ঢাকা শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১ কার্তিক ১৪৩৩

প্রবাসী নারীকর্মীদের সুখ-দুঃখের সাতকাহন

মোহাম্মদ রাশেদুজ্জামান

প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০১৯, ০৩:০১ পিএম

বহুকাল আগে থেকেই অধিক উপার্জন আর উন্নত জীবন জীবিকার আশায় পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও প্রবাসের বিভিন্ন কর্মে নিজেদের নিয়োজিত করে শ্রম অভিবাসন প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীর শ্রম অভিবাসন খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিপুল জনগোষ্ঠীর এইদেশের শ্রমবাজারে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখেরও বেশি নারী ও পুরুষ কর্মী যুক্ত হচ্ছে। তার তুলনায় কর্মসংস্থানের হার একেবারে কম। তাই এর বিরাট একটি অংশ প্রতিবছর কর্মহীন হয়ে পড়ে।

কর্মহীন থাকলে স্বাভাবিকভাবেই সমাজে নানারকম সমস্যার সূত্রপাত হয়। তখন আমাদেরকে একরকম বাধ্য হয়েই ভাবতে হয় শ্রম অভিবাসনের কথা। যদিও স্বাধীনতার পরপরই আমাদের দেশের নারীরা দেশের অভ্যন্তরে নানা কর্মক্ষেত্রে যোগদান করে পারিবারিক স্বচ্ছলতা ও দেশের অর্থনীতিতে নিরন্তর অবদান রাখা শুরু করেছে। এর যাত্রা অনেক আগেই বাংলাদেশের নারী কর্মীদের শ্রম অভিবাসন শুরু হয়েছিল তবে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৯১ সাল থেকে বাংলাদেশের নারীরা সরাসরি শ্রম অভিবাসনের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ে।

অর্থাৎ বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদেশে নারীকর্মী প্রেরণ শুরু করে। বাংলাদেশের নারীকর্মীদের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের হার কখনো বেড়েছে, কখনো কমেছে। আবার কখনো বন্ধ হয়ে ফের চালু হয়েছে। নারীকর্মী প্রেরণের এই উত্থানপতনের ধারায় বাংলাদেশ প্রায় ২০-২৫ টি দেশে মোট ৭ লাখ ৯৭ হাজার ৬৯৫ জন নারীকর্মীকে বিদেশে চাকুরির জন্য প্রেরণ করেছে। আমরা তাদের শ্রমঘামের রেমিটেন্সও পেয়েছি প্রচুর। তাদের রেমিটেন্সই আমাদের বিকাশমান অর্থনীতিকে দেখিয়েছে নতুন গতিপথ।

আমরা কতটুকু ভাবছি তাদের কথা। রেমিটেন্সের ডলার বা টাকার গায়ে যেমন একাধিক রঙ বিদ্যমান। তেমনি বিশাল রেমিটেন্স পাহাড়ের গহীনকোণে প্রবাসী নারীকর্মীদের রেমিটেন্স অর্জনের স্মৃতিতে আছে দুটি রং- একটি সুখের, আরেকটি দুঃখের। কিছু স্মৃতি সুখময় আবার কিছু স্মৃতি রীতিমত ভয়ঙ্কর। সাম্প্রতিককালে মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ফেরত এসে দুঃসহ স্মৃতির বর্ণনা তুলে ধরছেন। গণমাধ্যমের সুবাদে তা আমাদেরকেও রীতিমতো বিচলিত করে তুলেছে।

বাংলাদেশের নারীকর্মীদের শ্রম অভিবাসনের সাথে যুক্ত হওয়ার প্রথমদিককার ইতিহাস অতটা সুখকর ছিলনা। তখন যেসব নারীকর্মী বিদেশে যেতেন তাদের অধিকাংশই ছিলেন অদক্ষ। তাদের অনেকেই দেশের অভ্যন্তরে কোন নিয়মিত চাকরি বা কর্মে নিযুক্ত ছিলেন না। তাদের অনেকে সমাজ সংসারের নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়ে পরিবারের হাল ধরার আশায় বাধ্য হয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন বিদেশে।

তাদের কেউ কেউ দেশে মাটিতে সহায় সম্বলহীন হয়ে, কেউ স্বামী পরিত্যক্তা হয়ে,পরিবারের সদস্যদের উপেক্ষার পাত্র হয়ে, প্রতারক প্রেমিকের প্রেম বঞ্চনার শিকার হয়ে, পাড়া মহল্লায় উঠতি মাস্তান আর বখাটে যুবকের উৎপাতে,দেশের অভ্যন্তরে কর্মক্ষেত্রে নানা লোকের কুপ্রস্তাব হতে রক্ষা পাওয়ার আশার হাতছানি দেখেছিল সুদূর মধ্যপ্রাচ্যে। শ্রম অভিবাসী নারীকর্মীর এই মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন বাগেরহাটের চার সক্ষম সন্তানের এক জননী। এই মিছিলে আজও শরিক হচ্ছে দেশের হাজার হাজার কিশোরী-তরুণী-যুবতী-মহিলা।


এদের মধ্যে কেউ কেউ বিদেশের মাটিতে নানা ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে কর্মস্থলে হাসিমুখে কাজ করে গেছেন। আর হাসি ফুটিয়েছেন দেশে রেখে যাওয়া অসহায় পরিবারের মুখে। বীরত্বের সাথে নিজ কর্মস্থলে দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। প্রশংসাও পেয়েছেন প্রচুর। আপন করে নিয়েছেন বিদেশকে,আপন হয়েছেন বিদেশের মানুষের। অর্জিত অর্থে দেশে গড়েছেন স্বপ্নের সিঁড়ি। সেই সিড়ি বেয়ে এগিয়ে গেছে দেশের অর্থনীতি। প্রতিবেশীর কাছে হয়েছেন অনুকরণীয় উদাহরণ।

এদের মধ্যে আবার কেউ কেউ বিরতিহীন ভাবে দীর্ঘ সময়ধরে কাজ করানো,সঠিক বেতনাদি সময়মত পরিশোধ না করা, দীর্ঘ সময় খেতে না দেওয়া, অবসর-বিনোদন-ছুটির ব্যবস্থা না করা, নিরাপত্তাহীনতা, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন, ধর্ষণ ইত্যাদি কারনে ব্যর্থতার ডালি মাথায় বিফল হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। কেউ সমাজ বা পরিবার কর্তৃক ধিকৃত হয়ে বহিষ্কৃত হয়েছেন। কেউ বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন। কেউ কেউ হাসপাতালে শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসা নিচ্ছেন। অনেকেই তাদেরকে অচ্ছুৎ, দায় বা বোঝা জ্ঞান করছেন।

সফল হোন আর বিফল হোন-এরা কারো না কারো মা বোন। ব্যর্থ হলেও এরা কেউ ফেলনা নয়। এরা কোন ভাবেই বাংলাদেশের জন্য দায় বা বোঝা নয় বরং এরা বাংলাদেশের মানবসম্পদ। সরকার তাদেরকে এইভাবেই মূল্যায়ন করে। তাই সরকার তাদের প্রেরিত অর্থ আর অর্জিত মেধা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়নে উৎসর্গ করতে চায়। এ লক্ষ্যে সরকারের সমাজ কল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে সাথে নিয়ে প্রত্যাগত নারীকর্মীদের পুনর্বাসনে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। যার মাধ্যমে প্রত্যাগত নারীকর্মীদের সবধরনের সামাজিক নিরাপত্তাসহ দেশেই সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ ঘটবে।

এছাড়া সরকার ওয়েজ আর্নার্স আইন-২০১৭ নামে একটি আইন পাস করেছে। এতে বলা আছে- ওয়েজ আর্নার্স বোর্ড বিদেশে কর্মরত কোন নারী অভিবাসী কর্মী নির্যাতনের শিকার, দুর্ঘটনায় আহত, অসুস্থতা বা অন্যকোন কারণে বিপদগ্রস্ত হলে তাদের উদ্ধার ও দেশে আনয়ন, আইনগত ও চিকিৎসাগত সহায়তা নিশ্চিত দেওয়া, এছাড়া দেশে প্রত্যাগত নারীকর্মীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পুনর্বাসন ও পূনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এবং দেশে বিদেশে সেফহোম ও হেল্প ডেস্ক পরিচালনা করতে পারবে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ থেকে নারীকর্মী প্রেরণ শুরু হলে প্রথম বছরই ২১৮৯ জন নারী কর্মী বিদেশে গমন করে। ১৯৯২ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল এই সংখ্যা কোনভাবেই দুই হাজারকে অতিক্রম করতে পারেনি। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত এই চার বছরে মোট ২৪১৮ জন নারীকর্মীর বৈদেশিক কর্মসংস্থান হয়েছে। আবার ২০০৪ সাল থেকে এই সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বাড়তেই থাকে। প্রসঙ্গত ২০১৫ সালের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের নারীকর্মীদের সৌদিআরবে কর্মসংস্থান প্রায় বন্ধই ছিল। ২০১৫ সালে সৌদির শ্রমবাজার খুলে যাওয়ার ফলে ২০১৫, ২০১৬, ২০১৭, ২০১৮ সালে নারীকর্মীর বিদেশ গমনের সংখ্যা রাতারাতি লাখ ছাড়িয়ে যায়। এই বছরে মোট ৩ লক্ষ ৪৩ হাজার ৮৩২ জন নারীকর্মীর বৈদেশিক কর্মসংস্থান হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সৌদি আরবেই গিয়েছে ২ লক্ষ ৪৬ হাজার নারীকর্মী।

১৯৯১ সাল ২০১৮ সাল পর্যন্ত মোট ৭ লক্ষ ৯৭ হাজার ৬৯৫ জন নারী কর্মী বিদেশে গমন করেছে। উল্লেখ্য ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণ বাড়ীয়া, যশোর, বরিশাল, ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জের নারীকর্মীদের বিদেশে গমনের প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশ সরকার নতুন করে হংকং, জর্ডান, লেবানন, ওমানসহ কয়েকটি দেশের সাথে বিভিন্ন সেক্টরে নারীকর্মী প্রেরনের কার্যক্রম সংক্রান্ত চুক্তি করেছে। অন্যান্য দেশেও নারী কর্মী প্রেরনের জন্য বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজার বিস্তারে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

পুরুষকর্মীর তুলনায় নারীকর্মীর শ্রম অভিবাসন একটু কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। সিডও সনদের ১১.৫ নং ধারায় অভিবাসী নারী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে, কর্মক্ষেত্রে সমঅধিকার ও সমমর্যাদা সম্পর্কে বলা আছে-স্বাক্ষরকারী সদস্য রাষ্ট্রসমুহকে নারীকর্মীদের প্রজনন স্বাস্থ্য সহ স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তারপরেও বিভিন্ন দেশে নারী কর্মীদের হয়রানি ও নির্যাতনমূলক ঘটনা ঘটছে। এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে।

যেমন-আমাদের নারীকর্মীরা গৃহপরিচারিকা পেশায় বিদেশে যায়। যেহেতু তারা কাজ করেন ঘরের ভিতরে আর নারী কর্মীরা অধিকাংশই উঠতি বয়সের কিশোরী-যুবতী হয়ে থাকেন এবং গৃহস্বামী বিমানভাড়া, মেডিকেলসহ অন্যান্য খরচ দিয়ে মনোনীত করে নারীকর্মীদের তাদের ঘরে নিয়ে যান, একারণেই হয়তো কিছু কম মানবিকতাবোধ সম্পন্ন বিত্তশালী মালিক নারীকর্মীদের নিজেদের কেনা বাদী মনে করতে পারে।

নিজের ঘরে অন্যদেশের গৃহকর্মীর উপর যাদের লোলুপ দৃষ্টিতে নির্যাতন, খুন জখম ধর্ষণ গর্ভধারণ-সত্যিই অত্যন্ত পরিতাপের। প্রতারিত হওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের নারীকর্মীরাও কিছু অংশে কমবেশি দায়ী আছেন। যেমন-কেউ কেউ আছেন যে গ্রামের অশিক্ষিত ও দরিদ্র নারী নানা লোভের বশবর্তী হয়ে পরিবারের একরকম মতামত ছাড়াই যথাযথ দক্ষতা অর্জন না করেই, ভাষা-সংস্কৃতি-আইন কানুন-খাদ্যাভ্যাস সমন্ধে কোন কিছু না জেনে কোন প্রকার ট্রেনিং না নিয়ে আগেপাছে কিছু না ভেবে বিদেশ নামক অজানার পথে পা বাড়ায়। এমন ও অনেকেই আছে যারা জীবনে একবারও দেশের রাজধানী শহর ঢাকাতেই আসেননি অথচ এক দৌড়ে চলে যাচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে।

এদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন আধুনিক প্রযুক্তির যোগাযোগ মাধ্যমের সাথে অতটা পরিচিতও নন। এমনও নারী কর্মী পাওয়া যায় যারা আরবি ভাষার অতি প্রয়োজনীয় কয়েকটা শব্দও জানেনা। তারা জানেনা 'আমি বিপদে আছি' এর আরবি কি, 'আতিকা খুলুস ' এর বাংলা কি? তারা এও জানেনা সৌদিআরবের 'মামা' পুরুষ না মহিলা। যারা বাংলাটাই ঠিকমতো পড়তে লিখতে জানেনা তাদের জন্য বৈদেশিক ভাষায় যোগাযোগ রক্ষা সত্যিই দুরুহ।

আবার অনেকের ক্ষেত্রে এমন হয়েছে অতিরিক্ত হোমসিকনেস, কম অভিযোজন ক্ষমতা, অধিক কাজের চাপ সহ্য করতে না পারা, চেনাপরিচিত লোকের সাক্ষাৎ না পাওয়া, খাদ্যাভ্যাস-পরিবেশ-সংস্কৃতির মিল না পেয়ে, অবসর-বিনোদন-ছুটি না পেয়ে দেশে ফিরতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেন। আবার অনেকে দুধের শিশু, কোলের বাচ্চা, স্বামীর সংসার, বৃদ্ধ পিতামাতা, প্রাণপ্রিয় প্রেমিক প্রমুখের টানে সামান্য বিচ্যতিতেও নারীকর্মী দেশে ফিরে আসেন। অনেকে অভিযোগ করেন, কিছু অনভিপ্রেত ঘটনার উদাহরণ সারা পৃথিবীতেই বিদ্যমান। তার মানে এই না পৃথিবীর সবাই খারাপ।

যেসব নারীকর্মী বিদেশে গেছেন তাদের মধ্যে শতকরা নব্বই ভাগ ভালো অবস্থায় আছেন।বাকিরা হয়ত কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার শিকার হচ্ছেন। এর জন্য যথাযথ শাস্তির বিধানও আছে। সরকার, মন্ত্রণালয়, দূতাবাস, যথারীতি বিষয়গুলি মনিটরিং করছে। যেহেতু তারা একরকম বিনা খরচে বিদেশে যায় তাই হুটকরে দেশে ফিরে আসতে তেমন চিন্তাভাবনা বা স্ট্রাগল করার বিষয়টি বিবেচনায় আনেন না।

তবে শিক্ষিত মহিলাদের উন্নত ট্রেনিং দিয়ে দক্ষ করে বিদেশে পাঠালে তারাও নিরাপদে কাজ করতে পারবে এবং দেশেও অধিক পরিমাণ রেমিটেন্স আসবে। দেশের চেহারাই পাল্টে যাবে। আর বৈদেশিক হোক আর দেশীয়ই হোক কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিতে নারীকর্মীকেও সচেতন ভাবে কিছু ভুমিকা পালন করতে হবে।

প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন দেশ থেকে প্রত্যাগত হয়ে নারীকর্মীরা বাংলাদেশে আসছেন। শোনা যাচ্ছে নানা বিষাদময় সব গল্প। তখন দেশের অনেক মহল থেকেই নারী কর্মীদের বিদেশে প্রেরণের ব্যাপারে নানা উদ্বিগ্ন মতামত আসছে। কেউ কেউ আবার বিদেশে নারীকর্মী পাঠাতে সরাসরি নিষেধ করছেন। তবে অভিবাসন একটি স্বাভাবিক এবং প্রায় স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া। কাজের খোঁজে মানুষ স্বউদ্যোগেই বিদেশে যায়। এই স্বাভাবিক অবস্থা অস্বাভাবিক করে তুললে পরিণামে চরম মূল্য পরিশোধ করতে হয়।

বাংলাদেশের নারী সমাজের অর্থনৈতিক মুক্তি ও টেকসই সামাজিক অবস্থান সৃষ্টি করতে নারীকর্মীর শ্রমভিবাসন অত্যন্ত জরুরি। লক্ষণীয় যে, বিগত সময়ে নারী কর্মীর অভিবাসন বিভিন্ন কারনে ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলি থেকে যৌনব্যবসার উদ্দেশ্যে পার্শ্ববর্তী দেশে নিত্যনৈমিত্তিক ভাবে নারীপাচারের ঘটনা ঘটতো। তাই বলা হয় অভিবাসন ও মানবপাচার একে অপরের সাথে খুবই ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িত। অভিবাসন ব্যাহত হলে মানব পাচার বেড়ে যাবে -এটাই স্বাভাবিক।

নিঃসন্দেহে সৌদিআরব বাংলাদেশের বড় একটি শ্রমবাজার এবং ভাতৃপ্রতিম মুসলিম দেশ। ধর্মের খাতিরে আমরা আরো কাছাকাছি ভাবি। আমাদের শ্রমিকেরাও সেখানে যেতে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। যেদেশে প্রেমের শাস্তি শিরশ্ছেদ, চুরির শাস্তি হাত কেটে ফেলা সেদেশে ভিন দেশের গৃহকর্মীর উপর পাশবিক নির্যাতন কোন ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। যদিও সবাই জড়িত নয়, তারপরও যেকোন বিরূপ ঘটনার তদন্ত ও শাস্তির ব্যবস্থা আরও জোরদার করা উচিত। আমরা সৌদিআরব কে আমাদের হৃদয়ে যে শ্রদ্ধার অবস্থানে রেখেছি নিশ্চয় সৌদিআরব সে সম্মান সম্পর্কে সচেতন আচরণ করবে। এতে দুই দেশই লাভবান হবে।

নারীকর্মীর নিরাপদ, নিয়মিত, সুশৃঙ্খল ও দায়িত্বশীল অভিবাসন নিশ্চিত করতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশেই বিদেশ গমনেচ্ছু নারীকর্মীদের সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে বিএমইটি তে নারী অভিবাসী কেন্দ্র স্থাপন করেছে,দেশের প্রায় সব জেলা/উপজেলায় কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে যথাযথ ভাষা ও ট্রেড প্রশিক্ষণ প্রদান করে নারী কর্মীদের যোগ্য করে তুলছে, নারীকর্মীর অধিকার রক্ষায় দেশেবিদেশে আলাপ আলোচনা অব্যাহত রেখেছে।

বিদেশে নির্যাতনের শিকার নারীকর্মীদের জন্য সেফহোম, শেল্টার হাউজ, দেশে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা, দূতাবাস ও লেবার উইংয়ের মাধ্যমে নারীকর্মীর সেবা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা, নারীকর্মীর নিরাপত্তা-নিরাপদ কর্মপরিবেশ-বেতন ও ক্ষতিপূরন আদায়ে নিয়োগকর্তা ও সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারসহ যথাযথ কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিনিয়ত নেগোসিয়েশন করছে।

প্রত্যাগত নারীকর্মীরা বিমানবন্দরে আসার সাথে সাথে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে মেডিকেল সুবিধাসহ নানা সহায়তা, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করছে। আর সবার জন্য রয়েছে বিপদের সাথী ২৪ হটলাইন প্রবাসবন্ধু কল সেন্টার যার নাম্বার (+88 01784 333 333, +88 01794 333 333 এবং +88 02-9334888)। কোনরকম প্রতারণার ঘটনা ঘটলে তাদের শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। তবে সরকার বিদেশ গমনেচ্ছু নারী পুরুষ সকলকে জেনে বুঝে ভাষা শিখে যথাযথ ট্রেনিং নিয়ে শ্রম অভিবাসনে যুক্ত হতে আহ্বান করছে।

নারী কর্মীরা জেনে, বুঝে, ভাষা শিখে,বেসিক আইনকানুন জেনে, যথাযথ প্রশিক্ষণ নিয়ে বিদেশে গেলে, দেশীয় প্রশিক্ষণের মান ও মেয়াদ বাড়ালে, তাদের প্রত্যেকের হাতে স্মার্ট ফোন দেওয়া হলে, পাসপোর্ট ও ছাড়পত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে আরো নজরদারি বাড়ালে এবং সকার ও দূতাবাসের মাধ্যমে নারীকর্মীর খোঁজ নিলে, সময়ে সময়ে মালিকের সাথে কর্মীর ব্যাপারে নেওয়া হলে,মাঝেমধ্যে ছুটি-অবসর-বিনোদনের ব্যবস্থা করা হলে, সুষ্ঠু ডাটাবেইস ও মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার হলে, নির্যাতন ও প্রতারণাকারীকে উপযুক্ত শাস্তি দিতে পারলে নারীকর্মীর শ্রম অভিবাসনের ক্ষেত্রে অনেক সমস্যাই লাঘব হতে পারে।

টেকনিক্যাল ইন্টার্ন হিসেবে জাপান প্রবাসী নারী কর্মী নাসরীনের গল্প দিয়েই শেষ করছি। ২০১৭ সালে আইএম জাপানের পৃষ্ঠপোষকতায় পুরান ঢাকার মেয়ে নাসরীন টেকনিক্যাল ইন্টার্ন হিসেবে সম্পূর্ণ বিনা খরচে জাপানে যায়। নাসরীনের ব্যক্তিত্ব, আচার -ব্যবহার, জাপানী ভাষা শিক্ষণের পারদর্শিতা, কর্মস্পৃহা ও দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে যান আইএম জাপানের সিইও কিয়োই ইয়ানাগিসাওয়া। নাসরীনও খুব সহজে জাপানী ভাষা ও সংস্কৃতি, খাদ্যাভাস ও পরিবেশের সাথে নিজেকে মানানসই করে গড়ে তুলেন। এতে খুশি হয়ে ইয়ানাসান তাকে নাতনী বানিয়ে নেন। গড়ে তোলেন এক পরম আত্মীয়তার সম্পর্ক।

এবছর ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় নাসরীনের বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়ে। সেই অনুষ্ঠানে আইএম জাপানের সিইও মহৎপ্রাণ ইয়ানাসান স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। নিজে উপস্থিত থেকে বিয়ের সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন করেছেন। নাতনীর বিয়ে বলে কথা! বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ করে নাসরীন আবার চলে গেছেন জাপানে। নাসরীন নিজ যোগ্যতা ও দক্ষতা দিয়ে শুধু ইয়ানাসান নয় পুরো জাপানকে জয় করেছে। নাসরীন সফল হয়েছে। নাসরীনই হোক বাংলাদেশের সকল প্রবাসগামী নারী কর্মীর প্রতিচ্ছবি। সব নারীকর্মীর গল্প হোক নাসরীনের গল্পের মত। সকল প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতা দূর করে জয় হোক নাসরীনদের। জয় হোক সকল নারীকর্মীর।

মোহাম্মদ রাশেদুজ্জামান, জনসংযোগ কর্মকর্তা, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ ও প্রতিকার ব্যবস্থাপনা
অগ্নিকাণ্ড একটি মারাত্মক মানবসৃষ্ট দুর্যোগ, যার ফলে সারা জীবনের অর্জিত সম্পদ নিমিষেই ধ্বংস হয়ে যায়। অসতর্কতা ও অসাবধানতার ফলে অগ্নিকাণ্ড মানুষ ও সম্পদের বিশাল ক্ষতিসাধন করে। অগ্নিকাণ্ড যেকোনো সময় ঘটতে পারে, তবে এর প্রকোপ ফাল্গুন মাস থেকে সমগ্র শুষ্ক মৌসুমেই বেশি দেখা যায়। অগ্নিকাণ্ডের কারণে এদেশে প্রতিনিয়তই ছোট-বড় অসংখ্য দুর্ঘটনা ঘটে। অগ্নিকাণ্ড যখন কোনও জনবহুল এলাকা বা শিল্প-কারখানাতে ঘটে তখনই এর ভয়াবহতা আমাদেরকে নাড়া দেয়। ইদানীং কারখানা, বস্তি ও ব্যবসা-বিপণিতে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ড সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। সম্প্রতি ঢাকা মহানগরীতে পরপর বেশ কয়েকটি বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এগুলোর মধ্যে ঢাকার চকবাজারস্থ চুড়িহাট্টা, মিরপুরস্থ ভাষানটেক, বনানীর এফ আর টাওয়ার, ডিএনসিসি কাঁচা বাজার ও সুপার মার্কেট, গুলশান-২, খিলগাঁও কাঁচাবাজার, মিরপুরস্থ সিটি পার্ক ভবন উল্লেখযোগ্য। এসব দুর্ঘটনার মধ্যে শুধুমাত্র চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডে মারা যায় ৭২ জন এবং বনানীর এফআর টাওয়ারে ২৮ জন। এসব দুর্ঘটনায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, সশস্ত্রবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ঢাকা জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা/কর্মচারীগণ দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণকে সীমিত রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। প্রতিটি দুর্ঘটনায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় কমিটি গঠনের মাধ্যমে তদন্ত পরিচালনা করে অগ্নিকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে বের করা এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কৌশল নির্ধারণে প্রয়াস নেয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ও ঢাকা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা এবং মৃতব্যক্তিদের সৎকারের জন্য মানবিক সহায়তা প্রদান করা হয়। এর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মাঝে খাদ্য সামগ্রী, নগদ টাকা এবং মনোসামাজিক সহায়তা প্রদান করা হয়। অগ্নিকাণ্ডের প্রধান কারণসমূহ হলো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, বিভিন্ন ভবনের অনুমোদনহীন ব্যবহার, ভবন ব্যবহারকারীদের জরুরি নির্গমন বিষয়ে জ্ঞান না থাকা, দাহ্য ও বিস্ফোরক পদার্থের অনুমোদনহীন গুদামজাতকরণ। এছাড়া রান্নার পর আগুন সম্পূর্ণ নিভিয়ে না দিলে, বাতাসে উড়ে গিয়ে সেই আগুন বাড়ির বেড়ায় লাগতে পারে; ছাইয়ের আগুন বাতাসে উড়ে অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে; চুলার উপর খড়ি শুকাতে দিলে খড়িতে আগুন লেগে যেতে পারে, সে আগুন বাড়িঘর পুড়িয়ে দিতে পারে; সিগারেট, বিড়ি ও হুঁকার আগুন থেকে অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে। এছাড়া গ্রামাঞ্চলে এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে আগুন নেয়ার সময়ও এ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে; জ্বলন্ত কুপি, কয়েল ঘরে রেখে ঘুমালেও অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে, ঘুমানোর সময় বিছানার ধারে জ্বলন্ত হারিকেন রাখলেও এ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে; ত্রুটিপূর্ণ বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে আগুন লাগতে পারে; জ্বলন্ত আবর্জনার স্তূপ থেকেও অগ্নিকাণ্ড লাগতে পারে; শিশুদের আগুন নিয়ে খেলা থেকে এবং আতশবাজি থেকেও অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে। এছাড়া গ্যাসের চুলা রান্নার পর বন্ধ না করে চুলার উপর কাপড় শুকাতে দিলে আগুন লাগার আশঙ্কা থাকে; অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইন সংযোগ দেয়াও অগ্নিকাণ্ডের কারণ; ভূমিকম্পের কারণে গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইন থেকে আগুন লেগে যেতে পারে; শত্রুতাবশত অনেকে ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়।  যেহেতু অগ্নিকাণ্ডে জীবন ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, তাই অগ্নিনির্বাপণ অতীব জরুরি। অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে প্রতিটি স্থাপনায় ফায়ার প্রোটেকশন ও ডিটেকশন সিস্টেম তথা ফায়ার সেফটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা এবং সংশোধিত বিল্ডিং কোড মেনে ঘর-বাড়ি নির্মাণ করতে হবে। এছাড়া Street Water Hydrant-এর ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন এবং গ্যাস সিলিন্ডার, বিদ্যুতের লোড ক্যাপাসিটি নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। অফিস, বাসা-বাড়ির নিরাপত্তা প্রহরী, দোকান কর্মচারীদের অগ্নিনির্বাপণ বিষয়ে মৌলিক প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে। প্রাথমিক হতে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা কারিকুলামে অগ্নিকাণ্ড ও তার প্রতিকার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। ফায়ার সার্ভিস ও নগর স্বেচ্ছাসেবকদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য তাদেরকেও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের সাথে সম্পৃক্ত করাসহ সকল ক্ষেত্রে অগ্নিবীমা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এছাড়া সমন্বিতভাবে সকল প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব ‘response team’ গঠন করতে হবে, অনিরাপদ কেমিক্যাল সামগ্রী অপসারণ, দুর্যোগ ঝূঁকি হ্রাসে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নিজস্ব আপদকালীন পরিকল্পনা গ্রহণ, নিরাপত্তা বিষয়ক আইন-কানুন প্রতিপালন করতে হবে এবং সর্বোপরি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কমিটিসমূহ নিজ নিজ অধিক্ষেত্রে দুর্যোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারের লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ, বাস্তবায়ন এবং হালনাগাদ করতে হবে। লেখক: আবদুল কাদের, উপসচিব, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়
অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ ও প্রতিকার ব্যবস্থাপনা
‘বাবরি মসজিদ বিরোধের পেছনে রয়েছে ব্রিটিশ ষড়যন্ত্র’
ভারতের অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির ছিল এই দাবিতে কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা আন্দোলন করে আসছেন কয়েক দশক ধরে। আর তারই ধারাবাহিকতায় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি এক ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছেন। রায়ে ওই জায়গাটি রাম মন্দির নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে আর মসজিদ নির্মাণের জন্য অযোধ্যাতেই অন্য জায়গায় পাঁচ একর জমি দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এই রায় মানেনি ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়, আবার  কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা এই রায়ে যেমন খুশি হয়েছে তেমনি মসজিদের জন্য জায়গা দেয়ার নির্দেশে রায়ের বিরোধিতাও করছে এবং তারা এর বিরুদ্ধে আপিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সিদ্ধান্ত নিয়েছে মুসলমানরাও।   ১৫২৮ সালে অযোধ্যায় সম্রাট বাবরের সেনাপতি মীর বাকি তাসখন্দী সম্রাটের নামকে স্মরণীয় রাখতে বাবরি মসজিদ নির্মাণ করলেও এ নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের বিরোধিতা শুরু হয় উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। ১৮৫৩ সালে কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা প্রথম প্রতিবাদ করে দাবি করে সেখানে রাম মন্দির ছিল এবং ওই জায়গাটি রামের জন্মভূমি। সেসময় এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুসিলম ও হিন্দু সম্পদায়ের মাঝে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। পরে ব্রিটিশ সরকার এই জায়গাটি দুই ধর্মের উপাসনার জন্য নির্ধারণ করে দেয়। তারা একটি বেষ্টনী তৈরি করে তার ভেতরের চত্বর মুসলিমদের জন্য এবং বাইরের চত্বর হিন্দুদের ব্যবহারের জন্য নির্ধারণ করে দেয়। এরপর ১৯৪৯ সালে কিছু উগ্র হিন্দু মসজিদের ভেতর রামের মূর্তি রেখে দেয়। আর এনিয়ে দুই সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে দেওয়ানি মামলা করা হয়। তখন থেকেই মসজিদটি ব্যবহারের জন্য পুরোপুারি বন্ধ করে দেয়া হয়। এ সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, ব্রিটিশরা যেখানেই কলোনী স্থাপন করেছে সেখানেই স্থানীয় মানুষের মাঝে বিরোধ সৃষ্টি করে দিয়েছে কোনো না কোন অজুহাতে। তাতে খুব সহজেই তারা শাসন ও দখলের রাজত্ব কায়েম করতে পেরেছে। এটি ব্রিটিশদের একটি স্বভাবগত পদ্ধতি। তারা এই অঞ্চলে এসে বাবরি মসজিদ নিয়ে ঠিক এই কাজটিই করলো। উপমহাদেশে শতকের পর শতক ধরে হিন্দু মুসলমানরা সাম্প্রদায়িত সম্প্রীতি বজায় রেখেই বসবাস করেছে।মসজিদ মন্দির পাশাপাশি থেকেও কোনো বিবেধ সৃষ্টি না করে এক সঙ্গেই উপাসনা ও প্রার্থনা করেছে। কিন্তু এই অঞ্চলে ব্রিটিশ শাসন শুরু হওয়ার পর থেকেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ‍ও বিরোধিতাগুলো শুরু হয়। উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদকে পাকাপোক্ত করতে তারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করেছে। রামের জন্মভূমি ও মন্দির ছিল বলে যে দাবি হিন্দুত্ববাদীরা করছে এখন পর্যন্ত তার কোনও প্রমাণও দিতে পারেনি হিন্দুরা। এমনকি সুপ্রিমকোর্ট যে রায় দিয়েছে সেখানেও বলা হয়নি যে এখানে রাম মন্দির ছিল। মসজিদের নিচে যে অবকাঠামো পাওয়া গেছে সেটি যে মন্দিরের সেটিও প্রত্নতত্ববিদরা বলছেন না। অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান এ সম্পর্কে বলেন, ঐতিহাসিকভাবে রামের জন্মভূমি নিয়ে বিতর্ক আছে। তিনি ভারতবর্ষের কোথায় জন্ম গ্রহণ করেছিলেন তার সঠিক ইতিহাস এখনও কেউ দেখাতে পারেনি। এমনকি হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বিষ্ণুস্মৃতিতে ভারতবর্ষের প্রায় ৫০টি হিন্দুদের তীর্থস্থানের কথা বলা হয়েছে তার কোনোটিও এই অযোধ্যার বাবরি মসজিদের জায়গা নয়। আবার বাবরি মসজিদ নির্মাণের প্রায় ৪০ বছর পর ১৫৭৪ সালে ভারতের বিখ্যাত হিন্দু পন্ডিত তুলসী দাস যে রামচরিত রচনা করেছেন সেখানে যে তীর্থস্থানগুলোর কথা উল্লেখ করেছেন সেখানেও এই বাবরি মসজিদের জায়গার নাম নেই। অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান আরও জানান, ভারতের প্রত্নতত্ব অধিদপ্তর খনন করে মসজিদের নিচে যে অবকাঠামো পেয়েছে তা যে কোনো মন্দিরের সেটিও বলেনি। তবে প্রত্নতত্ব জরিপে এটি প্রমাণ করেছে যে খ্রিষ্টপূর্ব এক হাজার বছর আগে এখানে কোনও মানব বসতি ছিল না। অথচ রামের জন্ম হচ্ছে খ্রিষ্টপূর্ব এক হাজার বছর পূর্বে। এজন্য সহজেই বুঝা যায় যে এই জায়গাকে রামের জন্মভূমি বলা যায় না। হিন্দু ধর্মীয় পন্ডিতরা রামের জন্মভূমি হিসেবে অযোধ্যার বাইরেও কিছু জায়গাকে নির্দেশ করেছে। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের পর ভারতের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ জওহর লাল নেহেরু বিশ্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষক মৃদুলা চক্রবর্তী এর বিরোধিতা করেছেন। শুধু তাই নয় সাবেক কয়েকজন বিচারপতিও এই রায়ের সমালোচনা করেছেন। এই মামলার আইনজীবী ভারতের প্রখ্যাত আইনজীবী রাজীব ধামান বলেছেন আমরা কোর্টে প্রমাণ করতে পেরেছি এখানে রাম মন্দির ছিল না। হিন্দুত্ববাদীরা একটি বিশ্বাসের ওপর এই দাবি করছেন এবং কোর্ট সেই দাবিকে মেনে নিয়ে একটি রায় দিয়েছেন। অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান  ১৯৯১ সালে উত্তর প্রদেশে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর মসজিদটির কিছু ক্ষতি করে হিন্দুত্ববাদীরা। আর এর ঠিক পরের বছর ১৯৯২ সালে ভিএইচপি, বিজেপি এবং শিব সেনা পার্টির হাজার হাজার সমর্থক আইনশৃ্ঙ্খলা বাহিনীর সামনে মসজিদটি ধ্বংস করা হয়। এই হামলায় উপস্থিত থেকে নেতৃত্ব দেন বিজেপি নেতা সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপ প্রধানমন্ত্রী লালকৃষ্ঞ আদভানি। এর ফলে পুরো ভারতে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে হওয়া দাঙ্গায় প্রায় চার হাজার মানুষ মারা যায়। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পেছনে উস্কানি দেয়ার অভিযোগে ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বরে সাত জন হিন্দু নেতাকে বিচারের আওতায় আনা উচিত বলে রুল জারি করেন ভারতের একটি আদালত। তবে সেই তালিকায় নাম ছিল না লালকৃষ্ণ আদভানির। এমকে
‘বাবরি মসজিদ বিরোধের পেছনে রয়েছে ব্রিটিশ ষড়যন্ত্র’
আর কটা দিন সবুর করো ‘পেঁয়াজ’ বুনেছি
খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো/বর্গী এলো দেশে। বুলবুলিতে ধান খেয়েছে/খাজনা দিবো কিসে?/ধান ফুরুল/ পান ফুরুল/খাজনার উপায় কী?/আর কটা দিন সবুর কর/রসুন বুনেছি। ছোটবেলায় এই ছড়া না শুনে ঘুমাতে গিয়েছে এমন বাঙালি পাওয়া হয়তো ভার। মায়েরা হয়তো আজো এই ছড়া শুনিয়ে তাদের শিশুদের ঘুম পাড়ান। কিন্তু এবার পেঁয়াজের কেজি যখন ডাবল সেঞ্চুরি ছাড়িয়ে গেছে, তখন রসিকজনেরা রসুন বুনার জায়গায় পেঁয়াজ বুনতে শুরু করেছেন। অবশ্য রসিকজনদের দোষ দিয়ে কোনও লাভ নেই। গত আট নভেম্বর আমাদের বাণিজ্যমন্ত্রী রংপুর নগরীর একটি হোটেলে বলেছিলেন ক্ষেতের পেঁয়াজ উঠার আগে দাম কমার সম্ভাবনা কম। অতএব দিন যতো যাচ্ছে মন্ত্রীর কথাই সত্যি হচ্ছে। ক্ষেতের পেঁয়াজ না উঠার আগে পেঁয়াজের দাম কমার কোনও সম্ভাবনা যে নেই এমনটাই বুঝা যাচ্ছে।  এরপর গেল মঙ্গলবার (১২ নভেম্বর) একাদশ জাতীয় সংসদের পঞ্চম অধিবেশনে সরকারি দলের সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেন খানের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য মন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হূমায়ুন সংসদকে জানিয়েছিলেন, চাহিদার তুলনায় পেঁয়াজ কম উৎপাদন ও ভারত রপ্তানি বন্ধ করায় হঠাৎ পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। সেসময় তিনি সংসদকে আরও বলেছিলেন, দেশে বর্তমানে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা ২৪ লাখ মেট্রিক টন। আর গত বছর পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে ২৩ দশমিক ৩০ লাখ মেট্রিক টন। তার মধ্যে ৩০ শতাংশ সংগ্রহকালীন এবং সংরক্ষণকালীন ক্ষতি বাদ দিলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১৬ দশমিক ৩১ লাখ মেট্রিক টন। যা দিয়ে চাহিদা মেটানোর পক্ষে যথেষ্ট নয়।   এরই মধ্যে আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর কাওরান বাজারে দেশি পেঁয়াজের পাইকারি দাম কেজি প্রতি দুইশ টাকা হয়েছে। মানে ২৫ টাকা কেজি দরের পেঁয়াজ ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছে। সাধারণ মানুষ ধারণা করছে হয়তো এই সপ্তাহের মধ্যেই পেঁয়াজ ‘ত্রিপল সেঞ্চুরি’ হাঁকিয়ে ফেলতে পারে। অবস্থা যদি আরও বেগতিক হয় তাহলে হয়তো, টেস্ট ক্রিকেটে ক্যারবীয় যুবরাজ ব্রায়ান লারার অপরাজিত ৪০০ রানের রেকর্ডটিও হুমকির মুখে পড়ে যেতে পারে! বাঙালির এই এক সুবিধা, তারা দুঃখের মধ্যেও হাসতে পারে, রসিকতা করতে পারে। তবে পেঁয়াজ নিয়ে জনতাজনার্দন যতোই হাসি-মশকরা করুক না কেন, তাদের নাভিশ্বাস উঠছে। স্মরণকালের ইতিহাসে কেউ মনে করতে পারছে না, দুইশ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ কিনেছেন। কেন এই পেঁয়াজের ঊর্ধ্বগতি? মোটা দাগে বলা হচ্ছে ভারত থেকে পেঁয়াজের আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই সবজিটির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। কিন্তু ভারত থেকে পেঁয়াজের আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণেই কি শুধু পেঁয়াজের দাম বেড়েছে? আসলে পেঁয়াজের মূল্যের এই ওঠা-নামার পেছনে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে বলে জানিয়েছে ভোক্তা অধিকার সংস্থা কনসাস কনজিউমার্স সোসাইটি। গত ৩ নভেম্বর রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স লাউন্সে এক সংবাদ সম্মেলন করে সংস্থাটি জানিয়েছে, গত চার মাসে অব্যাহতভাবে বাড়ছে পেঁয়াজের দাম। ১২২ দিনে মোট ২৪ বার পণ্যটির দাম ওঠা-নামা করেছে। এই সময়ে ভোক্তার ক্ষতি হয়েছে প্রায় তিন হাজার ২০০ কোটি টাকা। চার মাসে পেঁয়াজের মূল্য বেড়েছে ৪০০ গুণ। আর গত এক মাসে দৈনিক ৫০০ কোটি টাকা করে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। ৩ নভেম্বরের পর আজ ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত পেঁয়াজের দাম আরও ওঠানামা করছে। যা এখন অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে দুইশ টাকা কেজি দর হয়েছে। সাধারণ মানুষ মনে করছে পেঁয়াজের আড়তে সরকারি মনিটরিং না থাকার কারণেই এই দাম বৃদ্ধি হয়েছে। তবে খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতারা বলছেন দেশীয় পেঁয়াজ বাজারে না ওঠা নাগাত পেঁয়াজের দাম কমার কোনও সম্ভাবনা নেই। তার মানে আরও কতদিন পেঁয়াজ নিয়ে ভোগান্তিতে থাকতে হবে ভোক্তাদের তা কেউ জানেন না। তাই এখানেও চিরকালীন রসিক বাঙালি বলছেন, ‘এতদিন সবুরে মেওয়া ফলতো এবার সবুরে পেঁয়াজ ফলবে।  
আর কটা দিন সবুর করো ‘পেঁয়াজ’ বুনেছি
প্রযুক্তির রাজত্ব: মানিয়ে নিতে না পারলে সরে যেতে হবে আপনাকেও
বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তির সাথে মার্কেটিং এর যে যুগল-যাত্রা শুরু হয়েছে তা আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে ভাবা দুষ্কর। বছর খানেক আগেও যে পণ্যগুলো ছাড়া দৈনন্দিন জীবন ভাবা সম্ভব ছিল না আজ সে পণ্য বা ব্র‍্যান্ডগুলোকে খুঁজেও পাওয়া দায় হয়ে পড়ে। এর কারণ প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে মার্কেটিঙের ধরন মেজাজ-মর্জি পাল্টে যাওয়া। কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এক সময়কার মার্কেট লিড দেয়া সাবান, প্রসাধনী কিংবা প্রযুক্তি ব্র্যান্ডগুলো কী কারণে আজ প্রায় বিলুপ্ত? আবার প্রযুক্তি দুনিয়া কাপানো মোবাইল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান নোকিয়া কেন আজ শীর্ষ ১০ কোম্পানি হিসেবে কোনো তালিকায় নেই? মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিস গুলোর দিকে তাকালে স্বাভাবিকভাবেই মাথায় আসে এর মাধ্যমে নিশ্চই দেশে কর্মসংস্থান এর সৃষ্টি হচ্ছে, মানুষ উপকৃত হচ্ছে। বিকাশ, রকেট এর মাধ্যমে মোবাইল রিচার্জ করে হয়তো আপনি বেশ আশাবাদী এই ভেবে যে এর মাধ্যমে ফ্লেক্সিলোড এজেন্টরা আরো একটি ব্যবসার ক্ষেত্র খুঁজে পেলো। কিন্তু মুদ্রার এপিঠ দেখলে আপনাকে অপর পিঠও দেখতে হবে, বিকাশ কিংবা রকেটে আরো একটি বহুল ব্যবহৃত অপশন আছে। হ্যাঁ, মোবাইল রিচার্জ এর কথাই বলছি, মানুষ এখন স্মার্ট হয়েছে, টাকা রিচার্জের জন্য কেহ আর এজেন্টের কাছে যান না ঘরে বসেই মোবাইল রিচার্জ সেরে নেন। ফ্লেক্সিলোড এর দোকান এখন এই কাজগুলো না জানা মানুষগুলোর কারণেই চলছে, আর বাকিরা কেবল বিকাশ রকেটে এ ক্যাশ আউট/ইন এর মতো কাজগুলোই করতে যান। ধীরে ধীরে এই দোকান গুলি এখন মোবাইল ফোনের পার্টস বিক্রয়ের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। আজকের দশকে দাড়িয়ে আপনি হয়ত ভাবতেও পারছেন না, ২০৪০ এ পৃথিবীটা কতটা বদলে যাবে! প্রযুক্তির প্রভাবে আজকের অধিকাংশ চাকরিই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এই কাজগুলো করা হবে স্বয়ংক্রিয় মেশিনের মাধ্যমে। বিশ্বখ্যাত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা মোটর্স সীমিত আকারে বৈদ্যুতিক গাড়ি বাজারজাত করেছে, এখন প্রক্রিয়া চলছে এর উৎপাদনমূল্য কিভাবে হ্রাস করে সকল স্তরের ক্রেতার আস্থা অর্জন করা যায়। ২০২০ সালের মধ্যেই এই একটা আবিষ্কার বদলে দিতে পারে গোটা দুনিয়ার চাল-চিত্র। এর ফলে সামনের ২০ বছরে বর্তমানের অধিকাংশ গাড়িই রাস্তা থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বেঁচে থাকা এই গাড়িগুলো হয় ইলেক্ট্রিকে চলবে অথবা হাইব্রিড গাড়ি হবে। এর ফলে তেল এর ব্যবহার ব্যাপক হারে হ্রাস পাবে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তেলের মূল্য কমিয়ে দিতে বাধ্য হবে এবং অর্থনীতির বিকল্প কোনো পথ না বের করতে পারলে এক পর্যায়ে বেশ ক’টি দেশ দেউলিয়াও হয়ে যেতে পারে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ দেখিয়ে দিয়েছেন টেসলা মোটর্স এর প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক নিজেই ! ২০০৮ সালে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন অতি শীঘ্রই সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ চালিত গাড়ি বাজারে আনতে চলেছে তার কোম্পানি। তারপর দিনই এর প্রভাবে আকষ্মিকভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য হ্রাস পায় ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর তেল মজুদকারীদের মাথায় হাত পড়ে! পাশাপাশি তেল ব্যবসায় করে বিলিয়নিয়ার হওয়া ব্যবসায়ীদের কপালে চিন্তার ভাজ পড়তে বাধ্য হয়। একটি ছোট্ট পরিবর্তন বড় পর্যায়ে কতটা প্রভাব ফেলে এটা যেনো তারই একটি উদাহরণ। গাড়ির এই বিপ্লবে শুধু ইলেক্ট্রিসিটি একাই দাপট দেখাবে তা নয়, এর সাথে চালকবিহীন গাড়িও মাঠে নেমে যাবে আগামী দশ বছরের মধ্যে। “চালকবিহীন গাড়ি” ও “বৈদ্যুতিক গাড়ি” এই দুটি বৈশিষ্ট্য যে পৃথিবীতে কতটা পরিবর্তন আনতে চলেছে তা আজকের দশকে দাঁড়িয়ে বোঝা মুশকিল। চালকবিহীন গাড়ি সাধারণ মানুষদের জন্য উন্মুক্ত হলে ড্রাইভারের খরচ হ্রাস ও প্রয়োজনমতো গাড়ি নিয়ে বেরোনোর সুবিধা পেতে প্রায় ৯০% ক্রেতাই এই বিশেষ বৈশিষ্টের গাড়ি কিনবে এর ফলে ড্রাইভিং পেশার সাথে জড়িত এক বিশাল জনশক্তি বেকার হয়ে পড়বে। শুধু যে ড্রাইভারদের বেকারত্বই হবে তা কিন্তু নয়, ড্রাইভিং শেখার প্রতিষ্ঠানগুলোও মুনাফা করতে না পেরে বিলুপ্ত হবে। আবার এই সুবিধার পাশাপাশি যদি ঐ একই গাড়ি বৈদ্যুতিক সুবিধায়ও চলে তাহলে তো কথাই নেই, আজ মধ্যপ্রাচ্যের যে দেশগুলো তেল ব্যবসা করে মোট অর্থনীতি টিকিয়ে রেখেছে তারা হয়ে পড়বে দেউলিয়া যার ফলস্রুতিতে সৌদি আরবের মতো তেল নির্ভর দেশগুলো চাপে পড়ে হজ্জ ও বিভিন্ন ধর্মীয় খরচ বৃদ্ধি করে দিবে। এবার কৃষির কথায় আসি; চীনে সম্প্রতি কৃষক সংকট দেখা দিয়েছে যার অন্যতম কারণ গ্রামাঞ্চলের মানুষগুলোর শহরমুখীতা। তাই চীনের কৃষি মার্কেটে এক বিপ্লবের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যার ফলস্বরূপ চীনা প্রযুক্তিবিদেরা এক বিশেষ ড্রোন তৈরী করেছে যার মাধ্যমে আবাদি জমির এক পাশে দাড়িয়েই আপনি রিমোট কন্ট্রোল ডিভাইসের মাধ্যমে ঐ ড্রোনের সাহায্যে পুরো আবাদী জমির ফসলের হালচাল বুঝতে পারবেন, শুধু এটুকু দিয়েই ক্ষান্ত হবে না ঐ ড্রোন, তৎক্ষনাৎ বিশেষ বাক্সে মজুদ রাখা লিকুইড সার ছিটিয়ে কৃষকের অধিকাংশ কাজই করে দিবে সে, অতিরিক্ত কোনো মজুরী ছাড়াই! চীনে এই প্রযুক্তি এতই জনপ্রিয় ও সহজলভ্য হচ্ছে যে অতি শীঘ্রই অন্যান্য কৃষিপ্রধান দেশগুলোয় এই সেবা পৌছে যাবে। মজুরি ও যাবতীয় মেইনটেইনেন্স খরচ কমবে বলে কৃষিকাজের হাল ধরবে পাকা ব্যবসায়ীরা। এভাবেই বিলুপ্তপ্রায় হয়ে যেতে পারে কৃষকের সংখ্যা, এই কৃষি প্রক্রিয়ায় নিয়োগ পাবে ড্রোন চালানোয় দক্ষ কর্মীরা। বিল গেটস, ল্যারি পেইজ প্রমুখ কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংএ এমন এক বিপ্লব সৃষ্টি করেছেন যে প্রতিদিনই এখন ডেভেলপাররা লাখ লাখ সফটওয়্যার ইন্টারনেট এ ছাড়ছে। এর মধ্যে আছে বেশ কিছু শিক্ষনীয় সফটওয়্যার SPSS, Loan Calculator, FreshBooks ইত্যাদি অন্যতম। ফিন্যান্স, হিসাবরক্ষন কিংবা পরিসংখ্যান এর যাবতীয় অসৃজনশীল কাজগুলো এক ক্লিকেই সম্পন্ন করতে এখন হাতের নাগালেই মেলে হাজার হাজার সফটওয়্যার। ব্যবহারকারী চাইলে যেকোনো সময় তা ইনস্টল করে শুধু যথাযথ তথ্য দিয়ে মুহুর্তেই নির্ভুলভাবে সঠিক ফলাফল পেতে পারে। এই সফটওয়্যার গুলোর প্রভাব শিক্ষাখাতে পড়তে বাধ্য। সফটওয়্যার এর নির্ভুল ফলাফল, সহজলভ্যতা ও এককালীন ব্যয় হওয়ায় একসময় হিসাববিজ্ঞান ও পরিসংখ্যান এর মেধাবী ছাত্রদেরও নিজেদের ক্ষেত্রে কাজের সুযোগের অভাবে অন্য সেক্টরে কাজ করতে হবে, যার ফলশ্রুতিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই বিশেষ ক’টি বিভাগের শিক্ষার্থীদের আসন সীমিত করে আনতে বাধ্য হবে। শুরুতে যে নোকিয়ার উদাহরণ দিয়েছিলাম, এখন সে টপিকে আসি। নোকিয়ার মার্কেট ধ্বসে পড়ার অন্যতম কারণ এন্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম এর প্রতিযোগিতায় নোকিয়ার নিজস্ব সিম্বিয়ান অপারেটিং সিস্টেমের সাথে পেরে না ওঠা। এন্ড্রয়েড যে কাজটি ভালোভাবে করেছে তা হলো ক্রেতাদের মাঝে নতুন চাহিদা তৈরি করা ও ক্রেতার আগ্রহের দিকটি বিবেচনায় আনা। চারদিকে এন্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমের এত চাহিদা থাকার পরেও তারা নিজেদের সেই পুরাতন অপারেটিং সিস্টেম নিয়েই পরে ছিল। একসময় নিজেদের ভুল বুঝতে পারে কোম্পানিটি, তবে আবারো ভুল সিদ্ধান্ত নেয় নোকিয়া এন্ড্রয়েডে না গিয়ে উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম গ্রহণ করায় আবারো মুখ থুবড়ে পড়ে এক সময়কার টেক জায়ান্ট কোম্পানিটি। সময়ের চাহিদা না বুঝে নিজেদের গোড়ামি তাদেরকে ঠেলে দিয়েছে ধ্বংসের দিকে। আপনি যদি বাজারে কোনো প্রসাধনী সামগ্রী সবুজ প্যাকেটে মুড়ে বিক্রয় করার সিদ্ধান্ত নেন তবে তা শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়বে। এর একটি সাইকোলজিক্যাল কারণ আছে, মানুষ স্বভাবতই কোনো পণ্যের ভেতরের জিনিষটার সাথে বাইরের মোড়কের সামঞ্জস্য চান। আপনি যদি দাত ঝকঝকে সাদা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে হলুদ মোড়কে টুথপেষ্ট বিক্রয় করতে যান তবে ক্রেতাদের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়াটাই স্বাভাবিক। একটা সময় ছিলো যখন মানুষ সবুজ রঙের মোড়ককে “হালাল পণ্য” হিসেবে দেখতো, তবে এখন ক্রেতাদের মানসিকতা পরিবর্তিত হয়েছে। যতই প্রাকৃতিক গুনাবলী সমৃদ্ধ সাবানের কথাই বলুন না কেনো, বিজ্ঞাপনে যদি ফুলের সুবাসের কথা উল্লেখ না করেন ও গোলাপি রঙের মোড়ক ব্যবহার না করতে পারেন তবে এক পর্যায়ে আপনার প্রসাধনীর ব্যবসা বাধ্যতামূলক গুটিয়ে নেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। যুগের পরিবর্তন ও প্রযুক্তির বিপ্লবের ফলে অসৃজনশীল চাকরীগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং তৈরি হবে নতুন চাকরীর ক্ষেত্র, তবে সেটার সুযোগ কেবলমাত্র তারাই নিতে পারবেন যারা আধুনিক প্রযুক্তির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারবেন। তো যে কথাটি বলছিলাম, সময়ের সাথে নিজেকে ও নিজের ব্যবসাকে পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাথে মানিয়ে নিতে না পারলে একটা সময় যুগই আপনাকে তার রাস্তা থেকে সরিয়ে দিবে। ফয়সাল আরেফিন, শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।   এসজে
প্রযুক্তির রাজত্ব: মানিয়ে নিতে না পারলে সরে যেতে হবে আপনাকেও
মিথিলারা চুমু খাইলে আপনার কী?
সোশ্যাল মিডিয়ার ইস্যু লইয়া মানুষের ঘুম হারাম হইয়া গিয়াছে। তাহারা সর্বদা ইস্যু খুঁজিতে হয়রান। ওই কবিতার মতো আর কী। ‘একটা যদি পাই অমনি ধরে গাপুস গুপুস খাই।’  ইস্যু আসে ইস্যু যায়। প্রতিবাদ ওঠে। কাহারো যেন প্রতিবাদ করিবার তর সহে না। সেই ভাইরাল গানটির কথা মনে পড়িয়া গেল। 'অপরাধী' গান। এক একজন হুজুর বলিতেছিলেন- পোলা কয় মাইয়া অপরাধী, মাইয়া কয় পোলা অপরাধী তাইলে পুলিশ করে কী? প্রসঙ্গতই আমারও জানিবার ইচ্ছা করিতেছে সবাই অপরাধী ধরিবার লাগিয়া যে হৈচৈ ফেলিয়া দিয়াছে তাহাতে কোনও সমাধান আসিবার সম্ভাবনা দেখিতে পাইবার লক্ষণ দেখিতেছি না। কারণ দিনে দিনে আমরাও সকলেই অপরাধীর খাতায় নাম লিখাইয়া ফেলিয়াছি। যদি তাহাই না হইবে এত অপরাধ বাড়িয়া যাইতেছে কেমন করিয়া। খুন, ধর্ষণ যেভাবে বাড়িয়াছে ইহা কোনও সভ্য সমাজের রূপ হইতে পারে না। অভিনেত্রী মিথিলাকে নিয়া ইদানীংকালে যেন কাহারো ঘুম হইতেছে না। তাহার সহিত যাহার ছবি দেখা যাইতেছে উহাকেই প্রেমিক হিসেবে আখ্যায়িত করা হইতেছে। সৌজন্যে ওই সোশ্যাল মিডিয়া। একজন নারীর বিবাহ বিচ্ছেদ হইয়াছে বলিয়া কি তাহার কোনও বন্ধু থাকিতে পারিবে না। সামাজিক জীব হিসেবে ইহাই তো তাহার সহজাত ধর্ম। গায়ক জন কবির, কলকাতার পরিচালক সৃজিত অতঃপর নির্মাতা ইফতেখার আহমেদ ফাহমির সহিত মিথিলার ছবি ভাইরাল হইয়াছে। ফাহমি-মিথিলার যেন টিকিয়া থাকা দ্বায় হইয়া গিয়াছে। অথচ বছর খানেক আগেই জাতীয় ক্রাশ বলিয়া মিথিলাকে সম্বোধন করিত সকলে। তাহা হইলে কি ছবিগুলোই কাল হইয়া গেল। একটি ফেসবুক গ্রুপ থাকিয়া ওই দুটি ছবি পোস্ট করা হইয়াছে। --------------------------------------------------------------- আরো পড়ুন: ফাহমি ও মিথিলার অন্তরঙ্গ ছবি ভাইরাল --------------------------------------------------------------- কেহই কহিয়াতেছে না কাহারো ব্যক্তিগত ছবি কি করিয়া পোস্ট হইল কেইবা করিল। তাহাদের কি আইনের আওতায় আনা হইবে কিনা। ইহা লইয়া তো এখন কতশত আইন হইয়াছে। ফাহমি-মিথিলার যে ছবি লইয়া এত সমালোচনা চলিতেছে ভাবিয়া দেখুন তো এমন কোনও ছবিই কি আপনার কাহারো সহিত নাই। আপনার ছবিও একদা ভাইরাল হইবে না সেই নিশ্চয়তা  কে দেবে? আমাদিগের এখন সমাজ লইয়া ইস্যু লইয়া না ভাবিয়া স্বভাব লইয়া ভাবিবার সময় আসিয়াছে। স্বভাব বদলাইলে একদা সমাজ বদলাইয়া যাইবে, তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। এম/জেবি
মিথিলারা চুমু খাইলে আপনার কী?
আরও পড়ুন
প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য হটলাইন চালু
সংসদে তোপের মুখে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে সংসদ সদস্য ইসরাফিল আলমের ক্ষোভ
মালয়েশিয়া থেকে প্রবাসীদের এনআইডি প্রক্রিয়া চালু