ক্যামেরুনের দোয়ালা শহরের কুখ্যাত নিউ বেল কারাগার শুধু অপরাধ আর বন্দিজীবনের জন্যই পরিচিত নয়, বরং বন্দিদের সৃজনশীলতা ও পুনর্বাসনের এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগের কারণেও বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছে। কারাগারের ভেতরে গড়ে ওঠা ‘জেল টাইম রেকর্ডস’ নামের একটি সংগীত স্টুডিও ও রেকর্ড লেবেল বন্দিদের সংগীতচর্চার সুযোগ করে দিয়ে তাদের নতুন পরিচয় তৈরি করছে।
কারাগারটি অনেকটা একটি শহরের ভেতরে আরেকটি শহরের মতো। এখানে বন্দিদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান, নিরাপত্তা রক্ষায় সহায়তা এবং নিজস্ব বাজার পরিচালনার মতো ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা রয়েছে। এসবের মধ্যেই সংগীতকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বন্দিদের একটি সৃজনশীল কমিউনিটি।
এই উদ্যোগের শিল্পীদের একজন এমপেরর। কারাগারের ভেতরে নির্মিত তার একটি মিউজিক ভিডিও ইউটিউবে ২৪ হাজারের বেশি দর্শক পেয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাষ্ট্র ও আর্জেন্টিনাসহ বিভিন্ন দেশের শ্রোতার কাছেও পৌঁছেছে এই লেবেলের গান। চলতি বছরের শুরুতে নিউ বেল কারাগারের ভেতরে বন্দিদের জন্য একটি বড় কনসার্টও আয়োজন করা হয়।

জেল টাইম রেকর্ডসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক বন্দি স্টিভ হাপ্পি বলেন, সংগীত তাদের জন্য প্রতিরোধ, বন্ধুত্ব ও স্বাধীনতার অনুভূতির প্রতীক। তার ভাষায়, গান করার সময় বন্দিরা কারাগারের দেয়াল ভুলে গিয়ে মুক্তির স্বাদ অনুভব করেন।
সাধারণ একটি রেকর্ডিং বুথ ও একটি কম্পিউটার নিয়েই পরিচালিত হচ্ছে স্টুডিওটি। তবে এটিই বন্দিদের আত্মপ্রকাশ, সৃজনশীলতা ও মানসিক পুনর্গঠনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। এই উদ্যোগকে ঘিরে নির্মিত ‘জেল টাইম রেকর্ডস’ প্রামাণ্যচিত্র সম্প্রতি নিউইয়র্কের ট্রাইবেকা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সেরা প্রামাণ্যচিত্রসহ তিনটি পুরস্কার জিতেছে।
প্রামাণ্যচিত্রে স্টোন নামের এক বন্দির জীবনও উঠে এসেছে। ডাকাতি ও অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগে ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত এই সাবেক সেনাসদস্য নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। চলচ্চিত্রে তাকে মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যর্থ চেষ্টার পাশাপাশি নিজের অনুভূতি নিয়ে র্যাপ পরিবেশন করতে দেখা যায়।
২০১৮ সালে ইতালীয় শিল্পী ডিওনে রোচ নিউ বেল কারাগারে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করার সময় বন্দিদের সংগীত প্রতিভা দেখে একটি স্টুডিও স্থাপনের উদ্যোগ নেন। পরে স্টিভ হাপ্পিকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলেন জেল টাইম রেকর্ডস। ২০২২ সালে প্রকাশিত তাদের প্রথম অ্যালবাম ‘জেল টাইম ভলিউম-১’-এর আয়ের অর্ধেক শিল্পীদের দেওয়া হয় এবং বাকি অর্থ প্রকল্পের উন্নয়নে ব্যয় করা হয়।
তবে নিউ বেল কারাগারের বাস্তবতা এখনও কঠিন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ধারণক্ষমতার প্রায় চার গুণ বন্দি সেখানে অবস্থান করছেন। অতিরিক্ত ভিড়, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং সহিংসতা কারাগারটির দীর্ঘদিনের সমস্যা।
সমালোচনার মুখে প্রকল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, তাদের লক্ষ্য অপরাধীদের নায়ক বানানো নয়; বরং সংগীতের মাধ্যমে বন্দিদের পুনর্বাসন ও সমাজে ফিরতে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা। কারা কর্তৃপক্ষও এই উদ্যোগকে সমর্থন করছে।

সরকারি সহযোগিতায় এখন নারী বন্দিরাও এই প্রকল্পে যুক্ত হয়েছেন। একই সঙ্গে ক্যামেরুনের বাইরে বুরকিনা ফাসোর উয়াগাদুগুর কেন্দ্রীয় কারাগারেও একই ধরনের একটি সংগীত স্টুডিও স্থাপন করা হয়েছে।
স্টিভ হাপ্পির বিশ্বাস, সংগীত বন্দিদের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালাতে পারে। তার ভাষায়, আগে তারা নিজেদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করতেন, আর এখন তারা বিশ্বাস করেন সমাজে তাদেরও একটি সম্মানজনক জায়গা রয়েছে।
আরটিভি/এসকে




