
প্রকৃতিতে একই অণুর দুটি দর্পণ-প্রতিবিম্ব রূপ থাকতে পারে। দেখতে প্রায় একই হলেও একটিকে আরেকটির ওপর পুরোপুরি মেলানো যায় না। রসায়নে এই বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় কাইরালিটি। আর জীবনের মৌলিক অণুগুলোর মধ্যে প্রায় সবসময় একটি নির্দিষ্ট রূপ ব্যবহারের ঘটনাকে বলা হয় হোমোকাইরালিটি।
কেন জীবনের ক্ষেত্রে অণুর একটি ‘হাত’ বেছে নেওয়া হয়েছে বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীদের কাছে এটি ছিল বড় এক রহস্য। এবার সেই রহস্যের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশের সমাধান দিয়েছেন দুই বিজ্ঞানী হেনরি বি. কাগান ও কেনসো সোয়াই।
তাদের গবেষণায় দেখানো হয়েছে, রাসায়নিক বিক্রিয়াকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, যাতে একই অণুর দুই দর্পণ-প্রতিবিম্বের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত একটি রূপই প্রধানত, এমনকি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রায় সম্পূর্ণভাবে তৈরি হয়।
বিষয়টি বোঝা যায় মানুষের দুই হাতের উদাহরণে। ডান ও বাঁ হাত দেখতে প্রায় একই হলেও একটিকে অন্যটির ওপর বসিয়ে পুরোপুরি মেলানো যায় না। কিছু অণুর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। এই দুই ভিন্ন রূপকে বলা হয় এনানশিওমার।
অ্যামিনো অ্যাসিডের মতো জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অনেক অণু এমন দুই রূপে থাকতে পারে। কিন্তু পৃথিবীর জীবিত প্রাণীরা সাধারণত এর একটি নির্দিষ্ট রূপই ব্যবহার করে। এই বৈশিষ্ট্যই হোমোকাইরালিটি নামে পরিচিত।
সাধারণ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় আবার প্রায়ই দুই ধরনের রূপ সমান অনুপাতে তৈরি হয়। ফলে প্রশ্ন ছিল—প্রকৃতি কীভাবে একটি রূপকে বেছে নিল?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পথ তৈরি করেন হেনরি বি. কাগান। ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে তিনি বিভিন্ন ধরনের অনুঘটক ব্যবহার করে রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি নিয়ে কাজ করেন। এর মাধ্যমে দুই মিরর-ইমেজ অণুর মধ্যে একটি রূপ বেশি পরিমাণে তৈরি করা সম্ভব হয়।
পরে সেই ধারণাকে আরও এগিয়ে নেন জাপানি বিজ্ঞানী কেনসো সোয়াই। ১৯৯৫ সালে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকাশ করেন। এরপর ২০০৩ সালে তিনি এমন একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে সফল হন, যেখানে সম্ভাব্য দুই কাইরাল রূপের মধ্যে কেবল একটি রূপ তৈরি করা সম্ভব হয়।
এই গবেষণাই পরবর্তীতে ‘সোয়াই রিঅ্যাকশন’ নামে পরিচিত হয়।
এই গবেষণার সবচেয়ে বড় প্রয়োগ ওষুধ তৈরিতে। একই রাসায়নিক সূত্রের দুই মিরর-ইমেজ মানবদেহে একেবারেই ভিন্ন আচরণ করতে পারে। একটি কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা-প্রভাব তৈরি করলেও অন্যটি অকার্যকর কিংবা ক্ষতিকর হতে পারে।
এর ভয়াবহ উদাহরণ থ্যালিডোমাইড। ১৯৫০-এর দশকে গর্ভবতী নারীদের মর্নিং সিকনেসের চিকিৎসায় এটি ব্যবহার করা হয়েছিল। পরে দেখা যায়, অণুটির একটি নির্দিষ্ট মিরর-ইমেজ গুরুতর জন্মগত ত্রুটির সঙ্গে সম্পর্কিত।
ফলে ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে শুধু সঠিক রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করাই নয়, তার সঠিক কাইরাল রূপ নিয়ন্ত্রণ করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ওষুধের পাশাপাশি সুগন্ধি ও বিভিন্ন রাসায়নিক পণ্য তৈরিতেও এই প্রযুক্তির গুরুত্ব রয়েছে।
অণুর এই ‘ডান-বাঁ’ বৈশিষ্ট্যের রহস্যের সূত্র পাওয়া যায় উনিশ শতকের বিজ্ঞানী লুই পাস্তুরের গবেষণায়। টারটারিক অ্যাসিড নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি দেখতে পান, এর দুটি ভিন্ন রূপ রয়েছে এবং ব্যাকটেরিয়া এর একটি রূপকে গাঁজন করতে পারে, অন্যটিকে নয়।
সেই পর্যবেক্ষণ থেকেই বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, একই ধরনের রাসায়নিক অণুর দুই দর্পণ-প্রতিবিম্বের আচরণ ভিন্ন হতে পারে।
কিন্তু কাঙ্ক্ষিত রূপটি নিয়ন্ত্রিতভাবে তৈরি করা সম্ভব কি না এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে লেগেছে এক শতাব্দীরও বেশি সময়।
কাগান ও সোয়াইয়ের গবেষণার গুরুত্ব এখানেই। প্রকৃতিতে জীবনের মৌলিক অণুগুলো কীভাবে একটি নির্দিষ্ট ‘হাত’ বেছে নিয়েছে, বিজ্ঞানীরা তার একটি রাসায়নিক অনুকরণ গবেষণাগারে তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে জীবনের সূচনার কোনো এক পর্যায়ে এই ধরনের কাইরাল নির্বাচনের ঘটনা ঘটেছিল। তবে ঠিক কীভাবে জীবনের একটি নির্দিষ্ট ‘হাত’ প্রতিষ্ঠিত হলো, সেই রহস্য এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি।
তবে কাগান ও সোয়াইয়ের গবেষণা সেই দীর্ঘ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে বড় একটি অগ্রগতি এনে দিয়েছে।
তাদের কাজের স্বীকৃতিতেই ২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এই গবেষণা শুধু একটি রাসায়নিক বিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণের নতুন পদ্ধতি দেখায়নি; বরং জীবনের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য—অণুর ‘ডান’ ও ‘বাঁ’-এর রহস্য বোঝার পথও আরও প্রশস্ত করেছে।
আরটিভি/এসকে




