
আজ (২০ অক্টোবর) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদিন। পুরান ঢাকার সদরঘাটের কোলাহল, বাহাদুর শাহ পার্কের ঐতিহাসিক পরিবেশ আর বুড়িগঙ্গার সান্নিধ্যে গড়ে ওঠা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ইতিহাস কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার গল্প নয়; এটি দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের শিক্ষার বিস্তার, সামাজিক পরিবর্তন ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক দীর্ঘ পথচলার আখ্যান। ১৮৫৮ সালে একটি স্কুল হিসেবে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি সময়ের ধারাবাহিকতায় স্কুল থেকে কলেজ, কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সবশেষে পূর্ণাঙ্গ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেয়। নানা পরিবর্তন, সীমাবদ্ধতা ও সংগ্রাম পেরিয়ে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠান আজ দেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে স্বতন্ত্র পরিচয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ব্রহ্ম স্কুল থেকে জগন্নাথ স্কুল
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সূচনা ১৮৫৮ সালে ‘ঢাকা ব্রহ্ম স্কুল’ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। দীননাথ সেন, প্রভাতীচরণ রায়, অনাথবন্ধু মল্লিক ও ব্রজসুন্দর কৈত্রের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি ছিল সাধারণ একটি স্কুল। সে সময় ঢাকায় শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করে।
পরবর্তী সময়ে বিদ্যালয়টির সঙ্গে যুক্ত হন বালিয়াটির জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরী। তার পৃষ্ঠপোষকতা ও উদ্যোগে প্রতিষ্ঠানটির বিকাশের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। তিনি তার বাবা জগন্নাথ রায় চৌধুরীর নাম অনুসারে বিদ্যালয়টির নাম রাখেন ‘জগন্নাথ স্কুল’। প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তন ও স্থানান্তরের সময়কাল নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে কিছু পার্থক্য রয়েছে। তবে কিশোরীলাল রায় চৌধুরীর অবদান প্রতিষ্ঠানটির পরবর্তী বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে। সেই স্কুল থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে আজকের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
১৮৮৪ সালে কলেজে উত্তরণ
শিক্ষার প্রসার এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৮৮৪ সালের ৪ জুলাই জগন্নাথ স্কুলকে কলেজে উন্নীত করা হয়। শুরুতে এটি দ্বিতীয় শ্রেণির কলেজ হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করে। এর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম মাধ্যমিক স্তর পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার পরিসরে প্রবেশ করে।
১৮৮৭ সালে স্কুল ও কলেজের কার্যক্রম পৃথক হয়ে যায়। স্কুল বিভাগটি ‘কিশোরী জুবিলি স্কুল’ নামে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে, যা পরবর্তী সময়ে কে এল জুবিলি স্কুল নামে পরিচিত হয়। অন্যদিকে, জগন্নাথ কলেজ উচ্চশিক্ষার কার্যক্রম অব্যাহত রাখে।
১৯০৭ সালে কলেজটির পরিচালনার দায়িত্ব ট্রাস্টি বোর্ডের হাতে ন্যস্ত হয় এবং ১৯০৮ সালে এটি প্রথম শ্রেণির কলেজে উন্নীত হয়। ধীরে ধীরে এখানে উচ্চশিক্ষার পরিসর বিস্তৃত হতে থাকে। ইংরেজি, দর্শন ও সংস্কৃতসহ বিভিন্ন বিষয়ে সম্মান এবং ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়াশোনার সুযোগ তৈরি হওয়ায় জগন্নাথ কলেজ ঢাকার শিক্ষাঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অর্জন করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় জগন্নাথ কলেজের অবদান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাসেও জগন্নাথ কলেজের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হলে এর প্রাথমিক যাত্রায় জগন্নাথ কলেজের শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং শিক্ষা-উপকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষের ৩০৩ জন শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তরিত হন। পাশাপাশি কলেজটির শিক্ষক এবং গ্রন্থাগারের বইপত্রও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করা হয়। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক একাডেমিক কাঠামো গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে জগন্নাথ কলেজের অবদান ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে এই অবদানের বিনিময়ে জগন্নাথ কলেজকে নিজস্ব উচ্চশিক্ষা কার্যক্রমে বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর কলেজটির ডিগ্রি পর্যায়ে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ হয়ে যায় এবং এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘জগন্নাথ ইন্টারমিডিয়েট কলেজ’। অর্থাৎ, যে প্রতিষ্ঠানটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরুর জন্য শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গ্রন্থাগারের সম্পদ দিয়ে সহায়তা করেছিল, সেই প্রতিষ্ঠানকেই উচ্চশিক্ষার পরিসর সংকুচিত হওয়ার বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জগন্নাথ কলেজের প্রতি এই কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আবাসিক হলের নাম রাখে ‘জগন্নাথ হল’।
আন্দোলন-সংগ্রাম ও জাতীয় ইতিহাসে জগন্নাথ
জগন্নাথ কলেজের ইতিহাস বাংলাদেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসে ভূমিকা অনস্বীকার্য। ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা অংশ নিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও অধিকার আদায়ের ভূমিকা বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠানটিকে জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে জগন্নাথ কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রত্যক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এ ছাড়া ভাষা আন্দোলনের শহীদ রফিক তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। পাকিস্তানি শাসনামলে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ও স্বাধিকার আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতা পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও অব্যাহত থাকে। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও রাজনৈতিক অস্থিরতা, দমন-পীড়ন এবং যুদ্ধের ভয়াবহতার মুখোমুখি হন।
স্বাধীনতার পরও বিভিন্ন জাতীয় ও ছাত্র আন্দোলনে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। ২৪ এর গণ-অভ্যুত্থানেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে এই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার অধিকার, গণতান্ত্রিক পরিবেশ, আবাসনসংকট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বতন্ত্র পরিচয়ের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন জগন্নাথের ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির অতীত কেবল শ্রেণিকক্ষের পাঠদান বা প্রশাসনিক পরিবর্তনের ইতিহাস নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অধিকার আদায়, প্রতিবাদ ও সামাজিক পরিবর্তনের নানা অধ্যায়।
কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়: দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান
জগন্নাথ কলেজকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দাবি দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচিত ছিল। সময়ের সঙ্গে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পরিসর সম্প্রসারণের প্রত্যাশা থেকে এই দাবি আরও জোরালো হয়।
১৯৯৫ সালের ২ নভেম্বর প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের উদ্যোগ নেয় তৎকালীন বিএনপি সরকার। তবে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কার্যক্রম শুরু করতে আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হয়। পরবর্তী সময়ে ২০০৪ সালের ৬ নভেম্বর একনেকের সভায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প অনুমোদন পায়। এরপর প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও এগিয়ে যায়।
অবশেষে ২০০৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাস হয়। একই বছরের ২০ অক্টোবর সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জগন্নাথ কলেজকে পূর্ণাঙ্গ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের প্রক্রিয়া কার্যকর হয়। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা বাস্তব রূপ পায়। ২০০৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম খান বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান। শুরু হয় নতুন প্রশাসনিক ও একাডেমিক অধ্যায়।
২০ বিভাগ থেকে বহুমাত্রিক উচ্চশিক্ষা
বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রার শুরুতে চারটি অনুষদের অধীনে ২০টি বিভাগ নিয়ে কার্যক্রম শুরু করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। কলা, বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও সামাজিক বিজ্ঞান—এই চারটি অনুষদকে কেন্দ্র করে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো। পরবর্তী সময়ে নতুন বিভাগ, অনুষদ ও ইনস্টিটিউট যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে উচ্চশিক্ষার পরিসর বিস্তৃত হয়।
আইন, জীবন ও ভূবিজ্ঞান, চারুকলা এবং অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষার সুযোগ তৈরি হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক বৈচিত্র্য বাড়ে। সময়ের চাহিদা অনুযায়ী পেশাভিত্তিক শিক্ষা, গবেষণা ও নতুন বিষয়ে পাঠদানের সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগও নেওয়া হয়। বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার অন্যতম আকাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিকশিত হওয়ার পাশাপাশি জগন্নাথকে মোকাবিলা করতে হয়েছে নিজস্ব কিছু সীমাবদ্ধতা। পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত মূল ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত আবাসন, শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার, খেলার মাঠ ও অন্যান্য অবকাঠামোগত সুবিধা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা রয়েছে। সীমিত জায়গার মধ্যে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
জবির দ্বিতীয় ক্যাম্পাস
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসনসংকট নিরসন ও আধুনিক শিক্ষাঙ্গন গড়ে তোলার লক্ষ্যে কেরানীগঞ্জে ২০০ একর জমিতে দ্বিতীয় ক্যাম্পাস নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৭ সালে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পায়। দীর্ঘসূত্রতা ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর ২০২৫ সালে প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করা হয়। একই বছরের ৩ জুন অবশিষ্ট ১১ দশমিক ৪০ একর জমি হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে পুরো জমি বুঝে পাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
২০২৬ সালেও ক্যাম্পাসের ভূমি উন্নয়ন, সীমানাপ্রাচীর, অভ্যন্তরীণ সড়ক ও আবাসিক হল নির্মাণের কাজ এবং বিভিন্ন অবকাঠামোর নকশা অনুমোদন নিয়ে কার্যক্রম চলমান রয়েছে। দ্বিতীয় ক্যাম্পাস চালু হলে শিক্ষার্থীদের আবাসন, গবেষণা ও শিক্ষা কার্যক্রমের সুযোগ বাড়বে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তীব্র আবাসনসংকট
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসনসংকটের শিকড় জগন্নাথ কলেজের সময়কার ছাত্রাবাসগুলোর বেদখলের ইতিহাসে। একসময় পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা এসব ছাত্রাবাসে শিক্ষার্থীরা বসবাস করতেন। কিন্তু ১৯৮২ সাল থেকে হল দখলের তৎপরতা বাড়তে থাকে। ১৯৮৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি আরমানিটোলার শহীদ আব্দুর রহমান হলে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের সংঘর্ষের পর তৎকালীন এরশাদ সরকারের আমলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে একাধিক ছাত্রাবাস বন্ধ করে দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা হল ছাড়ার পর ভবনগুলোর নিয়ন্ত্রণ অন্যদের হাতে চলে যায়। কোথাও গড়ে ওঠে মার্কেট, কোথাও স্কুল, গুদাম কিংবা অন্যান্য প্রতিষ্ঠান।
তিব্বত হল, শহীদ আজমল হোসেন হল, শহীদ শাহাবুদ্দিন হল, শহীদ আনোয়ার শফিক হল, ড. হাবিবুর রহমান হল ও নজরুল ইসলাম হলসহ বিভিন্ন ছাত্রাবাস ঘিরে দখল ও মালিকানাসংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হয়। ২০০৫ সালে জগন্নাথ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হলেও শিক্ষার্থীদের আবাসনসংকট কাটেনি। হল উদ্ধারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন করেছেন। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় মেয়েদের জন্য একটি আবাসিক হল প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তী সময়ে মূল ক্যাম্পাসে বাণী ভবন ও ড. হাবিবুর রহমান ভবন নামে দুটি আবাসিক হলের নির্মাণকাজ চলমান।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে হল দুটির নির্মাণকাজ শেষে সেনাবাহিনীর কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে হস্তান্তরের প্রত্যাশা রয়েছে। তবে নতুন হল নির্মাণের উদ্যোগ সত্ত্বেও দীর্ঘদিনের আবাসনসংকট পুরোপুরি কাটবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। শিক্ষার্থীদের তুলনায় আবাসনসুবিধা সীমিত থাকায় অনেককেই এখনো ক্যাম্পাসের বাইরে বাসা বা মেসে থাকতে হচ্ছে। ফলে দেড় শতাব্দীর বেশি সময়ের ঐতিহ্য বহন করা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে আবাসন এখনো দীর্ঘ প্রতীক্ষার বিষয়।
ঐতিহ্যের সঙ্গে আগামীর স্বপ্ন
১৮৫৮ সালের একটি স্কুল থেকে ২০০৫ সালের পূর্ণাঙ্গ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়—জগন্নাথের এই দীর্ঘ যাত্রা একাধিক প্রজন্মের অবদান, সময়ের পরিবর্তন এবং উচ্চশিক্ষার বিস্তারের সাক্ষ্য বহন করে। কিশোরীলাল রায় চৌধুরীর পৃষ্ঠপোষকতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভূমিকা, শিক্ষা কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দীর্ঘ প্রত্যাশা মিলে তৈরি হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির স্বতন্ত্র পরিচয়।
পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আজ অতীতের স্মৃতি ও ভবিষ্যতের প্রত্যাশাকে একসূত্রে ধারণ করছে। একদিকে রয়েছে দেড় শতাব্দীরও বেশি সময়ের ইতিহাস, অন্যদিকে রয়েছে আধুনিক শিক্ষাঙ্গন, উন্নত গবেষণা ও শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা।
দীর্ঘ পথচলার এই ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচয় শুধু তার প্রতিষ্ঠাকাল বা বয়সে সীমাবদ্ধ নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে শিক্ষিত করে তোলা, সমাজের পরিবর্তনে ভূমিকা রাখা এবং নতুন সম্ভাবনার পথ তৈরি করার মধ্য দিয়েই তার প্রকৃত ঐতিহ্য গড়ে ওঠে। সেই ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়েই আগামীর পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের।
আরটিভি/জেএমএ


