
জুলাই গণআন্দোলন চলাকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি ও হামলার ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছেন মামুন ফরাজি নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি জানিয়েছেন, পুলিশের গুলিতে আহত রাজুর পেট থেকে রক্তমাখা ভাত বের হচ্ছিল। পরে হাসপাতালে পাঠানো হলেও ১৯ জুলাই তার মৃত্যু হয়।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর একক বেঞ্চে বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর সামনে জবানবন্দি দেন মামুন। মোহাম্মদপুরে ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২৮ আসামির বিরুদ্ধে অষ্টম সাক্ষী হিসেবে তিনি সাক্ষ্য দেন।
জবানবন্দিতে মামুন বলেন, ১৮ জুলাই আসরের নামাজের পর মোহাম্মদপুরের আল্লাহ করিম মসজিদের কাছে ময়ূর ভিলার সামনে আন্দোলনে যোগ দেন তিনি। এ সময় বিপরীত দিক থেকে পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের অস্ত্রধারীরা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালাতে থাকেন। এতে অনেকে আহত হলে তাদের বিভিন্ন যানবাহনে করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
পরদিন ১৯ জুলাই সকাল থেকেই আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়ে মামুন বলেন, শ্যামলী ও আসাদগেট এলাকায়ও তিনি পুলিশ, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের অস্ত্র নিয়ে অবস্থান এবং আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি করতে দেখেছেন।
সাক্ষীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিন দুপুর আড়াইটার দিকে বাঁশবাড়ি এলাকায় পুলিশ, আনসার, র্যাব এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালান। পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠলে তারা জননী কুরিয়ার সার্ভিসের গলিতে আশ্রয় নেন।
মামুন বলেন, কয়েকজন আন্দোলনকারী ওরিয়েন্টাল কোভান নামের একটি আবাসিক ভবনের গেটে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে রাজু নামে এক আন্দোলনকারীকে একজন পুলিশ ও আনসার সদস্য টেনে নিয়ে যান। পরে তাকে গুলি করা হয়।
তিনি বলেন, গুলিবিদ্ধ রাজুকে জননী কুরিয়ার সার্ভিসের সামনে আনলে দেখি, তার পায়ে ও পেটে গুলি লেগেছে। তার পেট থেকে রক্তমাখা ভাত বের হচ্ছিল। তাকে মোটরসাইকেলে করে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেই। কিন্তু ১৯ জুলাই তিনি মারা যান।
রাজুকে গুলি করা আনসার সদস্য হিসেবে ওমর ফারুকের নাম উল্লেখ করেন সাক্ষী।
জবানবন্দিতে মামুন আরও জানান, ওই দিন বিকেলে বছিলা তিন রাস্তার মাঝখানেও আন্দোলনে অংশ নেন তিনি। সেখানে পুলিশ, র্যাব, আনসার এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র লোকজন আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালান বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, হেলিকপ্টার থেকেও র্যাব গুলি চালাচ্ছিল।
সন্ধ্যার দিকে গুলির তীব্রতা বেড়ে গেলে আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন গলিতে আশ্রয় নেন। মামুন তখন মেহজাবিন বিউটি পার্লারের সামনে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির পেছনে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে জসিম নামে আরেক আন্দোলনকারীকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন তিনি।
সাক্ষী বলেন, জসিমের একটি গুলি হাতে লেগে দুটি আঙুল ঝুলে ছিল। আরেকটি গুলি তার বুকে লেগে পেছন দিয়ে বের হয়ে যায়। জসিমকে রনি ফার্মেসিতে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর রিকশায় করে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে ২৯ জুলাই বক্ষব্যাধি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয় বলে ট্রাইব্যুনালকে জানান মামুন।
জবানবন্দিতে মামুন আরও বলেন, ২২ জুলাই মোহাম্মদপুর ফুটওভার ব্রিজের নিচে বিকেল ৪টার দিকে টিয়ারশেলের আঘাতে তিনি নিজেও আহত হন। এরপর আর আন্দোলনে অংশ নেননি।
মামুন তার জবানবন্দিতে তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা, ফজলে নূর তাপস ও জাহাঙ্গীর কবির নানকের নির্দেশ এবং পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তার সহযোগিতায় যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও গুলির জন্য দায়ী করেন। তিনি মামলায় অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।
এ মামলায় ২৮ আসামির মধ্যে বর্তমানে গ্রেপ্তার রয়েছেন চারজন। তারা হলেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মোহাম্মদপুর থানা শাখার সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, সহসভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, আনসার সদস্য ওমর ফারুক এবং যুবলীগ কর্মী ফজলে রাব্বি।
প্রসিকিউশনের পক্ষে মামলায় শুনানি করেন প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ। তার সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর মামুনুর রশিদ, সুলতান মাহমুদসহ অন্য প্রসিকিউটররা।
আরটিভি/এসকে


