
খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো/বর্গী এলো দেশে। বুলবুলিতে ধান খেয়েছে/খাজনা দিবো কিসে?/ধান ফুরুল/ পান ফুরুল/খাজনার উপায় কী?/আর কটা দিন সবুর কর/রসুন বুনেছি। ছোটবেলায় এই ছড়া না শুনে ঘুমাতে গিয়েছে এমন বাঙালি পাওয়া হয়তো ভার। মায়েরা হয়তো আজো এই ছড়া শুনিয়ে তাদের শিশুদের ঘুম পাড়ান। কিন্তু এবার পেঁয়াজের কেজি যখন ডাবল সেঞ্চুরি ছাড়িয়ে গেছে, তখন রসিকজনেরা রসুন বুনার জায়গায় পেঁয়াজ বুনতে শুরু করেছেন। অবশ্য রসিকজনদের দোষ দিয়ে কোনও লাভ নেই। গত আট নভেম্বর আমাদের বাণিজ্যমন্ত্রী রংপুর নগরীর একটি হোটেলে বলেছিলেন ক্ষেতের পেঁয়াজ উঠার আগে দাম কমার সম্ভাবনা কম। অতএব দিন যতো যাচ্ছে মন্ত্রীর কথাই সত্যি হচ্ছে। ক্ষেতের পেঁয়াজ না উঠার আগে পেঁয়াজের দাম কমার কোনও সম্ভাবনা যে নেই এমনটাই বুঝা যাচ্ছে।
এরপর গেল মঙ্গলবার (১২ নভেম্বর) একাদশ জাতীয় সংসদের পঞ্চম অধিবেশনে সরকারি দলের সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেন খানের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য মন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হূমায়ুন সংসদকে জানিয়েছিলেন, চাহিদার তুলনায় পেঁয়াজ কম উৎপাদন ও ভারত রপ্তানি বন্ধ করায় হঠাৎ পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।
সেসময় তিনি সংসদকে আরও বলেছিলেন, দেশে বর্তমানে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা ২৪ লাখ মেট্রিক টন। আর গত বছর পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে ২৩ দশমিক ৩০ লাখ মেট্রিক টন। তার মধ্যে ৩০ শতাংশ সংগ্রহকালীন এবং সংরক্ষণকালীন ক্ষতি বাদ দিলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১৬ দশমিক ৩১ লাখ মেট্রিক টন। যা দিয়ে চাহিদা মেটানোর পক্ষে যথেষ্ট নয়।
এরই মধ্যে আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর কাওরান বাজারে দেশি পেঁয়াজের পাইকারি দাম কেজি প্রতি দুইশ টাকা হয়েছে। মানে ২৫ টাকা কেজি দরের পেঁয়াজ ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছে। সাধারণ মানুষ ধারণা করছে হয়তো এই সপ্তাহের মধ্যেই পেঁয়াজ ‘ত্রিপল সেঞ্চুরি’ হাঁকিয়ে ফেলতে পারে। অবস্থা যদি আরও বেগতিক হয় তাহলে হয়তো, টেস্ট ক্রিকেটে ক্যারবীয় যুবরাজ ব্রায়ান লারার অপরাজিত ৪০০ রানের রেকর্ডটিও হুমকির মুখে পড়ে যেতে পারে!
বাঙালির এই এক সুবিধা, তারা দুঃখের মধ্যেও হাসতে পারে, রসিকতা করতে পারে। তবে পেঁয়াজ নিয়ে জনতাজনার্দন যতোই হাসি-মশকরা করুক না কেন, তাদের নাভিশ্বাস উঠছে। স্মরণকালের ইতিহাসে কেউ মনে করতে পারছে না, দুইশ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ কিনেছেন।
কেন এই পেঁয়াজের ঊর্ধ্বগতি? মোটা দাগে বলা হচ্ছে ভারত থেকে পেঁয়াজের আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই সবজিটির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। কিন্তু ভারত থেকে পেঁয়াজের আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণেই কি শুধু পেঁয়াজের দাম বেড়েছে? আসলে পেঁয়াজের মূল্যের এই ওঠা-নামার পেছনে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে বলে জানিয়েছে ভোক্তা অধিকার সংস্থা কনসাস কনজিউমার্স সোসাইটি।
গত ৩ নভেম্বর রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স লাউন্সে এক সংবাদ সম্মেলন করে সংস্থাটি জানিয়েছে, গত চার মাসে অব্যাহতভাবে বাড়ছে পেঁয়াজের দাম। ১২২ দিনে মোট ২৪ বার পণ্যটির দাম ওঠা-নামা করেছে। এই সময়ে ভোক্তার ক্ষতি হয়েছে প্রায় তিন হাজার ২০০ কোটি টাকা। চার মাসে পেঁয়াজের মূল্য বেড়েছে ৪০০ গুণ। আর গত এক মাসে দৈনিক ৫০০ কোটি টাকা করে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। ৩ নভেম্বরের পর আজ ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত পেঁয়াজের দাম আরও ওঠানামা করছে। যা এখন অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে দুইশ টাকা কেজি দর হয়েছে।
সাধারণ মানুষ মনে করছে পেঁয়াজের আড়তে সরকারি মনিটরিং না থাকার কারণেই এই দাম বৃদ্ধি হয়েছে। তবে খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতারা বলছেন দেশীয় পেঁয়াজ বাজারে না ওঠা নাগাত পেঁয়াজের দাম কমার কোনও সম্ভাবনা নেই। তার মানে আরও কতদিন পেঁয়াজ নিয়ে ভোগান্তিতে থাকতে হবে ভোক্তাদের তা কেউ জানেন না। তাই এখানেও চিরকালীন রসিক বাঙালি বলছেন, ‘এতদিন সবুরে মেওয়া ফলতো এবার সবুরে পেঁয়াজ ফলবে।




