
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে একটি গভীরভাবে প্রোথিত সংস্কৃতি রয়েছে যেখানে যেকোনো ঘটনার জন্য প্রথমেই নারীকেই দোষারোপ করা হয়। ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, বিবাহবিচ্ছেদ কিংবা কর্মজীবনের ব্যর্থতা—প্রায় সবক্ষেত্রেই সমাজের আঙুল আগে নারীর দিকে ওঠে। এর পেছনে রয়েছে পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা, যেখানে পুরুষকে পরিবার বা সমাজের রক্ষক হিসেবে দেখা হয় আর নারীর উপর চাপিয়ে দেওয়া হয় সম্মান রক্ষার দায়িত্ব। ফলে কোনো কিছু ভুল হলে বা সামাজিক নিয়ম ভঙ্গ হলে দায়ভার নারীকে বহন করতে হয়।
বাংলাদেশে আইন আছে যা নারীদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ ধর্ষণ, অ্যাসিড নিক্ষেপ, যৌতুক সংক্রান্ত সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করেছে। আবার ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স (প্রিভেনশন অ্যান্ড প্রোটেকশন) অ্যাক্ট, ২০১০ গার্হস্থ্য সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য আইনি প্রতিকার ও সুরক্ষার পথ খুলে দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব আইনের প্রয়োগ প্রায়ই দুর্বল হয়। মামলার তদন্তের সময় ভিক্টিমকে বারবার অপমানজনক প্রশ্ন করা হয়—সে কোথায় ছিল, কী পোশাক পরেছিল, কেন সে ওই স্থানে গিয়েছিল। এমনকি পুলিশ রিপোর্টেও ভিক্টিমের চরিত্র নিয়ে মন্তব্য থাকে, যা আইনের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে এবং নারীর প্রতি সামাজিক দোষারোপকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে ভিক্টিম-ব্লেমিং কমানোর জন্য আইনি কাঠামো অনেক বেশি ভিক্টিম-সেন্ট্রিক। Sexual Offences Act 2003-এ সম্মতির ধারণা স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে যাতে ভিক্টিমের পোশাক, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা অতীত জীবন আদালতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে আলোচনায় না আসে। সেখানে Rape Shield Laws ভিক্টিমের পূর্ববর্তী যৌন ইতিহাস আদালতে সীমিতভাবে ব্যবহারের সুযোগ দেয়। তাছাড়া Domestic Abuse Act 2021 গার্হস্থ্য সহিংসতাকে আলাদা অপরাধ হিসেবে স্পষ্ট করেছে এবং ভিক্টিম সাপোর্ট সার্ভিসকে আরও শক্তিশালী করেছে। আদালত ভিক্টিমকে বিশেষ সুবিধা দেয় যেমন আলাদা রুম থেকে ভিডিও লিঙ্কে সাক্ষ্য দেওয়ার সুযোগ, যা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে এই পার্থক্য থেকে বোঝা যায় যে শুধু কঠোর আইন থাকলেই হবে না, এর প্রয়োগ এবং সামাজিক মানসিকতা বদলানো সবচেয়ে জরুরি। বাংলাদেশের আইন শক্তিশালী হলেও তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় ভিক্টিম-ব্লেমিং রয়ে গেছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে বিচার প্রক্রিয়ায় ভিক্টিমকে সম্মানের সাথে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়।
এখন সময় এসেছে বাংলাদেশেও একই ধরনের সংস্কার আনার। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে জেন্ডার-সেনসিটিভিটি ট্রেনিং দেওয়া, তদন্তের সময় ভিক্টিমকে সম্মান দেওয়া, আদালতে ভিক্টিমের পূর্ববর্তী ব্যক্তিগত ইতিহাস সীমিত করার নিয়ম কঠোরভাবে মানা এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। নারীর প্রতি দোষারোপ নয়, অপরাধীর প্রতি জবাবদিহি—এটিই ন্যায়বিচারের আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
লেখক: সায়মা আনিকা
(বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্য আইনের তুলনামূলক বিশ্লেষণ)
আরটিভি/এসকে




