
প্রায় ৯০ বছর আগে নিখোঁজ হওয়া মার্কিন বৈমানিক অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্টের বিমানের সন্ধানে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের একটি নির্জন দ্বীপে অভিযান চালিয়েও নিশ্চিত কোনো প্রমাণ পাননি গবেষকেরা। স্যাটেলাইটের ছবিতে দেখা রহস্যময় বস্তুটিকে বিমানের ধ্বংসাবশেষ বলে ধারণা করা হলেও, অনুসন্ধানে সেটি মূলত জমে থাকা গাছের টুকরা ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ বলে মনে করা হচ্ছে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) অভিযানের গবেষকেরা এ তথ্য জানান। যুক্তরাষ্ট্রের পারডু বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা চলতি মাসে কিরিবাতির ফিনিক্স দ্বীপপুঞ্জের জনমানবহীন প্রবালদ্বীপ নিকুমারোরোতে এ অভিযান চালান।
২০২০ সালে স্যাটেলাইটের ছবিতে দ্বীপটির একটি স্থানে অস্বাভাবিক আকৃতির বস্তু দেখা যায়। সেটি ইয়ারহার্টের নিখোঁজ বিমানের ধ্বংসাবশেষ হতে পারে বলে ধারণা করেছিলেন বিশেষজ্ঞেরা। সেই ধারণা যাচাই করতেই তারাইয়া অবজেক্ট নামের এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
তবে অভিযান শেষে গবেষকেরা জানান, স্যাটেলাইটের ছবিতে দেখা বস্তুটি ইয়ারহার্টের বিমানের ধ্বংসাবশেষ—এমন ধারণার পক্ষে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক রিক পেটিগ্রিউ বলেন, তাদের ধারণা, বস্তুটি মূলত বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষের সমষ্টি, যা ওই এলাকায় জমা হয়েছিল। গবেষকদের মতে, উপদ্বীপের বালুময় এলাকায় বড় বড় গাছের অংশ জমে এ অস্বাভাবিক আকৃতি তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
গবেষকেরা দ্বীপে পৌঁছানোর আগেই ধ্বংসাবশেষের বড় অংশ ভেঙে যায় এবং পানিতে ভেসে চলে যায়। সেখানে পড়ে থাকা অংশটি ছিল ইংরেজি ‘ওয়াই’ অক্ষরের মতো আকৃতির, যা স্যাটেলাইটের ছবিতে দেখা মূল বস্তুর তুলনায় অনেক ছোট।
বস্তুটির উপরিভাগ আলো প্রতিফলিত করত বলে আগে ধারণা করা হয়েছিল, এটি ধাতব কিছু হতে পারে। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, এর ওপর কার্বনসমৃদ্ধ পলির একটি স্তর রয়েছে। ফলে ধাতব বিমানের অংশ হওয়ার ধারণাটিও সমর্থন পায়নি।
১৯৩৭ সালের ২ জুলাই নিখোঁজ হন অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট ও তার নাবিক ও দিকনির্দেশক ফ্রেড নুনান। ইয়ারহার্ট তখন বিশ্বজুড়ে বিমান চালিয়ে ঘুরে আসা প্রথম নারী হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তাদের বিমানটির নাম ছিল লকহিড ইলেকট্রা ১০-ই।
যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলরক্ষী বাহিনীর একটি জাহাজ ওই দিন সকালে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে। তারা হাওল্যান্ড দ্বীপের দিকে যাচ্ছিলেন। দ্বীপটি নিকুমারোরো থেকে প্রায় ৪০০ মাইল উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত।
ইয়ারহার্ট ও নুনান সমুদ্রে বিধ্বস্ত হয়েছিলেন, নাকি নিকুমারোরোর প্রবালপ্রাচীরে অবতরণের পর সেখানে আটকা পড়েছিলেন—তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা তত্ত্ব রয়েছে। এবারের অভিযানে বিমানের ধ্বংসাবশেষের নিশ্চিত প্রমাণ না মিললেও গবেষকদের মতে, তারা দ্বীপটিতে অবতরণের পর আটকা পড়েছিলেন—এমন ধারণার পক্ষে অনুসন্ধানটি কিছুটা সমর্থন জোগায়।
অভিযানকারী দল জানিয়েছে, দ্বীপে ১৯৩০-এর দশকের কাচের বোতল ও নারীদের প্রসাধনসামগ্রীর একটি বাক্সসহ কয়েকটি পুরোনো বস্তু পাওয়া গেছে। এগুলো ইয়ারহার্ট ও নুনানের দ্বীপটিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এছাড়া সমুদ্র ও স্থলভাগে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান চালিয়ে প্রায় ৩০ ইঞ্চি লম্বা একটি ইস্পাতের নল পাওয়া গেছে। বস্তুটি আরও পরীক্ষা করে দেখা হবে।
পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান আইন কর্মকর্তা ও অভিযানের সদস্য স্টিভ শুলৎজ বলেন, ইয়ারহার্ট কখনো হাল ছাড়েননি; তিনি নতুন সীমা অতিক্রম করে অজানার পথে উড়ে গিয়েছিলেন। তার সেই সাহসই অনুসন্ধানকারীদের অনুপ্রাণিত করছে। বিমানের খোঁজে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
কিরিবাতির রাজধানী তারাওয়া থেকে গত ৬ অক্টোবর সমুদ্রপথে যাত্রা শুরু করে অভিযানকারী দল। পাঁচ দিন পর তারা নিকুমারোরো দ্বীপে পৌঁছায়। বিশ্বের অন্যতম রহস্যময় নিখোঁজের ঘটনার সমাধান না মিললেও, গবেষকেরা অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় জানিয়েছেন।
সূত্র: এনবিসি নিউজ
আরটিভি/জেএমএ


