
ইসরায়েলের আসন্ন সাধারণ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক লড়াই ছড়িয়ে পড়েছে অনলাইন দুনিয়ায়। ভোটের আগে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস দিচ্ছে জনমত জরিপ। ভোটারদের প্রভাবিত করতে দুই পক্ষই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভিডিও, ভুয়া প্রচারচিত্র (ডিপফেক) ও স্বয়ংক্রিয় অ্যাকাউন্ট (বট) ব্যবহার করছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
মঙ্গলবারের (২৭ অক্টোবর) নির্বাচন সামনে রেখে দুই শিবিরের প্রচারে প্রতিপক্ষ ক্ষমতায় এলে ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ ভয়াবহ হবে—এমন বার্তা তুলে ধরা হচ্ছে। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ও সম্পাদিত ভিডিওতে নেতানিয়াহুর অতীতের ব্যর্থতা তুলে ধরা হচ্ছে। অন্যদিকে বিরোধী নেতাদের আরব দলগুলোর প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চলছে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) ইসরায়েলের উদারপন্থী দৈনিক হারেৎজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান সরকারকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে তৈরি কয়েক ডজন স্বয়ংক্রিয় অনলাইন অ্যাকাউন্টকে নেতানিয়াহু ও তার দল লিকুদের পক্ষে প্রচার চালাতে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব অ্যাকাউন্টে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোট ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সতর্কবার্তাও ছড়ানো হচ্ছে।
নেতানিয়াহু ও তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভিডিও ছড়াচ্ছেন। কিছু ভিডিওতে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে হামলার আগে নেতানিয়াহুর ভূমিকা ও ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অন্য কিছু ভিডিওতে বিরোধী নেতাদের আরব দলগুলোর ঘনিষ্ঠ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। নির্বাচনে এসব দল প্রধান ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আরব-অধ্যুষিত যৌথ তালিকা জোটের হিব্রু ভাষার প্রচার বিভাগের পরিচালক মরিসিও লাপচিক বলেন, তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর, বিশেষ করে লিকুদের, অর্থ ও প্রযুক্তিগত সামর্থ্য অনেক বেশি। প্রযুক্তির ব্যবহার নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় বৈষম্য আরও বাড়াচ্ছে। তবে তাদের কাছে প্রচারের মূল বার্তাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ভোটারদের নজরদারিতে নতুন প্রযুক্তি
নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে ভোটারদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে আনতে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ছে।
লিকুদ আগে ‘ইলেক্টর’ নামের একটি অ্যাপ ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছিল। অ্যাপটি ভোটের দিন ভোটারদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পারে। তবে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি এর ব্যবহারে বিধিনিষেধ দেয়।
এর পরিবর্তে লিকুদ ‘ভিক্টরি ২’ নামের নতুন একটি অ্যাপ ব্যবহার করবে বলে হারেৎজ জানিয়েছে। এই অ্যাপে ভোটারদের পরিচয় সরাসরি দেখা যায় না। তবে কোন এলাকায় ভোটার উপস্থিতি কম, তা শনাক্ত করে সেখানে প্রচারকর্মীদের পাঠানো সম্ভব হবে। তারা ভোট দেওয়া ব্যক্তিদের নাম হাতে লিখে রাখতে পারবেন এবং যারা ভোট দেননি, তাদের ভোট দিতে উৎসাহিত করতে পারবেন।
অ্যালগরিদম, গণনাযোগ্যতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণারত সেবাস্তিয়ান বেন ড্যানিয়েল বলেন, ইলেক্টরের মতো কর্মসূচি ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর বর্তমান প্রযুক্তিগত সক্ষমতার তুলনায় খুবই সাধারণ। তার মতে, এ ধরনের প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য ইসরায়েল একটি বিশেষ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিক। তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আগে থেকেই নজরদারির আওতায় থাকায় নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে গোপনীয়তার উদ্বেগ রয়েছে।
কৃত্রিম ভিডিও ঘিরে বিতর্ক
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি একটি ভিডিও প্রকাশ করে বিতর্কের জন্ম দেন। ভিডিওতে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি, একজন বিচারপতি ও অ্যাটর্নি জেনারেলকে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ থেকে সহিংসভাবে টেনে নিয়ে যেতে দেখা যায়। সরকারের বিচারিক নজরদারি কমানোর প্রচেষ্টার বিরোধিতা করায় তারা প্রায়ই কট্টর ডানপন্থীদের সমালোচনার লক্ষ্য হন।
এর আগে নেতানিয়াহুর শেয়ার করা আরেকটি কৃত্রিম ভিডিওতে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আইজেনকোটকে এমন এক ব্যক্তির দিকে দৌড়ে যেতে দেখা যায়, যাকে অনেকে তার নিহত ছেলে গালের মতো মনে করেন। গাল গাজায় যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সময় নিহত হন। ভিডিওতে আইজেনকোট ওই ব্যক্তিকে পাশ কাটিয়ে আরব দল রা’আমের নেতা মানসুর আব্বাসকে আলিঙ্গন করেন। পরে নেতানিয়াহুর শিবির জানায়, ভিডিওর চরিত্রটি আইজেনকোটের ছেলেকে বোঝানোর উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়নি। এরপর পুরুষ চরিত্রটির জায়গায় নারী চরিত্র বসানো হয়।
কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের শেয়ার করা আরেকটি ভিডিওতে গাজার মানুষকে গাধারূপে দেখানো হয় এবং তাদের প্যারিসের দিকে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য তুলে ধরা হয়। বেন-গভির গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের ‘স্বেচ্ছায় অন্যত্র চলে যাওয়া’র নামে সরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছেন।
বাড়ছে রাজনৈতিক বিভাজন
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু ও বেন-গভিরের প্রচারে স্বয়ংক্রিয় অনলাইন অ্যাকাউন্টের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য। এসব প্রচারের মাধ্যমে সমর্থকদের আরও সংগঠিত করা এবং প্রতিপক্ষের সমর্থকদের প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে।
এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ভোটার আচরণবিষয়ক বিশেষজ্ঞ রোই জুর বলেন, অনলাইন প্রচারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অ্যালগরিদম ও তথ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবহার করে রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর করা হচ্ছে। এতে বিরোধী শিবিরের প্রতি মানুষের বিরূপ মনোভাব বাড়তে পারে।
তার মতে, ছোট দলগুলোর সাফল্য ও ভোটার উপস্থিতির ওপর নির্বাচনের ফল নির্ভর করতে পারে। তাই সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে আনাও প্রচারের বড় লক্ষ্য।
জুর বলেন, তেল আবিব ও হাইফার মতো বড় ধর্মনিরপেক্ষ শহরে সাধারণত ভোটার উপস্থিতি প্রায় ৬০ শতাংশ। অন্যদিকে জেরুজালেম ও বনি ব্রাকের মতো অতি-ধর্মীয় ইহুদি জনগোষ্ঠীর বসবাস বেশি—এমন এলাকায় উপস্থিতি প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ। ফলে ভোটারদের প্রতিপক্ষের সম্ভাব্য বিপদের কথা তুলে ধরে ভোট দিতে উৎসাহিত করাও প্রচারের অংশ হয়ে উঠেছে।
নির্বাচনের আগে প্রযুক্তিনির্ভর প্রচার, ভুয়া ভিডিও ও ভোটারদের তথ্য ব্যবহারের এই প্রতিযোগিতা ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
সূত্র: আল জাজিরা
আরটিভি/জেএমএ



