
স্বাস্থ্যসেবায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। এর সঙ্গে চিকিৎসাক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন পেশার সুযোগও বাড়ছে। এর মধ্যে রেডিয়েশন থেরাপি ও রেডিওলজিক প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ দুটি পেশাগত ক্ষেত্র। দুটি ক্ষেত্রেই আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্র ব্যবহার করা হলেও কাজের ধরন, রোগী এবং দায়িত্বে রয়েছে বড় পার্থক্য।
একটি ক্ষেত্রে ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় বিকিরণ প্রয়োগ করা হয়। অন্যদিকে, রেডিওলজিক প্রযুক্তির মাধ্যমে রোগ নির্ণয়ের জন্য এক্স-রে ও অন্যান্য ছবি তৈরি করা হয়।
রেডিয়েশন থেরাপি কী?
রেডিয়েশন থেরাপি মূলত ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। এ পেশায় কাজ করা ব্যক্তিরা ক্যানসার চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী রোগীর শরীরে নির্ধারিত মাত্রায় বিকিরণ প্রয়োগ করেন।
চিকিৎসার সময় রোগীকে সঠিক অবস্থানে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শরীরের নির্দিষ্ট অংশে বিকিরণ প্রয়োগ করা হয়। রোগীর অবস্থানে সামান্য পরিবর্তন হলেও চিকিৎসার নির্ভুলতায় প্রভাব পড়তে পারে।
এ কাজে উন্নত চিকিৎসা যন্ত্র ও ছবি তৈরির প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। রেডিয়েশন থেরাপির সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা সাধারণত হাসপাতালের ক্যানসার চিকিৎসা বিভাগ, ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র এবং বহির্বিভাগীয় চিকিৎসাকেন্দ্রে কাজ করেন।
এই পেশার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রোগীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ। ক্যানসারের চিকিৎসায় অনেক রোগীকে কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন বা নির্ধারিত সময় অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হয়। ফলে একই রোগীর সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাজ করার সুযোগ থাকে। রোগীর প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, চিকিৎসার সময় স্বস্তি দেওয়া এবং মানসিকভাবে পাশে থাকাও এই কাজের অংশ।
রেডিয়েশন থেরাপির কর্মীদের ক্যানসার চিকিৎসক, চিকিৎসা পদার্থবিদ, চিকিৎসার মাত্রা নির্ধারণকারী বিশেষজ্ঞ, নার্সসহ অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হয়।
রেডিওলজিক প্রযুক্তিতে কী কাজ করতে হয়?
রেডিওলজিক প্রযুক্তির প্রধান কাজ হলো রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ছবি তৈরি করা। এক্স-রে এবং বিশেষ ধরনের ছবি তৈরির পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অংশের তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
এই পেশায় কাজের বৈচিত্র্য বেশি। একই দিনে বিভিন্ন বয়সের রোগীর বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা করতে হতে পারে। রোগীকে সঠিক অবস্থানে রাখা, যন্ত্র সঠিকভাবে পরিচালনা করা, অপ্রয়োজনীয় বিকিরণ কমানো এবং চিকিৎসকের প্রয়োজন অনুযায়ী মানসম্মত ছবি তৈরি করা এই পেশার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
রেডিওলজিক প্রযুক্তিবিদরা হাসপাতাল, রোগ নির্ণয়কেন্দ্র, চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বার, জরুরি বিভাগ, অস্ত্রোপচারকক্ষ এবং জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্রে কাজ করতে পারেন।
দুই পেশার মূল পার্থক্য
রেডিয়েশন থেরাপির মূল লক্ষ্য ক্যানসারের চিকিৎসা দেওয়া। এ ক্ষেত্রে রোগীর শরীরে নির্ধারিত মাত্রায় বিকিরণ প্রয়োগ করা হয়।
অন্যদিকে রেডিওলজিক প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য রোগ নির্ণয়ে সহায়তা করা। এ ক্ষেত্রে এক্স-রে ও অন্যান্য ছবি তৈরি করে চিকিৎসকদের রোগ শনাক্ত ও মূল্যায়নে সহায়তা করা হয়।
রেডিয়েশন থেরাপিতে সাধারণত ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়। আর রেডিওলজিক প্রযুক্তিতে শিশু, তরুণ, বয়স্কসহ বিভিন্ন ধরনের রোগীর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ থাকে।
কোন পেশা কার জন্য?
যারা ক্যানসারের চিকিৎসা, রোগীর সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাজ করা এবং অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চিকিৎসা দেওয়ার কাজে আগ্রহী, তাদের জন্য রেডিয়েশন থেরাপি উপযুক্ত একটি পেশার পথ হতে পারে।
অন্যদিকে যারা রোগ নির্ণয়ের জন্য ছবি তৈরি, বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা এবং বিভিন্ন চিকিৎসা পরিবেশে কাজ করতে আগ্রহী, তাদের জন্য রেডিওলজিক প্রযুক্তি আকর্ষণীয় পেশা হতে পারে।
দুটি ক্ষেত্রেই আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয়। তবে রেডিয়েশন থেরাপি মূলত চিকিৎসা দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত, আর রেডিওলজিক প্রযুক্তি মূলত রোগ নির্ণয়ের কাজে সহায়তা করে।
পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণ
কেমব্রিজ কলেজ অব হেলথকেয়ার অ্যান্ড টেকনোলজির তথ্য অনুযায়ী, রেডিয়েশন থেরাপি ও রেডিওলজিক প্রযুক্তি—দুই ক্ষেত্রেই দুই বছরের সহযোগী বিজ্ঞান বিষয়ে ডিগ্রি নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
রেডিয়েশন থেরাপির পড়াশোনায় শ্রেণিকক্ষ ও অনলাইনভিত্তিক শিক্ষার পাশাপাশি হাসপাতাল ও ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্রে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহারের সঙ্গে পরিচিত করা হয়।
অন্যদিকে রেডিওলজিক প্রযুক্তির শিক্ষার্থীদের আধুনিক ছবি তৈরির যন্ত্রে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ থাকে।
দুই ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট পেশাগত সনদের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষার প্রস্তুতি দেওয়া হয়। পড়াশোনা শেষে শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে কাজের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করতে পারেন।
কোথায় পড়ার সুযোগ?
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, রেডিয়েশন থেরাপির পড়াশোনা ডেলরে বিচ, মিয়ামি ও আটলান্টার ক্যাম্পাসে চালু রয়েছে। আর রেডিওলজিক প্রযুক্তির পড়াশোনা ডেলরে বিচ, মিয়ামি, অরল্যান্ডো ও আটলান্টার ক্যাম্পাসে রয়েছে।
দুই ক্ষেত্রেই ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, বাস্তব কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা এবং পেশাগতভাবে প্রস্তুত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পড়াশোনা শেষে চাকরির প্রস্তুতি, জীবনবৃত্তান্ত তৈরি, সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতি এবং নিয়োগদাতাদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
দেশে রেডিয়েশন থেরাপি ও রেডিওলজিক প্রযুক্তিতে ডিপ্লোমা, বিএসসি ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে। সরকারি পর্যায়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, রংপুরসহ বিভিন্ন ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজিতে এসব বিষয়ে পড়ানো হয়। বেসরকারি পর্যায়ে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস, বাংলাদেশ হেলথ প্রফেশনস ইনস্টিটিউট, ট্রমা ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল টেকনোলজি, স্টেট কলেজ অব হেলথ সায়েন্স ও সাইক কলেজ অব মেডিকেল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রেডিওলজি, ইমেজিং ও রেডিওথেরাপি বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে।
এক কথায়
রেডিয়েশন থেরাপি—ক্যানসারের চিকিৎসায় বিকিরণ প্রয়োগ।
রেডিওলজিক প্রযুক্তি—রোগ নির্ণয়ের জন্য এক্স-রে ও অন্যান্য ছবি তৈরি।
দুটি পেশাই আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনটি বেছে নেওয়া হবে, তা নির্ভর করে একজন শিক্ষার্থীর আগ্রহ—তিনি চিকিৎসা দেওয়ার কাজে যুক্ত হতে চান, নাকি রোগ নির্ণয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার করতে চান।
সূত্র: ক্যামব্রিজ কলেজ অফ হেলথকেয়ার এন্ড টেকনোলজি
আরটিভি/জেএমএ

