ঢাকা রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩

হামে মৃত্যু: অর্ধেক শিশুরই টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি, আক্রান্ত ৭৭% টিকা পায়নি

আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬, ০৪:৫৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত

দেশের শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে সরকারি তথ্যে। দেখা যাচ্ছে, ২১ জেলায় হাম শনাক্ত হয়ে মারা যাওয়া ৬০ জন শিশুর প্রায় অর্ধেকই নয় মাস বয়সের কম, যাদের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী টিকা দেওয়ার বয়সই এখনও হয়নি। আরও আক্রান্তদের ৭৭ শতাংশই টিকা পায়নি।

সোমবার (১১ মে) সকাল ৮টা পর্যন্ত হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪১৫ জনে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে ৬৫ জনের মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামে হয়েছে এবং ৩৫০টি হাম-সদৃশ উপসর্গে মৃত্যু।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) ২১টি জেলা থেকে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হাম শনাক্ত হয়ে মৃত ৬০ জন শিশুর মধ্যে ২৯ জনেরই মৃত্যু হয়েছে নয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগে। এর মধ্যে ১৫ জন শিশুর বয়স ছিল মাত্র ছয় মাস বা তারও কম।

বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, সরকারিভাবে হাম-রুবেলার প্রথম টিকাটি দেওয়া হয় নয় মাস বয়সে এবং দ্বিতীয়টি ১৫ মাসে। ফলে এই বয়সের নিচের শিশুরা এক প্রকার সুরক্ষাহীন অবস্থায় ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

মৃত শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে কনিষ্ঠ শিশুর বয়স ছিল মাত্র তিন মাস এবং সবচেয়ে বড় শিশুর বয়স ছিল নয় বছর।

গত মাসে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরুর আগে ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজারি গ্রুপ হামের টিকা দেওয়ার বয়স ছয় মাসে নামিয়ে আনার সুপারিশ করেছিল। কারণ সম্প্রতি আক্রান্ত শিশুদের এক-তৃতীয়াংশের বয়সই ছিল নয় মাসের নিচে।

হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে। তবে নিয়মিত টিকাদানের সময়সূচি আগের মতোই রাখা হয়েছে।

নয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফজলে রাব্বি চৌধুরী বলেন, মায়ের দুধ পান করা শিশুরা সাধারণত মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির কারণে অন্তত নয় মাস পর্যন্ত হাম থেকে সুরক্ষিত থাকে বলে ধারণা করা হয়। এ কারণেই হামের প্রথম ডোজ নয় মাস বয়সে দেওয়া হয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে সব শিশুই নয় মাস পর্যন্ত সমানভাবে সুরক্ষিত থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু শিশুর ক্ষেত্রে ছয় মাস বয়স থেকেই অ্যান্টিবডির মাত্রা ও সুরক্ষা কমতে শুরু করতে পারে।

তিনি বলেন, মায়ের শরীর থেকে পাওয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ছয় থেকে নয় মাস বয়সের মধ্যে ধীরে ধীরে কমে যায়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ২৬ শতাংশ ক্ষেত্রে এই সুরক্ষা কমতে পারে। সেক্ষেত্রে শিশুরা হামে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। হামে আক্রান্ত হওয়ার পর সাধারণত শরীরে শক্তিশালী প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। তবে অন্য কোনো শারীরিক জটিলতা বা ঝুঁকির কারণে কিছু শিশুর মৃত্যু হতে পারে।

আরও পড়ুন

ফজলে রাব্বি বলেন, এসব জটিলতার মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মেনিনজাইটিসসহ অন্যান্য সমস্যা থাকতে পারে। বিস্তারিত গবেষণা ছাড়া আক্রান্ত শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল ছিল কি না তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে অপুষ্টি একটি বড় কারণ হতে পারে বলে অনেক শিশু বিশেষজ্ঞ মনে করছেন। এছাড়া, অনেক শিশুর মায়ের হয়তো হামের টিকা নেওয়া ছিল না বা তারা আগে কখনো হামে আক্রান্ত হননি। ফলে মায়ের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকলে শিশুরাও প্রয়োজনীয় সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি পায় না।

তার মতে, ছয় থেকে নয় মাস বয়সী শিশুদের সংক্রমণ ও মৃত্যুর পেছনে এসব কারণ আংশিকভাবে দায়ী হতে পারে। তবে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে গভীর গবেষণা হওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সহযোগী অধ্যাপক ফজলে রাব্বি বলেন, বর্তমানে ছড়িয়ে পড়া হামের ভাইরাসে আগের তুলনায় কোনো ধরনের মিউটেশন বা পরিবর্তন ঘটেছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।

ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক আরিফুল বাশার বলেন, বর্তমানে অনেক মায়ের শরীরে প্রাকৃতিক সংক্রমণের বদলে টিকার মাধ্যমে তৈরি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে। তবে সেই সুরক্ষা সবসময় শিশুদের নয় মাস বয়স পর্যন্ত পর্যাপ্ত সুরক্ষা দিতে নাও পারে। এ কারণেও অনেক শিশু প্রয়োজনীয় সুরক্ষা না পেয়ে আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে পারে। বিষয়টি তদন্ত করা প্রয়োজন। দেরিতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়াও মৃত্যুর একটি কারণ হতে পারে।

হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দুদিনের মধ্যে অনেক শিশুর মৃত্যুর বিষয়ে ফজলে রাব্বি বলেন, এটি বিশ্বব্যাপী প্রবণতার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তিনি বলেন, হামের জটিলতা, যেমন নিউমোনিয়া, চোখের সংক্রমণ, ডায়রিয়া ও এনসেফালাইটিস—দ্রুত চিকিৎসা ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার আওতায় না এলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

প্রায় সব শিশুরই জ্বর ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা ছিল, যা এই অত্যন্ত সংক্রামক রোগের সাধারণ উপসর্গ। অন্তত ১১ জন শিশুর নিউমোনিয়া ছিল। অন্যদের মধ্যে ডায়রিয়া ও মেনিনজাইটিসসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের বিস্তার ঠেকাতে ও শিশুদের সুরক্ষায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি ও নিয়মিত টিকাদানের মাধ্যমে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। একে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বলা হয়। হার্ড ইমিউনিটি অর্জিত হলে ভাইরাস সহজে ছড়াতে পারে না। ফলে টিকা নেওয়া ও টিকা না নেওয়া—উভয় ধরনের মানুষই সুরক্ষিত থাকে।

আরটিভি/এমএ

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে একদিনে ৪ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১৬৩১   
দেশজুড়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এতে চলতি বছর মশাবাহিত রোগটিতে এ পর্যন্ত মোট প্রাণহানি ২৯৯ জনে দাঁড়াল।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে একদিনে ৪ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১৬৩১   
‘৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দিচ্ছে সরকার’
দেশের স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের জনবল সংকট নিরসনে সরকার পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত।
‘৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দিচ্ছে সরকার’
হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৮ শিশুর মৃত্যু
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৮৬ জন।  শনিবার (১০ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১২২ জনে। তাদের মধ্যে নিশ্চিত হামে ১০২ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে আটজনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছেন ৪৩ জন। এ নিয়ে চলতি বছর দেশে নিশ্চিত হামে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৬৬৬ জনে। এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ১০৯ জনের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। এতে চলতি বছর দেশে সন্দেহভাজন হাম সংক্রমণের মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯৫ হাজার ১৯৭ জনে। আরটিভি/টিআর
হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৮ শিশুর মৃত্যু
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস আজ
বাংলাদেশে প্রায় তিন কোটি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। অথচ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন আক্রান্তদের বড় অংশ।
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস আজ
৯ দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে অর্ধশত মৃত্যু
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশজুড়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি অক্টোবরের প্রথম ৯ দিনে ৫০ জনের মৃত্যু হলো। 
৯ দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে অর্ধশত মৃত্যু
আরও পড়ুন
খেলতে গিয়ে পুকুরে পড়ে ৩ বছরের শিশুর মৃত্যু
পল্লি চিকিৎসকের ভুল ইনজেকশনে প্রাণ গেল ৪ বছরের শিশুর
হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৮ শিশুর মৃত্যু
‘জেলে গেলেও পরোয়া নেই’, শিক্ষিকাকে গুলির পর বলেছিল ৬ বছরের শিশু