
‘ছেলে যদি অপরাধী হয়, বিচার হোক। আর যদি নির্দোষ হয়, তাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন।’ মৌলভীবাজারের বড়লেখার দোহালিয়া গ্রামের বৃদ্ধা ফাতেমা বেগমের কণ্ঠে এখন শুধু এই আকুতি। রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যার পর সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার হওয়া তার ছেলে হুমায়ুন কবীর ওরফে এনামুলের অপেক্ষায় কেটে গেছে প্রায় ১৪ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে মামলা এগোয়নি কাঙ্ক্ষিত গতিতে; কিন্তু কারাগারে থাকা এনামুলের জীবন থেমে গেছে।
পরিবারের দাবি, এত বছর পরও সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে এনামুলের সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং সম্প্রতি পুলিশের অপরাধ তদন্ত সংস্থার (পিবিআই) ঢাকা মেট্রো উত্তর ইউনিটের তদন্ত প্রতিবেদনে তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার আচরণ অসংলগ্ন ছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবার। তাহলে প্রশ্ন উঠছে, সন্দেহের ভিত্তিতে একজন মানুষকে আর কতদিন কারাগারে থাকতে হবে?
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় খুন হন সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি। দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যক্তি সন্দেহের আওতায় আসেন। তাদের বাসার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এনামুলের নামও আসে তদন্তে। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সেই গ্রেপ্তারের পর দেখতে দেখতে কেটে যায় এক যুগেরও বেশি সময়। পরিবারের আশা ছিল, তদন্ত শেষ হবে, সত্য বেরিয়ে আসবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিচার হবে; আর নির্দোষ হলে এনামুল মুক্তি পাবেন। কিন্তু বছর পেরিয়ে দশক, দশক পেরিয়ে আরও কয়েক বছর—এনামুলের ভাগ্যে ফেরেনি মুক্তির আলো।
কারাগারেই হারিয়ে গেল তারুণ্য
মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ ইউনিয়নের পশ্চিম দোহালিয়া গ্রামের মাদ্রাসাপড়ুয়া তরুণ এনামুলের জীবন এখন পরিবারের কাছে এক দীর্ঘ অন্ধকার অধ্যায়। যে বয়সে সংসার, কর্মজীবন ও স্বাভাবিক জীবনের স্বপ্ন দেখার কথা, সেই বয়সের বড় একটি অংশ কেটেছে কারাগারে।
পরিবারের ভাষ্য, দীর্ঘ কারাবাসে এনামুলের মানসিক অবস্থার ব্যাপক অবনতি হয়েছে। এখন তিনি স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারেন না, আচরণেও অসংলগ্নতা দেখা যায়।
এনামুলের মা ফাতেমা বেগম বলেন, আমার ছেলে দোষী হলে তার বিচার হোক, আমরা কখনো বিচার চাইনি এমন নয়। কিন্তু এত বছরেও যদি তার বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ না পাওয়া যায়, তাহলে শুধু সন্দেহের কারণে আর কতদিন তাকে জেলে রাখা হবে? আমার ছেলে এখন অসুস্থ। তাকে মুক্তি দিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক।
ছেলেকে খুঁজতে গিয়ে বাবারও করুণ পরিণতি
এনামুলের কারাবাসের পাশাপাশি তার পরিবারেও নেমে আসে আরেক দুঃসহ অধ্যায়। পরিবারের অভিযোগ, সাগর-রুনি হত্যার প্রায় সাড়ে সাত মাস পর, ২০১২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর, এনামুলের বাবা মকবুল আলী ওরফে কালা মিয়াকে র্যাব পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরিবারের দাবি, এরপর ২১ দিন তার কোনো সন্ধান ছিল না। পরে ভৈরবের একটি সড়কের পাশে তাকে অসুস্থ অবস্থায় পাওয়া যায়। পরিবারের অভিযোগ, অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে তাকে নির্যাতন এবং বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত বা বিচারিকভাবে প্রমাণিত হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট নয়।
এনামুলের পরিবারের ভাষ্য, ওই ঘটনার পর মকবুল আলী আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। একের পর এক শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হন তিনি। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে পরিবারের জায়গাজমি ও পুরোনো বাড়ি বিক্রি করতে হয়। প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা চিকিৎসায় ব্যয় করার পরও শেষ পর্যন্ত চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি মারা যান তিনি।
স্ত্রী ফাতেমা বেগমের ভাষায়, ওই ঘটনার পর আমার স্বামী আর আগের মতো ছিলেন না। চিকিৎসা করাতে গিয়ে যা ছিল সব শেষ করেছি। ছেলের জন্যও কিছু করতে পারিনি। ভয় ছিল, আমাদেরও বিপদ হতে পারে।
এনামুলের বড় ভাই শাহিন আহমদ বলেন, বাবাকে তুলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। এরপর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং চিকিৎসা করাতে গিয়ে আমাদের সবকিছু শেষ হয়ে যায়। এখন আমার ভাইও কারাগারে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে। যদি সে নির্দোষ হয়, তাহলে তাকে মুক্তি দেওয়া হোক। অন্তত তার চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হোক।
পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের ভাষ্য, আগের সময়ে ভয় ও আতঙ্কের কারণে তারা এনামুলের বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে পারেননি। আর্থিক সংকটের কারণে দীর্ঘমেয়াদি আইনি লড়াইও চালানো সম্ভব হয়নি।
১১২ বার পিছিয়েছে তদন্ত প্রতিবেদন
সাগর-রুনি হত্যা মামলা দেশের বহুল আলোচিত মামলাগুলোর একটি। হত্যাকাণ্ডের পর তদন্তের দায়িত্ব একাধিক সংস্থার হাতে গেলেও দীর্ঘ সময়েও রহস্যের জট খোলেনি। এ মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ১১২ বার পিছিয়েছে।
একদিকে সাগর-রুনি হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের অপেক্ষা, অন্যদিকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার হওয়া এনামুলের জীবনের প্রায় ১৪ বছর হারিয়ে যাওয়া—দুটি বিষয়ই এখন একই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
দোহালিয়ার ছোট্ট বাড়িটিতে তাই এখনো পথ চেয়ে বসে আছেন ফাতেমা বেগম। তার চোখে ছেলের ফেরার অপেক্ষা। কিন্তু সেই অপেক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও বড় প্রশ্ন—সাগর-রুনি হত্যার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটিত হবে কবে, আর সন্দেহের কারাগারে হারিয়ে যাওয়া এনামুলের জীবনের ১৪ বছরের দায় নেবে কে?
আরটিভি/টিআর


