিত বিশ্ব শিশু দিবস প্রতিবছর ২০ নভেম্বর পালিত হয়। শিশুদের অধিকার রক্ষায় জাতিসংঘ শিশু তহবিল বা ইউনিসেফও ২০ নভেম্বর বিশ্ব শিশু দিবস পালন করে। এ বছরের আন্তর্জাতিক বার্তায় শিশুদের কথা শোনা এবং প্রতিটি শিশুর অধিকার প্রতিদিন রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষায় অগ্রগতি, তবু ঝরে পড়ার উদ্বেগ
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ শিশু তহবিলের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দেশের শিশুদের জীবনযাত্রার একটি বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে।
৬২ হাজার ৯৮০টি পরিবারের নমুনা নেওয়া হলেও সফলভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে ৬১ হাজার ২০৭টি পরিবার থেকে। জরিপে ১৭৩টি সূচক অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, শিক্ষায় অগ্রগতি থাকলেও ঝরে পড়ার চিত্র উদ্বেগজনক। প্রাথমিক স্তরে বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার ৮৫ শতাংশ। নিম্ন মাধ্যমিকে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬০ দশমিক ১ শতাংশে। উচ্চ মাধ্যমিকে এই হার আরও কমে ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে।
উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের বয়সসীমায় ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে। অন্যদিকে, ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মাত্র ৫০ দশমিক ২ শতাংশের ভিত্তিগত পাঠদক্ষতা এবং ৩৯ দশমিক ২ শতাংশের ভিত্তিগত সংখ্যাগত দক্ষতা রয়েছে।
একটি বেসরকারি স্কুলে কর্মরত চাকরিজীবী ও অভিভাবক শাহানা জামান গণমাধ্যমকে বলেন, বাবা-মা চাকরি করলে সন্তানকে সময় দেওয়া কঠিন হয়ে যায়। স্কুলের পড়া, অনলাইন ক্লাস, খাবার ও নিরাপত্তা—সব সামলাতে বাড়তি সহায়তা প্রয়োজন হয়। কিন্তু অনেক পরিবার সেই সুযোগ পায় না। ফলে একই শহরে থেকেও শিশুদের সুযোগের মধ্যে বড় পার্থক্য তৈরি হয়।
বেড়েছে শিশুশ্রম
শিশুদের বৈষম্যের বড় উদাহরণ শিশুশ্রম। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ৯ দশমিক ২ শতাংশ শিশুশ্রমে যুক্ত। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ।
কন্যাশিশুদের জন্য বড় বাধাগুলোর একটি এখনো বাল্যবিবাহ। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়েছে। আর ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ বর্তমানে বিবাহিত।
২০১৯ সালের তুলনায় বাল্যবিবাহের হার কমলেও পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক।
৮৫ শতাংশের বেশি শিশু সহিংস শৃঙ্খলার শিকার
শিশুদের নিরাপত্তার চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৮৫ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু গত এক মাসে শারীরিক শাস্তি বা মানসিক আগ্রাসনসহ সহিংস শৃঙ্খলার অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছে।
এছাড়া পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্মনিবন্ধনের হার ৫৯ দশমিক ২ শতাংশ।
অভিভাবক ও জিম প্রশিক্ষক ফাহমিদা হক গণমাধ্যমকে বলেন, তারা দুজনই চাকরি করেন। সন্তানের জন্য ভালো খাবার ও ভালো স্কুল নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন। তবে শিশুর নিরাপত্তা, মানসিক বিকাশ, সময় দেওয়া এবং সুস্থ পরিবেশও প্রয়োজন। কর্মজীবী বাবা-মায়ের জন্য এসব ক্ষেত্রে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা আরও প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
অপুষ্টিতে ভুগছে অনেক শিশু
শিশুদের পুষ্টির ক্ষেত্রেও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ২৪ শতাংশ খর্বাকৃতির। ১২ দশমিক ৯ শতাংশ দুর্বল ও অতিরিক্ত রোগা এবং ২৩ শতাংশ কম ওজনের।
৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের মাত্র ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য খাবার পাচ্ছে।
নিরাপদ পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। উন্নত পানির উৎস ব্যবহার করলেও নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপিত পানির সুবিধা পাচ্ছে মাত্র ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ। পানির উৎসের ৪৭ দশমিক ১ শতাংশে ই. কোলাই দূষণ পাওয়া গেছে।
এছাড়া ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশের রক্তে উচ্চমাত্রার সিসা পাওয়া গেছে।
অগ্রগতির পাশাপাশি রয়ে গেছে বৈষম্য
সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ শিশু তহবিলের জরিপের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের শিশুদের জন্য অগ্রগতি যেমন হয়েছে, তেমনি বৈষম্য ও ঝুঁকিও রয়ে গেছে।
কোনো শিশু স্কুলে যাচ্ছে, আবার কোনো শিশু শ্রমে যুক্ত। কেউ পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে, কেউ অপুষ্টিতে ভুগছে। কেউ নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে উঠছে, আবার কেউ সহিংসতার শিকার হচ্ছে।
সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, অগ্রগতির পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু এখনো পিছিয়ে রয়েছে। তাদের জন্য প্রয়োজন লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা ও প্রয়োজনীয় সেবার সুযোগ। পারিবারিক বাস্তবতায় শিশুতে শিশুতে পার্থক্য থাকলেও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি সবার জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৬ সালের বিশ্ব শিশু দিবসে শিশুদের অধিকার ও সুযোগের এই বৈষম্য কমানোর বিষয়টিই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
আরটিভি/জেএমএ




