
বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত একটি পরিবারের জন্য বড় সিদ্ধান্ত। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অর্থ, সময়, মানসিক চাপ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—চিকিৎসা নিয়ে প্রত্যাশা। তাই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমার কাছে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়—দ্বিতীয় মতামত নেওয়া।
দ্বিতীয় মতামত মানে প্রথম চিকিৎসককে অবিশ্বাস করা নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ কোনো চিকিৎসা সিদ্ধান্তের আগে আরেকজন যোগ্য বিশেষজ্ঞের মতামত জানা। এতে রোগী ও পরিবার রোগের অবস্থা, চিকিৎসার বিকল্প, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং দেশে বা বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পেতে পারেন।
আমাদের দেশে কোনো জটিল রোগ ধরা পড়লেই অনেক পরিবার প্রথমে বিদেশে যাওয়ার কথা ভাবেন। আবার কেউ পরিচিত কারও অভিজ্ঞতাকে নিজের চিকিৎসার সিদ্ধান্তের ভিত্তি করেন। কিন্তু একই রোগ হলেও প্রতিটি রোগীর অবস্থা, চিকিৎসার প্রয়োজন এবং ঝুঁকি এক নয়। তাই একজনের ভালো অভিজ্ঞতা অন্যজনের জন্য একই ফল নিশ্চিত করে না।
আমার দৃষ্টিতে, বিদেশে যাওয়ার আগে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—“আমার চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া কি সত্যিই প্রয়োজন?”
এর উত্তর পেতে কয়েকটি বিষয় জানা দরকার। রোগটি ঠিক কী? চিকিৎসার উদ্দেশ্য কী? দেশে এই চিকিৎসার উপযুক্ত সক্ষমতা আছে কি না? বিদেশে গেলে অতিরিক্ত কী সুবিধা পাওয়া যাবে? সম্ভাব্য খরচ কত? আর চিকিৎসার পরবর্তী পর্যায়ের চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ কীভাবে হবে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও রোগীর চিকিৎসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ এবং চিকিৎসক ও রোগীর যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরে। চিকিৎসার মান শুধু একটি নির্দিষ্ট চিকিৎসাপদ্ধতির ওপর নির্ভর করে না; নিরাপত্তা, রোগীকেন্দ্রিকতা, সময়োপযোগিতা এবং চিকিৎসার ধারাবাহিকতাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে জটিল বা দীর্ঘমেয়াদি রোগের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে গিয়ে একটি চিকিৎসা করিয়ে দেশে ফিরে আসার পর পরবর্তী চিকিৎসা কোথায় হবে, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা কোথায় হবে এবং চিকিৎসার তথ্য স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে কীভাবে পৌঁছাবে—এসবও সিদ্ধান্তের অংশ হওয়া উচিত। কারণ চিকিৎসা একটি দিনের ঘটনা নয়; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
তবে দ্বিতীয় মতামত নেওয়া মানেই চিকিৎসা পরিবর্তন করতে হবে—এমন নয়। অনেক সময় দ্বিতীয় বিশেষজ্ঞের মতামত প্রথম চিকিৎসা পরিকল্পনাকেই আরও পরিষ্কার করে। আবার কখনো নতুন কোনো বিকল্প সামনে আসতে পারে। মূল বিষয় হলো—রোগী যেন নিজের চিকিৎসা সম্পর্কে বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া ভুল—এমন কথা বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি বিদেশে গেলেই ভালো চিকিৎসা পাওয়া যাবে—এমন ধারণাও সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়। কিছু বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাওয়া প্রয়োজন হতে পারে। আবার অনেক চিকিৎসার জন্য দেশের মধ্যেই উপযুক্ত সক্ষমতা থাকতে পারে।
তাই আমার কাছে বিদেশে চিকিৎসার প্রশ্নটি “দেশ না বিদেশ”—এভাবে দেখার চেয়ে “প্রয়োজনের জন্য সঠিক জায়গা কোথায়?”—এই প্রশ্নে দেখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটি ভালো স্বাস্থ্যব্যবস্থা রোগীকে কোনো একটি সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয় না। বরং তাকে সঠিক তথ্য, প্রয়োজনীয় বিকল্প এবং যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ দেয়।
শেষ পর্যন্ত রোগী বিদেশে যাবেন, নাকি দেশে চিকিৎসা নেবেন—সিদ্ধান্তটি তার। আমাদের দায়িত্ব হলো সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তাকে যথেষ্ট তথ্য ও আস্থার সুযোগ দেওয়া। কারণ চিকিৎসার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে কখনো কখনো আরেকজন বিশেষজ্ঞের মতামত শুধু একটি অতিরিক্ত পরামর্শ নয়— এটি হতে পারে আরও সচেতন সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ।
লেখক: মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন
হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর
এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রাম।
আরটিভি/ এসকেডি


