ওষুধ ও চিকিৎসার জন্য গাজা ছাড়ার ওপর ইসরায়েলি কড়া বিধিনিষেধে জীবন রক্ষাকারী সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হাজার হাজার ফিলিস্তিনি ক্যানসার রোগী। দক্ষিণ গাজার একটি আশ্রয়কেন্দ্রের ভবনের সিঁড়ির নিচে বসে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ে ধীরে ধীরে হেরে যাচ্ছেন ৩৩ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিকা খুলুদ আবু সাহমুদ।
১৫টি কেমোথেরাপি সেশন নেওয়ার পর দুই সন্তানের এই জননীকে জানিয়ে দেওয়া হয়, গাজায় বর্তমানে যেসব ওষুধ রয়েছে, তা তার ক্যানসারের ধরনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে আবু সাহমুদের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটছে।
মিডল ইস্ট আইকে আবু সাহমুদ বলেন, ‘চিকিৎসক জানিয়েছেন এই কেমোথেরাপি আমার শরীরে কোনো কাজ করছে না। এতে ক্যানসার নিরাময় তো হচ্ছেই না, উল্টো আমার চুল ও নখ ঝরে পড়ছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য আমাকে জর্ডান বা তুরস্কে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও নয় মাস ধরে আমি অনুমতির অপেক্ষায় প্রহর গুনছি। আমি প্রতিদিন আরও দুর্বল হয়ে পড়ছি, আর ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’
২০২৫ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির পরও গাজায় জীবন রক্ষাকারী জরুরি ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রবেশের ওপর ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে গাজায় ৪৬ শতাংশ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ ও ৬৬ শতাংশ চিকিৎসা সরঞ্জাম পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে।
ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ক্যানসারের বিশেষ ওষুধের চরম সংকটে স্তন, গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ও সারকোমাসহ বিভিন্ন জটিল ক্যানসারের কেমোথেরাপি সেবা স্থগিত রয়েছে। গাজার প্রায় ১১ হাজার ক্যানসার রোগীর মধ্যে অন্তত ৪ হাজার জনকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার রেফারেল দেওয়া হলেও ইসরায়েলের সবুজ সংকেতের অভাবে তারা গাজা ছাড়তে পারছেন না।
গাজা সেন্টার ফর ক্যানসারের পরিচালক ড. মোহাম্মদ আবু নাদা জানান, পর্যাপ্ত ওষুধের অভাবে বাধ্য হয়ে তারা মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পর্যন্ত ব্যবহার করেছেন, যা এখন শতভাগ ফুরিয়ে গেছে। এর ফলে রোগীদের মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গাজার প্রায় চার হাজার শিশুসহ ২০ হাজারের বেশি মানুষ জরুরি চিকিৎসাজনিত স্থানান্তরের অপেক্ষায় রয়েছেন। তবে সীমান্ত ক্রসিংগুলোতে কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে প্রতিদিন হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন গাজা ছাড়ার সুযোগ পাচ্ছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত শুধু চিকিৎসার অনুমতির অপেক্ষায় থাকা অবস্থাতেই ১ হাজার ৫৭০ জনের বেশি রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
পিএইচডি ডিগ্রিধারী সহকারী অধ্যাপক আবু সাহমুদ আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমি শিখতে এবং পড়াতে ভালোবাসতাম। কিন্তু এই অসুস্থতা ও অন্তহীন অপেক্ষা আমার জীবনের সব স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে। গাজায় এখন সুস্থ মানুষের টিকে থাকাই কঠিন, সেখানে ক্যানসার রোগীদের জন্য টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব।’
আরটিভি/এআর




