ঢাকা সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রধানমন্ত্রীর মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পাঠ

মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান

প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২৭ পিএম
মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান। ছবি: সংগৃহীত

একটি শিশু জন্মগ্রহণ করে খালি হাতে। কোনো মূল্যবোধ নিয়ে সে জন্মায় না। বেড়ে ওঠার প্রতিটি ধাপে চারপাশের মানুষ আর পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ভেতর দিয়ে তার মনে জন্ম নেয় সহানুভূতি। জন্ম নেয় দায়িত্ববোধ। জন্ম নেয় বিনয়ের বীজ। সেই বীজ কে বোনে? উত্তরটা সহজ। বাবা-মা আর শিক্ষক। তাদের বাদ দিয়ে কোনো সমাজে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয় না। তাদের বাদ দিয়ে কোনো নৈতিক শিক্ষাও পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে না।

এই প্রশ্নটিই সম্প্রতি নতুন করে সামনে এনেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এক অনুষ্ঠানে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন শিক্ষক, অভিভাবক, সেলিব্রেটি ও সমাজ সংস্কারকদের সামনে। তার বক্তব্য নিছক একটি রাজনৈতিক ঘোষণা ছিল না। তা ছিল এক ধরনের আত্মজিজ্ঞাসা। প্রশ্নটি ছিল সহজ। দেশ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় এগোচ্ছে। কিন্তু শিশুদের হৃদয়ে কতটা মানবিকতা বোনা যাচ্ছে?

আলাপের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী ফিরে যান নিজের শৈশবে। একদিন বাড়ির এক কর্মচারীকে অপমানজনক ভাষায় সম্বোধন করেছিলেন তিনি। বাবা শহীদ জিয়া বিষয়টি জানতে পারেন। তিনি ছেলেকে কান ধরে সেই কর্মচারীর কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেন। ঘটনাটি ছোট। কিন্তু তার রেশ থেকে যায় বছরের পর বছর। দেশে ফেরার পর তিনি অনুভব করেছেন, ঠিক এই ধরনের পারিবারিক শিক্ষায় একটি ঘাটতি তৈরি হয়েছে সমাজে। এই ব্যক্তিগত স্মৃতিই যেন বেঁধে দেয় গোটা বক্তব্যের সুর। মূল্যবোধ কোনো পাঠ্যবইয়ের অধ্যায় নয় শুধু। তা তৈরি হয় দৈনন্দিন ছোট ছোট মুহূর্তে। একটি কথায়। একটি আচরণে। একটি প্রতিক্রিয়ায়।
ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ থেকে প্রধানমন্ত্রী প্রবেশ করেন সরকারি পরিকল্পনায়। তিনি জানান, আগামী প্রজন্মকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পাঠ্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে নতুন অধ্যায়। সেখানে থাকবে নীতিবোধ। থাকবে সামাজিক মূল্যবোধ। থাকবে পারিবারিক মূল্যবোধও। পাশাপাশি সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশকে। এই ধারণাকে বলা হচ্ছে 'লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস'।

তবে এই পরিবর্তনের ভার তিনি একা পাঠ্যবইয়ের ওপর দিতে চান না। শিক্ষকদের সীমাবদ্ধতার কথা তিনি প্রকাশ্যেই স্বীকার করেন। তাদের সংকটের কথাও বলেন খোলাখুলি। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার। লক্ষ্য একটাই। শিক্ষকরা যেন অর্জিত জ্ঞান শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঠিকভাবে ছড়িয়ে দিতে পারেন। কারণ শিক্ষক আর বাবা-মা, এই দুজনই মূল্যবোধ সৃষ্টির প্রকৃত কেন্দ্রবিন্দু। শ্রেণিকক্ষে যে কাজ শুরু হয়, তার পূর্ণতা আসে ঘরে। পূর্ণতা আসে সহপাঠ্যক্রমিক কার্যক্রমে। পূর্ণতা আসে স্বতঃস্ফূর্ত শৃঙ্খলার চর্চায়।

এই আয়োজনের সবচেয়ে জীবন্ত মুহূর্তটি আসে অন্য জায়গায়। সেটি আসে যখন প্রধানমন্ত্রী সরাসরি কথা বলেন শিশুদের সঙ্গে। তিনি জটিল কোনো নীতিকথা বলেন না। তিনি চান একটি সহজ প্রতিশ্রুতি। প্রতি বছর একটি করে গাছ লাগাতে হবে। স্কুলে হোক বা বাসার আশেপাশে। যেখানেই সুযোগ মেলে সেখানেই।
শুধু গাছ পোঁতাই শেষ কথা নয়। তিনি চান শিশুরা নিজেরাই খুঁজে বের করুক তথ্য। গাছটি কী প্রজাতির? গাছটি কতদিন বাঁচে? গাছটি কতটা অক্সিজেন উৎপাদন করে? গাছটি মানুষের কী কাজে লাগে? এভাবে প্রতি বছর একটি করে নতুন জ্ঞান যোগ হবে শিশুর ভাণ্ডারে। গাছটি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাবে তার চারপাশও। ক্লান্ত বন্ধুরা পাবে ছায়ায় বিশ্রামের জায়গা। বাসার আশেপাশে বইবে ঠান্ডা, সুন্দর বাতাস। তার আহ্বান ছিল সরল-সকলে মিলে চেষ্টা করি, আমাদের এই বাংলাদেশটাকে আরও সবুজ করে গড়ে তুলতে।

গোটা বক্তব্য জুড়ে ঘুরেফিরে আসে একটি শব্দ। শব্দটি হলো নির্দয়তা। মানুষ, পশুপাখি বা প্রকৃতি, কারও প্রতিই যেন শিশুরা নির্দয় না হয়ে ওঠে। এই আশঙ্কা স্পষ্ট প্রধানমন্ত্রীর কথায়। এই আকাঙ্ক্ষাও সমান স্পষ্ট। তার মতে, মুরুব্বিদের প্রতি শ্রদ্ধা জরুরি। অসহায় মানুষকে সহযোগিতা করা জরুরি। বিনয়ী ভাষায় কথা বলাও জরুরি। এই সাধারণ, প্রায় পুরনো ধাঁচের গুণাবলিই আসলে একটি মানবিক সমাজের ভিত্তি। প্রশ্ন থেকে যায় একটি জায়গায়। দ্রুত বদলে যাওয়া সামাজিক বাস্তবতায় এই মূল্যবোধগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে কীভাবে পৌঁছাবে? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তিনি ডাক দেন সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার। সরকার, শিক্ষক, অভিভাবক, সবাইকে।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে আবার ফিরে আসে বাবার প্রসঙ্গ। সময়টা ১৯৮৬ সাল। সৌদি আরবে তখন ওমরাহ পালন করছিলেন তিনি। এক ইন্দোনেশীয় ব্যক্তি বাংলাদেশের পরিচয় শুনে সঙ্গে সঙ্গে উচ্চারণ করেছিলেন জিয়াউর রহমানের নাম। তখন মানুষ শহীদ জিয়া আর বাংলাদেশকে একসঙ্গেই চিনত। সন্তান হিসেবে সেই মুহূর্তে পিতার জন্য তিনি গর্ব অনুভব করেছিলেন। এই ব্যক্তিগত স্মৃতিটুকু একটি কথা আবার মনে করিয়ে দেয়। একটি নাম কীভাবে একটি দেশের পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। আর সেই পরিচয় গড়ে ওঠে ঠিক এমনই ছোট ছোট নৈতিক সিদ্ধান্তের ভেতর দিয়ে।

শেষ পর্যন্ত পুরো আয়োজনটি দাঁড়ায় একটি সরল উপলব্ধির ওপর। কেবল অর্থনৈতিক অগ্রগতি দিয়ে মানবিক বাংলাদেশ গড়া যায় না। কেবল প্রাতিষ্ঠানিক সনদ দিয়েও তা সম্ভব নয়। প্রয়োজন নৈতিক আর পারিবারিক মূল্যবোধের সমান্তরাল বিকাশ। আর এই কাজ কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। এটি কোনো একক মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্ব নয়। শিক্ষক এই গল্পের অংশীদার। অভিভাবকও অংশীদার। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও অংশীদার। এমনকি শিশুরা নিজেরাও এই গল্পের অংশীদার।

শিশুর ভেতর মূল্যবোধ জন্ম থেকে থাকে না। তা বেড়ে ওঠে প্রতিদিনের ছোট ছোট অভিজ্ঞতায়। একটি গাছের যত্নে। একটি ক্ষমা চাওয়ার মুহূর্তে। একজন প্রবীণের প্রতি সম্মানে। আর ঠিক এই জায়গাতেই লুকিয়ে থাকে প্রশ্নটির আসল উত্তর। মানবিক বাংলাদেশ গড়ার কাজ শুরু হয় না বড় কোনো নীতিতে। তা শুরু হয় একটি শিশুর হাতে লাগানো ছোট্ট একটি চারাগাছে।

লেখক: সিনিয়র উপপ্রধান তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদপ্তর।

আরটিভি/এসকে

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
নির্বাচিত সরকার এসেছে, কিন্তু প্রশাসনের পুরোনো বাজার কী বন্ধ হয়েছে
৫ আগস্ট ২০২৪ বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু একটি সরকারের পতনের দিন ছিল না, সেই দিনটির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি বড় প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছিল।
নির্বাচিত সরকার এসেছে, কিন্তু প্রশাসনের পুরোনো বাজার কী বন্ধ হয়েছে
নতুন বেতন স্কেল: সরকারি কর্মচারীর আয় বাড়ল, সাধারণ মানুষের কী
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর এক দশকের বেশি সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ এ বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন বেড়েছে ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ।
নতুন বেতন স্কেল: সরকারি কর্মচারীর আয় বাড়ল, সাধারণ মানুষের কী
সাক্ষাৎকার / ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বিসিক
ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)।
ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নে ঘুরে দাঁড়াতে চায় বিসিক
প্রতিবাদই কি কাল হলো
কখনও কখনও একটি হত্যাকাণ্ড শুধু একটি হত্যাকাণ্ড থাকে না। একটি ঘটনা তার তাৎক্ষণিক পরিণতিকে অতিক্রম করে সমাজ, রাষ্ট্র এবং আমাদের সম্মিলিত বিবেকের সামনে এমন কিছু প্রশ্ন রেখে যায়, যেগুলোর উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। আমিনবাজারের বড়দেশী মদিনা সিটি এলাকায় উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলতাফ হোসেনের নির্মম মৃত্যু তেমনই একটি ঘটনা। ঘটনার শুরু হয়েছিল খুবই তুচ্ছ একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাত আটটার দিকে নিজের ছোট কারখানার কাছে অবস্থান করছিলেন আলতাফ হোসেন। তার পাশেই একটি অটোরিকশা গ্যারেজের সামনে এক প্রবীণ গ্যারেজ মালিক কালামকে ঘিরে ধরেছিল কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল যুবক। একটি রিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির পাশ কাটানোকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বাগ্‌বিতণ্ডা একপর্যায়ে হাতাহাতিতে রূপ নেয়। একজন বয়স্ক মানুষকে প্রকাশ্যে হেনস্তা হতে দেখে তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন পরিস্থিতি শান্ত করতে। এটাই ছিল তার ‘অপরাধ’। তিনি হয়তো তখন ভাবেননি যে একজন মানুষকে অন্যায়ের হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা তাকে নিজের জীবন দিয়ে মূল্য দিতে হবে। হামলাকারীদের থামানোর চেষ্টা করলে তারা উল্টো তার ওপর চড়াও হয়। তিনি নিজেকে পুলিশ সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন। যে পরিচয় শুনে সাধারণত একজন অপরাধীর থেমে যাওয়ার কথা, সেটিই সেদিন যেন কোনো অর্থ বহন করল না। তাকে চড় মারা হলো। আঘাতে তার কানে রক্তপাত হলো। পরিস্থিতি আরও খারাপ বুঝতে পেরে তিনি নিজের কারখানার ভেতরে চলে গেলেন। কিন্তু হামলাকারীদের ক্ষোভ সেখানে শেষ হয়নি। কিছুক্ষণ পর একটি প্রাইভেট কার এসে কারখানার সামনে থামে। এরপর সেখানে জড়ো হয় আরও বহু মানুষ। কারও হাতে লাঠি, কারও হাতে দেশীয় অস্ত্র। তারা কারখানার দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে। একজন মানুষের ওপর হামলা করতে গিয়ে তারা তার সন্তানকেও রেহাই দেয়নি। আলতাফ হোসেনের ছোট ছেলে আরিফুলকে মেঝেতে ফেলে মারধর করা হয়; মাথায় আঘাত করে তাকে সংজ্ঞাহীন করে দেওয়া হয়। এরপর আলতাফ হোসেনের ওপর নেমে আসে একের পর এক আঘাত। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার ছেলে এখনো হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। এখানে থেমে গিয়ে আমাদের প্রথম প্রশ্নটি করা উচিত: একটা তুচ্ছ বাগ্‌বিতণ্ডা কীভাবে এত বড় সহিংসতায় পরিণত হলো? এর উত্তর কেবল কয়েকজন উচ্ছৃঙ্খল যুবকের চরিত্রে খুঁজলে ভুল হবে। কারণ ব্যক্তি অপরাধের পেছনে প্রায়ই একটা সামাজিক পরিবেশ কাজ করে। যে পরিবেশে অপরাধ ছোট হতে হতে বড় হয়, প্রতিবাদ ধীরে ধীরে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, আর আইনকে পাশ কাটিয়ে দলবদ্ধ শক্তিকে ‘ক্ষমতা’ বলে মনে করা শুরু হয়। আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হামলা, প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন, মাদক সেবন, কিশোর গ্যাং এবং স্থানীয় সন্ত্রাস—এসব আর কেবল বিচ্ছিন্ন খবর নয়। এগুলো অনেক এলাকায় সামাজিক বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, অপরাধের সঙ্গে যুক্ত অনেক তরুণের মধ্যে অপরাধবোধের জায়গাটি যেন ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। তারা জানে, দলবদ্ধ হলে ভয় তৈরি করা যায়; ভয় তৈরি করতে পারলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায়; আর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারলে আইনকে পাশ কাটানো সম্ভব। এই মানসিকতার সঙ্গে রাষ্ট্রের দুর্বলতার ধারণা যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে পুলিশ বাহিনী একটি জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অতীতে রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পক্ষপাতের অভিযোগ এবং আন্দোলন দমনে বাহিনীর কিছু সদস্যের ভূমিকা— এসব কারণে পুলিশের প্রতি মানুষের একাংশের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ক্ষোভের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি রয়েছে। সেটিকে অস্বীকার করে পুলিশের প্রতি জনআস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা রয়েছে। পুলিশের অতীত ভূমিকার সমালোচনা করা এক বিষয়, আর সেই ক্ষোভকে ব্যবহার করে পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা, কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াকে বৈধতা দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। পুলিশও নয়, বরং পুলিশের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে অতীতের ভুল, অপব্যবহার ও জবাবদিহিতার ঘাটতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে, একটি রাষ্ট্রে আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়লে তার ক্ষতি শেষ পর্যন্ত শুধু পুলিশের হয় না; ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের। কারণ অপরাধীর কাছে একবার যদি এই বার্তা পৌঁছে যায় যে, সংঘবদ্ধ শক্তি দিয়ে আইনকে ভয় দেখানো যায়, তখন সেই শক্তির পরবর্তী লক্ষ্য নির্ধারণের কোনো সীমা থাকে না। আলতাফ হোসেনের মৃত্যু আসলে রাষ্ট্র বনাম আইনহীনতার প্রশ্ন। আর এই জায়গাটিই আমাদের সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে বুঝতে হবে। কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশের কাজ জনগণের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করা নয়; পুলিশের কাজ হলো আইনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশকে যেমন জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে, তেমনি রাষ্ট্রকেও তাদের পেশাগত নিরাপত্তা ও কার্যকর আইন প্রয়োগের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। যে পুলিশ সদস্য অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজেই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন, সেখানে শুধু পুলিশের দুর্বলতা নয়, রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রশ্নও উঠে আসে। আলতাফ হোসেনের পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের কারখানার পাশের একটি ফাঁকা জায়গায় প্রায়ই কিছু যুবক এসে আড্ডা দিত এবং মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকত। এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলেই নাকি চাপ ও হুমকির মুখে পড়তে হতো তাদের। অভিযোগগুলো তদন্তে সত্য প্রমাণিত হলে বিষয়টি আরও গভীর উদ্বেগের কারণ হবে। কারণ একটি সমাজে অপরাধের সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায় তখনই শুরু হয়, যখন মানুষ অপরাধকে শুধু দেখতে পায় না, বরং তার সঙ্গে বসবাস করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। প্রকাশ্য মাদক সেবনকে আমরা ‘ছেলেপেলেদের দুষ্টুমি’ বলে এড়িয়ে যাই। স্থানীয় বখাটেদের উৎপাতকে ‘এলাকার ব্যাপার’ বলে পাশ কাটাই। অস্ত্র প্রদর্শনকে গুরুত্ব দিই না। তারপর একদিন সেই একই শক্তি যখন বড় কোনো অপরাধ করে বসে, তখন আমরা বিস্মিত হই। অথচ অপরাধের বড় বিস্ফোরণের আগে তার ছোট ছোট শব্দগুলো বহুদিন ধরেই শোনা যায়। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি আবারও কয়েক দিন আলোচনা করে বিষয়টি ভুলে যাব? কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হবে, সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়াবে, তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু অন্য খবরের নিচে চাপা পড়ে যাবে। যদি এমন হয়, তবে আলতাফ হোসেনের মৃত্যু থেকে আমরা কিছুই শিখলাম না। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু বিচার মানে শুধু কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা নয়। হামলায় কারা সরাসরি অংশ নিয়েছে, কারা হামলাকারীদের সংগঠিত করেছে, কারা অস্ত্র সরবরাহ করেছে, কারা পরিকল্পনা বা উসকানির সঙ্গে যুক্ত ছিল—তদন্তের মাধ্যমে প্রতিটি স্তর খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়বিচারের অর্থ প্রতিশোধ নয়; ন্যায়বিচারের অর্থ সত্য উদ্‌ঘাটন এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ। এর পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীর সংস্কারও এখন আর ঐচ্ছিক কোনো বিষয় নয়। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, পেশাদার, দক্ষ এবং জবাবদিহিমূলক পুলিশ ব্যবস্থা ছাড়া আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পুলিশকে শুধু শক্তিশালী করলেই হবে না; তাদের বিশ্বাসযোগ্যও হতে হবে। জনগণের প্রতি দায়িত্বশীলতা এবং অপরাধীর বিরুদ্ধে দৃঢ়তা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই একটি কার্যকর পুলিশ বাহিনী তৈরি হয়। একইভাবে সমাজকেও নিজের দায়িত্ব নিতে হবে। কিশোর গ্যাং তৈরি হওয়ার পর তাদের দমন করার চেয়ে তারা কেন তৈরি হচ্ছে, সেই প্রশ্নটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে নজরদারির অভাব, শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, মাদকের বিস্তার, কর্মসংস্থানের সংকট, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং স্থানীয়ভাবে অপরাধীদের প্রশ্রয়— সবকিছুর সঙ্গে এই সমস্যার যোগসূত্র রয়েছে। তাই সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক। তরুণদের হাতে যদি আমরা শুধু নিষেধাজ্ঞা তুলে দিই, কিন্তু বিকল্প কোনো স্বপ্ন না দিই, তাহলে শূন্যস্থানটি অন্য কেউ পূরণ করবে। মাদকব্যবসায়ী, অপরাধী গোষ্ঠী কিংবা কিশোর গ্যাং সেই শূন্যস্থান দখল করবে। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগ তৈরি করতে হবে। একটি প্রজন্মকে অপরাধ থেকে দূরে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তাদের সামনে সম্মানজনক জীবনের পথ খুলে দেওয়া। সবশেষে ফিরে আসি আলতাফ হোসেনের কাছে। তিনি হয়তো কোনো বড় রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। তার হাতে ছিল না কোনো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা। তিনি ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি নিজের চোখের সামনে একজন প্রবীণ মানুষকে হেনস্তা হতে দেখে এগিয়ে গিয়েছিলেন। তার সেই সিদ্ধান্ত হয়তো খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি গড়ে ওঠে ঠিক এমন ছোট ছোট মানবিক সিদ্ধান্তের ওপর। একজন অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। একজন দুর্বল মানুষকে রক্ষা করতে আরেকজন এগিয়ে আসবেন, এটাই সভ্যতার লক্ষণ। কিন্তু সেই প্রতিবাদ যদি প্রাণের ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়, তবে বুঝতে হবে সমাজের কোথাও বড় ধরনের অসুখ তৈরি হয়েছে। আলতাফ হোসেনের মৃত্যু সেই অসুখেরই রক্তাক্ত উপসর্গ। আমিনবাজারে যে রক্ত ঝরেছে, সেটি আমাদের রাষ্ট্রের আয়নায় উঠে আসা এক কঠিন প্রতিচ্ছবি। সেই আয়নায় আমরা কী দেখতে চাই— একটি ভীত, বিভক্ত ও আইনহীন সমাজ, নাকি এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষ জানেন যে আইন তার পাশে আছে? সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের, সমাজের এবং আমাদের প্রত্যেকের। লেখক: সাংবাদিক, দি ডেইলি সান আরটিভি/এসএস
প্রতিবাদই কি কাল হলো
বিরোধী দলের লংমার্চ, রাষ্ট্রের সহনশীলতা গণতন্ত্রের নতুন পাঠ
একটি লং মার্চ। বিশাল মানুষের অংশগ্রহণ। রাজপথে রাজনৈতিক কর্মসূচি, মিছিল, স্লোগান সবই আছে। কিন্তু এর মধ্যেও সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি চোখে পড়ছে, তা হলো বড় কোনো প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা নেই, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অযাচিত বাধার অভিযোগ নেই।
বিরোধী দলের লংমার্চ, রাষ্ট্রের সহনশীলতা গণতন্ত্রের নতুন পাঠ
আরও পড়ুন
নিউইয়র্কের পথে প্রধানমন্ত্রী, ইস্তাম্বুলে যাত্রাবিরতি
যুক্তরাষ্ট্রের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
জাতিসংঘে বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রা ও রোহিঙ্গা সংকট তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী
সোমবার নিউইয়র্ক সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী