
দেশে সরকারি চাকরির তীব্র প্রতিযোগিতা দিন দিন আরও জোরালো হচ্ছে। বেসরকারি খাতে চাকরির সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসায় চাকরিপ্রার্থীদের মূল নজর এখন সরকারি খাতের দিকেই।
এর প্রমাণ মিলল সমাজসেবা অধিদপ্তরের সবশেষ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে। মাত্র ১ হাজার ৪৮৫টি শূন্য পদের বিপরীতে আবেদন করেছেন ২১ লাখেরও বেশি প্রার্থী। এত বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর চাপ সামাল দিয়ে পরীক্ষা আয়োজন করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
শ্রমবাজারের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি সম্পর্কে অর্থনীতিবিদরা আগেই সতর্ক করেছিলেন। গত বছরের আগস্টে প্রকাশিত এক গবেষণায় কর্মসংস্থানের এই দশাকে ‘কর্মসংস্থান জরুরি অবস্থা’ হিসেবে চিহ্নিত করে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান মন্তব্য করেছিলেন, বাংলাদেশের বেকারত্ব পরিস্থিতি এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে।
এক বছর পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ) সম্প্রতি জানিয়েছে, বাংলাদেশে উচ্চমাধ্যমিকোত্তর বা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ডিগ্রিধারী তরুণদের প্রায় ৩৬ শতাংশই বেকার। এই বাস্তবতায় সরকারি খাতের সীমিত ও নিশ্চিত চাকরির জন্য চাকরিপ্রার্থীদের লড়াই যে কতটা তীব্র, তা সমাজসেবা অধিদপ্তরের এই আবেদনসংখ্যা থেকেই স্পষ্ট।
সমাজসেবা অধিদপ্তর গত মে মাসে ১৩ থেকে ২০তম গ্রেডের ৫২ ক্যাটাগরিতে ১ হাজার ৪৮৫টি স্থায়ী ও অস্থায়ী শূন্য পদের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। গত ২ থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করা হয়, যেখানে টেলিটকের মাধ্যমে ৫০ থেকে ১০০ টাকা ফি দিয়ে আবেদন করেন মোট ২১ লাখ ২৩ হাজার মানুষ।
হিসাব অনুযায়ী, প্রতি পদের বিপরীতে এবার আবেদন করেছেন ১ হাজার ৪৩০ জন প্রার্থী। দেশের শীর্ষ সরকারি নিয়োগ পরীক্ষা— বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস বা বিসিএস পরীক্ষার সঙ্গে তুলনা করলেও এই প্রতিযোগিতার অনুপাত নজিরবিহীনভাবে বেশি।
আবেদনের সময়সীমা শেষ হয়ে প্রায় তিন মাস হতে চললেও অতিরিক্ত প্রার্থীর কারণে এখনও পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ আবু ইউসুফ জানান, দ্রুততম সময়ে নিয়োগ সম্পন্ন করার উপায় প্রস্তাব করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।
প্রত্যাশিত পরিমাণের চেয়ে বহুগুণ বেশি আবেদন পড়ায় বড় ধরনের লজিস্টিক ও আর্থিক সংকটে পড়েছে অধিদপ্তর। কারণ, এর আগে এত বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর পরীক্ষা নেওয়ার কোনো অভিজ্ঞতা তাদের নেই। বিশাল সংখ্যক পরীক্ষাকেন্দ্রের ব্যবস্থা করা, প্রশ্নপত্র ছাপানো, পরিদর্শক নিয়োগ এবং উত্তরপত্র মূল্যায়ন—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে জটিল পরিস্থিতি। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ কীভাবে সম্পন্ন করা যায় এবং প্রার্থীদের কীভাবে বাছাই করা উচিত, সে বিষয়ে এখন জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তর।
এখনও পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করেনি কর্তৃপক্ষ
সমাজসেবা অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, এর আগে কোনো নিয়োগে এত বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা নেয়নি অধিদপ্তর।
প্রাথমিক বাছাইয়ের পর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় কতজনকে রাখা হবে— এ বিষয়ে এখন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করছে অধিদপ্তর। পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে তিন ধাপে: লিখিত, ব্যবহারিক (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) ও মৌখিক পরীক্ষা।
পরীক্ষা গ্রহণের ব্যয় ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন পেলেই পরীক্ষার কেন্দ্র ও তারিখ ঘোষণা করবে সমাজসেবা অধিদপ্তর।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব বলেন, আমরা আবেদন গ্রহণ করে পরীক্ষা নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছি, যেন স্বচ্ছতা ও দ্রুততম সময়ে নিয়োগ সম্পন্ন করতে পারি। বিপুলসংখ্যক আবেদন পাওয়ায় এখন করণীয় কী হতে পারে, সেই বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
বেসরকারি খাতের দুর্বলতার লক্ষণ
অর্থনীতিবিদ ও কর্মসংস্থান বিশ্লেষকদের মতে, বেসরকারি খাতের স্থবিরতার বিপরীতে সরকারি চাকরির প্রতি মানুষের ক্রমবর্ধমান আগ্রহেরই প্রতিফলন এই রেকর্ডসংখ্যক আবেদন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ যেখানে থমকে আছে, সেখানে প্রতিযোগিতামূলক বেতন, চাকরির নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা প্রার্থীদের সরকারি চাকরির দিকে ঝুঁকতে উৎসাহিত করছে। সরকারি চাকরিতে পদ কম হলেও চাকরিপ্রত্যাশীদের আগ্রহ বেশি, যা অর্থনীতির জন্য একটা ফলস সিগন্যাল দিচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, কর্পোরেট খাতের সম্প্রসারণ হলে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে এত বেশি চাপ পড়তে না। বর্তমানে বিনিয়োগ সংকুচিত হওয়া, বিশ্ববাজারের পণ্য বিক্রির অনিশ্চয়তার কারণে কর্পোরেট খাতের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না। এ কারণে বেসরকারি খাতে চাকরির প্রতি মানুষের আগ্রহ কম, আবার কর্পোরেট খাতও সরকারি চাকরির মতো উচ্চ বেতন দিতে পারছে না।
তিনি বলেন, যেসব পদে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর কার্যত প্রয়োজন আছে কি না, সেটাও সরকারের ভেবে দেখা উচিত। অনেক ক্ষেত্রে শূন্যপদ থাকার কারণেই উৎপাদনশীলতা কম হওয়া সত্ত্বেও সরকারের অনেক পদে লোকবল নিয়োগ দেওয়া হয়।
এক্ষেত্রে তিনি কর্পোরেট মানদণ্ডের মতো উৎপাদনশীলতা মূল্যায়নের পরামর্শ দেন।
নিয়োগ-সংক্রান্ত তথ্যেও বেসরকারি খাতের কর্মীদের চাহিদার এই নিম্নগতি স্পষ্ট। বিডিজবস ডটকমের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও একেএম ফাহিম মাশরুর ২০২৫ সালের জুনে জানিয়েছিলেন, প্ল্যাটফর্মটিতে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে চাকরির বিজ্ঞপ্তি ১০ শতাংশ কমেছে।
ফাহিম মাশরুর সম্প্রতি পর্যবেক্ষণ করেছেন, গত কয়েক বছর ধরেই এই প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিগত কয়েক বছর ধরেই দেখছি, বেসরকারি খাতের চাকরিতে আবেদন কমছে আর সরকারি চাকুরিতে আবেদনের পরিমাণ বাড়ছে।
এর কারণ হিসাবে তিনি মনে করেন, বেসরকারি চাকরিতে সুযোগ সুবিধা খুব বেশি বাড়ে না। এছাড়া সরকারি চাকরিতে নতুন করে পে-স্কেল হওয়ায় বেতন-ভাতার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
আরটিভি/এসএস


