তরুণদের আন্দোলনে উত্তাল ভারত, ব্যাপক বিশৃঙ্খলা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬ , ০৪:৪৮ পিএম


তরুণদের আন্দোলনে উত্তাল ভারত, ব্যাপক বিশৃঙ্খলা
ছবি: সংগৃহীত

শিক্ষা সংস্কার এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি এখন ভারতের একটি জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এ নিয়ে বর্তমান শাসক দল বিজেপি নজিরবিহীন চাপের মুখে পড়েছে। এমনকি এই আন্দোলন কোন দিকে গিয়ে শেষ হবে, তা এখনও অজানা। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে রয়েছে ভারতের কাকরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। 

আন্দোলনরত এই তরুণদের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী ও তাদের সমর্থকদের ওপর পুলিশ চড়াও হওয়ার পরদিন অর্থাৎ মঙ্গলবার (২১ জুলাই) ভারতের রাজধানী দিল্লিতে আবার হাজারো মানুষ সমবেত হয়েছেন। তবে শুধু দিল্লিতে এই আন্দোলন এখন আর সীমাবদ্ধ নেই। ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য কেরালা রাজ্য, যেখানে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান করে নিরাপত্তা বাহিনী। 

অন্যদিকে, এই আন্দোলনে যোগ দিতে রাজস্থান থেকে মানুষ এসে দিল্লিতে জড়ো হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। ভারতের স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই দাবি করে আন্দোলনে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ করছে বলে অভিযোগও করেছেন।

সোমবার (২০ জুলাই) আয়োজিত এই প্রতিবাদে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী অংশ নেন। তারা পুলিশের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পার্লামেন্টের দিকে পদযাত্রা করার চেষ্টা করেন।

মধ্যাঞ্চলীয় দিল্লি ব্যাপক সহিংসতার সাক্ষী হয়, যেখানে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ এবং লাঠিচার্জ করলে অন্তত ৬০ জন আন্দোলনকারী আহত হন। পুলিশ মূল প্রতিবাদস্থলের মঞ্চ এবং অস্থায়ী তাঁবুগুলোও ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়।

পুলিশ জানিয়েছে, তাদের ১১৮ জন কর্মী আহত হয়েছেন এবং ৭০ জন আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়েছে।

প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে লাঠি ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের বিষয়ে পুলিশ এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার কোনো মন্তব্য করেনি। তবে বিরোধী দলগুলো এই সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

সিজেপি মূলত একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলন, যা চলতি বছরের শুরুর দিকে ভারতের প্রধান বিচারপতির করা মন্তব্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে গড়ে ওঠে। তিনি সাংবাদিকতা ও অ্যাক্টিভিজমের দিকে ঝুঁকে পড়া বেকার তরুণদের বোঝাতে কাকরোচ (তেলাপোকা) শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। এই মন্তব্য নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হলে পরবর্তীতে তিনি ব্যাখ্যা দেন যে, তিনি কেবল ভুয়া ও বানোয়াট ডিগ্রিধারিদের উদ্দেশ্য কর এটি বলেছিলেন।

সোমবারের বিশাল জনসমাগম প্রমাণ করে যে, সিজেপি কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল না হওয়া সত্ত্বেও লাখ লাখ মানুষকে রাজপথে নামিয়ে আনার মতো একটি আন্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।

প্রতিবাদকারীরা গত এক মাস ধরে দিল্লির ৩০০ বছরের পুরনো পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ‘জন্তর মন্তরে’ অবস্থান করছেন। ২৮ জুন অ্যাক্টিভিস্ট ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক তাদের সাথে যোগ দিয়ে দাবির সমর্থনে অননির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করলে এটি আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করে।

শনিবার পুলিশ তাকে জোরপূর্বক প্রতিবাদস্থল থেকে সরিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যায়, যেখানে তিনি এখনও অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন।

এই আন্দোলনটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোদীর বিরুদ্ধে সর্বজনীন অসন্তোষ প্রকাশের অন্যতম স্পষ্ট ও দৃশ্যমান প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

ওয়াংচুক এবং সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে বেশিরভাগ প্রধান বিরোধী দল, কৃষক নেতা, অ্যাক্টিভিস্ট এবং বলিউড তারকা সহ বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের সমর্থন পেয়েছেন।

বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধী বলেছেন, শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো যৌক্তিক ছিল এবং তিনি মোদীকে ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে যুব-বিরোধী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

সোমবারের আগ পর্যন্ত সরকার আন্দোলনকারীদের সাথে আলোচনায় বসেনি। অবশেষে সোমবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা সিজেপির কয়েকজন নেতার সাথে সাক্ষাৎ করে তাদের দাবি শোনেন।

আন্দোলনকারীদের ডাকা পার্লামেন্ট অভিযান কর্মসূচিতে অংশ নিতে সারাদেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ এসে উপস্থিত হওয়ার পর মন্ত্রী তাদের সাথে এই বৈঠকে বসেন।

নাড্ডা, যিনি ক্ষমতাসীন বিজেপির একজন শীর্ষ নেতা, বলেন, বৈঠকটি সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। আমি সব প্রতিবাদকারীকে তাদের অবস্থান কর্মসূচি শেষ করতে এবং আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক করতে প্রশাসনকে সহায়তা করার জন্য অনুরোধ করেছি।

সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস জানান, নাড্ডার সাথে তাদের ১০ মিনিটের বৈঠকটি কোনো সুনির্দিষ্ট আশ্বাস ছাড়াই শেষ হয়েছে, কেবল বিষয়টি খতিয়ে দেখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সিজেপির আরেক নেতা আশুতোষ রাঙ্কা এই বৈঠকের জন্য চার ঘণ্টা অপেক্ষা করাকে সময়ের অপচয় বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

সোমবার সন্ধ্যায় এক পর্যায়ে মনে হয়েছিল যে সিজেপি হয়তো বৈঠকের পর তাদের প্রতিবাদ স্থগিত করতে রাজি হতে পারে।

কিন্তু সারা দিন এলাকাটিতে বন্ধ থাকা ইন্টারনেট পরিষেবা চালুর পর সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র প্রকাশ পেলে তাদের অবস্থান আরও কঠোর হয়।

দিনের বেলা আমি প্রতিবাদকারীদের আহতদের জন্তর মন্তরে নিয়ে আসতে দেখি। তাদের মধ্যে মাথা ফেটে রক্তে ভেসে যাওয়া এক তরুণ ছিল, যাকে স্বেচ্ছাসেবক চিকিৎসকরা ব্যান্ডেজ করছিলেন এবং অন্য এক ছাত্রের পা ভেঙে গিয়েছিল।

প্রতিবাদকারীরা নাড্ডার সাথে সাক্ষাৎ করার সময়েই পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনী জন্তর মন্তর খালি করতে চলে আসে। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন সাদা পোশাকের কর্মকর্তাও ছিলেন, যাদের অনেকের মুখ ঢাকা ছিল। তারা ইউনিফর্ম পরা পুলিশের সাথে মিলে আন্দোলনকারীদের ধাওয়া করে এবং লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকে।

মাইকে বারবার ঘোষণা দিয়ে সতর্ক করা হচ্ছিল- এখনই চলে যান, এই প্রতিবাদ শেষ।

প্রতিবাদকারীরা আতঙ্কে পালিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের ব্যারিকেড টপকে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে। আমি দেখেছি অনেকে মাটিতে পড়ে যান, কেউ কেউ লাঠির আঘাতে আঘাতপ্রাপ্ত হন, ভাই-বোন ও বন্ধুবান্ধবরা একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান এবং নারীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।

এই অপারেশনের নেতৃত্বে থাকা জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজি হননি। কয়েক মিনিট পর, আমাকে বাইরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এক জ্যেষ্ঠ নারী কর্মকর্তাকে পাঠানো হয়।

ইন্টারনেট ফের চালুর পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো এমন সব ভিডিওতে সয়লাব হয়ে যায়, যেখানে দেখা যায় যে নিরাপত্তা বাহিনী নারীসহ প্রতিবাদকারীদের বেধড়ক পেটাচ্ছে এবং অনেকেই মাটিতে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছেন।

সোমবার রাতে সিজেপি পুনরায় জন্তর মন্তরের প্রতিবাদস্থল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে: "এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শেষ হচ্ছে না!"
"পুলিশি বর্বরতা সত্ত্বেও সিজেপির সাহসী প্রতিবাদকারীরা ফিরে এসেছে। দিল্লিবাসী, বাইরে আসুন এবং জন্তর মন্তরে আমাদের সাথে যোগ দিন—এটি হয় এখন, না হয় কখনোই নয়! ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অবশ্যই পদত্যাগ করতে হবে!"—বার্তায় লেখা ছিল।

এক বিবৃতিতে পুলিশ পরবর্তীতে দাবি করে যে, প্রতিবাদকারীরা "উচ্ছৃঙ্খল, আক্রমণাত্মক ও হিংসাত্মক আচরণ" প্রদর্শন করেছে, ছত্রভঙ্গ হতে অস্বীকার করেছে এবং বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেছে।
পুলিশ আরও জানায়, "প্রতিবাদকারীরা পুলিশ কর্মীদের লক্ষ্য করে পাথর ও অন্যান্য বস্তু দিয়ে আক্রমণ করে, ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করে, পুলিশ ও অন্যান্য সরকারি গাড়ি ভাঙচুর করে, সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি করে এবং ব্যাপক সহিংসতায় লিপ্ত হয়।"

সিজেপি পুলিশের এই বিবরণ প্রত্যাখ্যান করে তাদের বিরুদ্ধে প্রথম আক্রমণকারী হওয়ার অভিযোগ এনেছে। সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে তারা আহত বা আইনি সহায়তার প্রয়োজনীয় সমর্থকদের তাদের সাথে যোগাযোগ করার আহ্বান জানিয়েছে।

"আমাদের সব সমর্থকদের কাছে, বিশেষ করে পুরুষ পুলিশ কর্মকর্তাদের দ্বারা নৃশংসভাবে মারধরের শিকার হওয়া মেয়েদের কাছে আমি ক্ষমা চাইছি। আমরা আরও ভালো ব্যবস্থা নিতে পারতাম। দিল্লি পুলিশের অমানবিক আচরণ থেকে আপনাদের রক্ষা করতে আমার আরও উদ্যোগী হওয়া উচিত ছিল," দিপকে এক্সে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করেন।

অন্য একটি পোস্টে তিনি জানান, এক আহত নারী সমর্থকের অবস্থা আশঙ্কাজনক এবং তিনি তাকে দেখতে হাসপাতালে যাচ্ছেন।

সিজেপি ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের পাশাপাশি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় কঠোর জবাবদিহিতার দাবি জানাচ্ছে। ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (NEET)-এর প্রশ্ন ফাঁসের পর তারা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে তাদের মূল দাবি বানায়।

৩ মে অনুষ্ঠিত এই মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রায় ২২.৮ লাখ পরীক্ষার্থী অংশ নেন। কিন্তু প্রশ্ন ফাঁসের খবরের পর পরীক্ষাটি বাতিল করা হয় এবং কয়েক সপ্তাহ পর পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হয়।
এই কেলেঙ্কারিতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এ পর্যন্ত ২০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন বলে তাদের পরিবার জানিয়েছে।

আরও পড়ুন

প্রতিবাদকারীদের দাবি, প্রধানের এই ফাঁসের নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে পদত্যাগ করা উচিত। তিনি এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে সিজেপি ও তাদের সমর্থকদের "বিশৃঙ্খলা সৃষ্টকারী উপাদানের বি-টিম" বলে আখ্যায়িত করেছেন।
তবে সোমবারের বিশাল জনসমাগম, সহিংসতা এবং সিজেপির অবস্থান না ছাড়ার অনড় মনোভাব এই আন্দোলনকে দীর্ঘ সময় আলোচনার কেন্দ্রে রাখবে বলেই মনে হচ্ছে।

আরটিভি/এসএস

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission