
ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হতে চলেছে। ৩০ বছর মেয়াদি এই ঐতিহাসিক চুক্তির মেয়াদ সমাপ্তির দোরগোড়ায় এসে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নতুন সমীকরণ গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। ফারাক্কার পানির হিসাব নিয়ে সম্প্রতি ভারতের বিহার রাজ্য সরকারের নতুন দাবি এবং নয়াদিল্লির ইতিবাচক আশ্বাস চুক্তিটি পুনর্নবীকরণের পথকে বেশ জটিল করে তুলেছে।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে বসেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী, উপমুখ্যমন্ত্রী বিজয় কুমার চৌধুরী এবং জেডি(ইউ) সংসদ সদস্য সঞ্জয় কুমার ঝা। সেখানে বিহারের শীর্ষ নেতারা অভিযোগ তোলেন, ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গার সিংহভাগ পানি বিহারের অববাহিকা থেকে গেলেও গত তিন দশক ধরে সেচ, পানীয় জল ও শিল্পের ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত রয়েছে রাজ্যটি।
বৈঠকের পর বিহারের পানিসম্পদমন্ত্রী জানান, কেন্দ্র সরকার চুক্তি নবায়নের সময় বিহারের এসব অভিযোগ ও উদ্বেগ বিবেচনা করার স্পষ্ট আশ্বাস দিয়েছে।
গঙ্গা চুক্তি নবায়নের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করছেন বিহারের ক্ষমতাসীন জেডি(ইউ) নেতা সঞ্জয় ঝা। তার দাবি, ১৯৯৬ সালে চুক্তি সইয়ের সময় তৎকালী সরকারের উদাসীনতায় বিহারের স্বার্থ চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশকে পানি দিতে গিয়ে বিহারের অভ্যন্তরীণ নদীগুলো থেকে অতিরিক্ত পানি টেনে নেওয়া হচ্ছে, যা রাজ্যে খাদ্য ও খাবার পানির সংকট তৈরি করছে। একই সঙ্গে ফারাক্কা ব্যারাজের ফলে উজান এলাকায় পলি জমে বন্যা পরিস্থিতি তীব্র হওয়ার বিষয়টিও সামনে আনেন তিনি। আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ বর্ধিত জনসংখ্যার চাহিদা মাথায় রেখে আন্তর্জাতিক এই চুক্তির শর্ত ও পানির বণ্টন সূত্র পরিবর্তনের দাবি তুলেছে তারা।
বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন ৫৪টি নদীর মধ্যে একমাত্র গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন নিয়েই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বিদ্যমান। তিস্তা চুক্তি পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে দীর্ঘদিন ধরে আটকে রয়েছে। এখন আবার গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে বিহার রাজ্য সরকারের এই অনড় অবস্থান ঢাকা-নয়াদিল্লি কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে বাড়তি মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করল। বিহারের দাবির মুখে নতুন চুক্তিতে বাংলাদেশের প্রাপ্য পানির পরিমাণে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কি না, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং ঢাকার নীতিনির্ধারকেরা উদ্ভূত পরিস্থিতি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন।
কী আছে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তিতে
১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি সই হয়। এর মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩০ বছর। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিবছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ফারাক্কায় গঙ্গার পানি দুই দেশের মধ্যে ভাগ করা হয়।
চুক্তির প্রথম সংযোজনী অনুযায়ী, ফারাক্কায় পানির প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে ভারত ও বাংলাদেশ সমান ভাগে পানি পায়। প্রবাহ ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেকের মধ্যে থাকলে বাংলাদেশ পায় ৩৫ হাজার কিউসেক এবং অবশিষ্ট পানি পায় ভারত।
আর প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেক বা তার বেশি হলে ভারত ৪০ হাজার কিউসেক পানি পায় এবং অবশিষ্ট পানি বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ থাকে।
এ ছাড়া মার্চের মাঝামাঝি থেকে মে মাসের প্রথম ভাগ পর্যন্ত পালাক্রমে দুই দেশকে ৩৫ হাজার কিউসেক করে পানি দেওয়ার নিশ্চয়তা রয়েছে।
আরটিভি/এআর




