
ইতিহাসের পাতায় অদ্ভুত এক শিল্পদুর্ঘটনা ‘লন্ডন বিয়ার ফ্লাড’। ১৮১৪ সালের ১৭ অক্টোবর। হঠাৎ বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে লন্ডনের সেন্ট জাইলস এলাকা। মুহূর্তের মধ্যে রাস্তাঘাট ও আশপাশের ঘরবাড়িতে ঢুকে পড়ে কালচে তরলের বিশাল স্রোত। সেটি বন্যার পানি নয়, হাজার হাজার গ্যালন বিয়ার! ভয়াবহ এ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান আটজন নারী ও শিশু।
ঘটনাটি ইতিহাসে পরিচিত ‘লন্ডন বিয়ার ফ্লাড’ নামে। সেদিন সেন্ট জাইলস এলাকার হর্স শু ব্রুয়ারিতে বিশাল একটি বিয়ারের ট্যাংক ফেটে যায়। মিউক্স অ্যান্ড কোম্পানির মালিকানাধীন কারখানাটিতে কাঠের তৈরি বিশাল ট্যাংকগুলো লোহার বলয় দিয়ে বাঁধা ছিল।
দুর্ঘটনার দিন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে কারখানার কর্মী জর্জ ক্রিক একটি ট্যাংকের লোহার বলয় খুলে যেতে দেখেন। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কিছুক্ষণ পরই ট্যাংকটি বিস্ফোরণের মতো শব্দে ফেটে যায়। এর ধাক্কায় আশপাশের আরও কয়েকটি বিয়ারের পাত্র ভেঙে পড়ে।
সব মিলিয়ে প্রায় ৩ লাখ ২৩ হাজার ইম্পেরিয়াল গ্যালন বিয়ার কারখানা থেকে বেরিয়ে আসে। কারখানার দেয়াল ভেঙে কালচে তরলের বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ে আশপাশের রাস্তায়। সংকীর্ণ গলি পেরিয়ে সেই স্রোত ঢুকে পড়ে মানুষের ঘরবাড়িতে। কোথাও দেয়াল ধসে পড়ে, আবার কোথাও মুহূর্তের মধ্যে বিয়ারে ভরে যায় নিচতলার ঘর ও বেজমেন্ট।
তৎকালীন লন্ডনের দরিদ্র এলাকাগুলোর একটি ছিল সেন্ট জাইলস। সেখানকার অনেক পরিবার ছোট ছোট বেজমেন্টের ঘরে বসবাস করত। আকস্মিক বিয়ারের স্রোতে ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়ে প্রাণ হারান আটজন নারী ও শিশু।
নিহতদের মধ্যে ছিলেন ১৪ বছর বয়সী এলিনর কুপার। পাশের একটি পানশালায় কাজ করা এই কিশোরী ধসে পড়া দেয়ালের নিচে চাপা পড়ে মারা যান। চার বছর বয়সী হান্না ব্যানফিল্ড মায়ের সঙ্গে চা পান করার সময় বিয়ারের স্রোতে প্রাণ হারায়। অন্যদিকে, পাশের একটি বাড়িতে মৃত শিশুর শেষকৃত্যের আগে শোক পালন করতে জড়ো হওয়া কয়েকজন নারীও এ দুর্ঘটনার শিকার হন।
দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আটকে পড়া মানুষদের খুঁজতে থাকেন। স্থানীয় বাসিন্দারা নিহতদের শেষকৃত্য এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সহায়তায় অর্থ সংগ্রহ করেন। কিন্তু কারখানার অবহেলা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য কার্যকর ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা যায়নি।
তদন্তে ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা ও দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির ফল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে কারখানার মালিকপক্ষকে দায়ী করে ক্ষতিপূরণ আদায়ের পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
অন্যদিকে, নষ্ট হয়ে যাওয়া বিয়ারের ওপর আগে পরিশোধ করা শুল্ক ফেরত পেতে সংসদের দ্বারস্থ হয় ব্রুয়ারির মালিকপক্ষ। শেষ পর্যন্ত তারা সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার সুবিধাও পায়। অর্থাৎ ভয়াবহ দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণহানি ও ঘরবাড়ির ক্ষতি হলেও কারখানার আর্থিক ক্ষতির একটি অংশ পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
একসময় যেখানে বিশাল বিয়ারের কারখানা ছিল, সেখানে এখন দাঁড়িয়ে আছে লন্ডনের বিখ্যাত ডমিনিয়ন থিয়েটার। সময়ের সঙ্গে দুর্ঘটনার দৃশ্যমান চিহ্ন মুছে গেলেও ইতিহাসে রয়ে গেছে ১৮১৪ সালের সেই ভয়াবহ বিকেলের স্মৃতি।
বিয়ারের স্রোতে লন্ডনের রাস্তা ভেসে যাওয়ার ঘটনা শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটি ছিল বাস্তব এক শিল্পদুর্ঘটনা। একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দেয়, শিল্পকারখানার নিরাপত্তায় সামান্য অবহেলাও কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে সাধারণ মানুষের জীবনে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
সূত্র: হিস্টোরিক ইউকে, দ্য ড্রিংকস বিজনেস
আরটিভি/এসকে
