
স্ত্রীকে হত্যার দায়ে সাবেক ‘আমেরিকান আইডল’ প্রতিযোগী ও সংগীত যাজক ক্যালেব ফ্লিনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত। তবে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে জানিয়েছেন, স্ত্রীকে তিনি হত্যা করেননি।
৪০ বছর বয়সী ক্যালেব ফ্লিনকে গত সপ্তাহে স্ত্রী অ্যাশলি ফ্লিনকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। সোমবার (৫ অক্টোবর) তাকে প্যারোলের সুযোগ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
অ্যাশলি ফ্লিন ছিলেন ৩৭ বছর বয়সী একজন স্কুলশিক্ষক ও ভলিবল প্রশিক্ষক। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ওহাইওর ডেটন এলাকার নিজ বাড়িতে গুলিতে নিহত হন তিনি। ঘটনার সময় ফ্লিন ও তাদের দুই মেয়ে বাড়িতেই ছিল।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, অ্যাশলি যখন বিছানায় ছিলেন এবং আত্মরক্ষার সুযোগ ছিল না, তখন ফ্লিন তাকে গুলি করেন। এরপর তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করতে বাড়িতে ডাকাত বা হামলাকারী ঢুকেছিল—এমন নাটক সাজান তিনি।
পুলিশকে ফোন করে ফ্লিন দাবি করেছিলেন, কেউ বাড়িতে ঢুকে গুলি চালিয়েছে। তিনি তদন্তকারীদের বলেছিলেন, ঘটনার সময় তিনি বসার ঘরের সোফায় ঘুমাচ্ছিলেন এবং গুলির শব্দে ঘুম ভাঙার পর বিষয়টি জানতে পারেন।
এমনকি হত্যার এক দিন আগে এক ব্যক্তি তাদের বাড়িতে এসে অ্যাশলির হাতে একটি মার্কিন পতাকা দিয়ে ‘আমেরিকা নিয়ে অদ্ভুত বিক্রির কথা’ বলেছিল বলেও দাবি করেছিলেন ফ্লিন।
তবে আদালতে ভিন্ন তথ্য দেন ফ্লিনের প্রেমিকা অ্যালেইঘা বটনার। তার দাবি, ফ্লিন তার স্ত্রীকে ঘৃণা করার কথা বলেছিলেন এবং তাকে হত্যার চিন্তাও করতেন।
প্রসিকিউটররা আদালতে ফ্লিন ও বটনারের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া এক লাখের বেশি বার্তার তথ্য উপস্থাপন করেন। একই সঙ্গে বটনারকে উদ্দেশ্য করে ফ্লিন তৈরি করেছিলেন বলে দাবি করা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি কিছু ভালোবাসার গানও জুরিদের শোনানো হয়।
মামলার শুনানিতে বিচারক জিনিন প্র্যাট বলেন, ফ্লিন সমাজের জন্য উচ্চ ঝুঁকি তৈরি করেন। সাজা ঘোষণার আগে তিনি বলেন, প্রতারণা, কারসাজি ও নিষ্ঠুরতার যে স্তর এই ঘটনায় দেখা গেছে, তা বোঝা কঠিন। ফ্লিন নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস ব্যবহার করে অন্যদের জীবন নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবিত করেছেন বলেও মন্তব্য করেন বিচারক।
সাজা ঘোষণার সময় ফ্লিন কাঁদতে কাঁদতে নিজের পরিবার ও অ্যাশলির পরিবারের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, তিনি তার স্ত্রীকে ভালোবাসতেন এবং শেষ পর্যন্ত নিজের নির্দোষ প্রমাণের জন্য লড়াই করে যাবেন।
ফ্লিন তার দুই মেয়েকেও ক্ষমা চান। তিনি বলেন, মেয়েরাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ।
তবে আদালতে উপস্থিত না থাকা দুই মেয়ের লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনানো হয়। তাদের বয়স ছিল ৯ ও ১১ বছর, যখন তাদের মা নিহত হন।
মেয়ে আলিসার চিঠিতে বাবার উদ্দেশে বলা হয়, সে তাকে গভীরভাবে ভালোবাসে। তবে বাবার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে সে জানায়, তিনি শুধু নিজেকেই ভালোবাসার মতো আচরণ করেছেন।
অন্য মেয়ে আভা লিখেছে, বাবার বিচারসংক্রান্ত ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বারবার দেখতে হচ্ছে। বাবাকে কষ্ট পেতে দেখে তার কষ্ট হলেও, মাকে হত্যা এবং পরকীয়ার সিদ্ধান্ত বাবাই নিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করে সে।
দুই মেয়েই তাদের বাবাকে মাকে হত্যার কথা স্বীকার করার আহ্বান জানায়। তাদের দাদা-দাদি, মামা ও খালাসহ পরিবারের সদস্যরা জানান, ধর্মীয় বিশ্বাসই তাদের এই শোক কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করছে।
অ্যাশলি ফ্লিনের বোন কায়লা কেইট আদালতে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, ফ্লিনের এমন ভয়াবহ সহিংসতায় পরিবারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার বিষয়টি জানার পর তারা এখনো সেই ধাক্কা ও হতাশা কাটিয়ে উঠতে পারেননি।
তিনি বলেন, আমরা আপনাকে বিশ্বাস করেছিলাম। আপনার ওপর আস্থা রেখেছিলাম। সত্যি বলতে, আপনার জন্য আমরা নিজেদের জীবনও দিয়ে দিতে প্রস্তুত ছিলাম।
মিয়ামি কাউন্টির প্রসিকিউটর পল ওয়াটকিনস আদালতে বলেন, ঘটনাটি ছিল ইচ্ছাকৃত সিদ্ধান্ত, যার ফলে একটি অপূরণীয় জীবন শেষ হয়েছে এবং পরিবারে স্থায়ী ধ্বংস নেমে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, ফ্লিন এখন পর্যন্ত নিজের দায় স্বীকার করেননি এবং যে জীবন তিনি শেষ করেছেন, তার জন্য প্রকৃত অনুশোচনাও প্রকাশ করেননি।
তবে সাজা ঘোষণার দিনও ফ্লিন নিজের নির্দোষ দাবি করে বলেন, তিনি স্ত্রীকে হত্যা করেননি এবং যতদিন সৃষ্টিকর্তা তাকে সুযোগ দেবেন, ততদিন নিজের নির্দোষ প্রমাণের জন্য লড়াই চালিয়ে যাবেন।
সূত্র: এনবিসি নিউজ
আরটিভি/জেএমএ


