
ঢাকার আরমানিটোলার আহমেদ বাওয়ানী অ্যাকাডেমির শিক্ষার্থী মোরশেদ আলম তানিম হত্যা মামলার তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। গত বছর মোবাইল ছিনতাইয়ের দাবি করা হলেও, এক বছর পর পুলিশি তদন্তে জানা গেছে— মূলত জুনিয়রের সামনে সিনিয়রের সিগারেট জ্বালানোর মতো তুচ্ছ বিষয় এবং পূর্ব শত্রুতার জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল।
মামলাটির তদন্ত শেষে চকবাজার মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রাজু আহমেদ আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন। মামলার অভিযোগ প্রমাণে ১৯ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে, যারা আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে ঘটনার সত্যতা প্রমাণ করবেন।
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, মৃত্যুর আগে তানিম তার মাকে হামলাকারীদের নাম বললেও ভয়ে পরিবার সবকিছু লুকিয়ে যায় এবং মামলা করতে রাজি হয়নি। পরবর্তীতে কারা তাকে প্রথমে হাসপাতালে নিয়েছিল, সেই সূত্র ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়।
এরপর তাদের জবানবন্দি ও সামগ্রিক তদন্তে সিগারেট জ্বালানোর বিষয়টি সামনে আসে। এ বিষয়ে কথা বলতে নিহতের বাবা ফিরোজ আলম আবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে
নিহত তানিমের দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর পরিবার আইনগত ব্যবস্থা নেবে বলে জানানো হলেও পরে কোনো অভিযোগ করা হয়নি। পরবর্তীতে চকবাজার মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. মানিক উদ্দিন বাদী হয়ে গত বছরের ২৫ জুলাই একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে গত বছরের ২৮ আগস্ট মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও চকবাজার মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রাজু আহমেদ মূল অভিযুক্ত মো. সিফাত ওরফে রিগ্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
একই সঙ্গে অপরাধে জড়িত চার শিশুকে অভিযুক্ত করে আদালতে দোষীপত্র জমা দেওয়া হয়। এই চার শিশু হলো— মো. সায়েম হোসেন, মো. জাহিদ ইসলাম, মোস্তাকিম আহম্মেদ সাফিন ও মো. অনিক। এদের মধ্যে সায়েম, জাহিদ ও অনিক আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে।
হত্যার পরিকল্পনা ও পেছনের গল্প
আসামি সিফাত এবং অভিযুক্ত চার শিশু তানিমের পূর্বপরিচিত ছিল। এর আগে তানিমের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে বিক্রি করে দেওয়া নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ চলছিল। গত বছরের ৩০ জুন রাত ১২টার দিকে তানিম হোসেনি দালান ইমামবাড়া থেকে মাতম শেষ করে আসিফুর রহমান দাউদ, আরাফাত হোসেন রাফি ও ধলুদের সঙ্গে বাসায় ফেরার জন্য বের হয়। এ সময় তার পেছনে পেছনে সিফাত ও তার সহযোগীরাও গেট দিয়ে বের হয়।
হোসেনি দালান থেকে বের হয়ে কাবিন নামক কাবাবের দোকানের সামনে গিয়ে তানিম সিগারেট জ্বালায়। বিষয়টি দেখতে পেয়ে সায়েম তা সিফাতসহ অন্যদের জানায়। তখন সিফাত ক্ষিপ্ত হয়ে সহযোগীদের বলে, জুনিয়র হয়ে সিনিয়রের সামনে সিগারেট জ্বালানোর এত বড় সাহস তানিমের! সে একটা বেয়াদব, তাকে আজ শিক্ষা দিতে হবে। এরপরই সিফাত ও তার সহযোগীরা তানিমকে হত্যার পরিকল্পনা করে।
যেভাবে ঘটেছিল হামলা
সিগারেট জ্বালাতে গিয়ে তানিম তার বন্ধুদের থেকে কিছুটা পেছনে পড়ে যান। তিনি চকবাজার থানার নাজিম উদ্দিন রোডের মক্কু শাহ মাজারের কাছে পৌঁছালে পূর্বশত্রুতার জেরে সিফাত ও তার সহযোগীরা তাকে ঘিরে ধরে। এ সময় সিফাত হত্যার উদ্দেশ্যে ধারালো চাকু দিয়ে তানিমকে আঘাত করে পালিয়ে যান। তানিমের চিৎকারে তার বন্ধুরা এগিয়ে যায় এবং তাকে দ্রুত উদ্ধার করে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যায়।
চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, হত্যাকাণ্ডে যাতে কেউ সন্দেহ না করে, সেজন্য অভিযুক্ত শিশু সায়েম, জাহিদ, সাফিন ও অনিকও তানিমকে দেখতে মিটফোর্ড হাসপাতালে গিয়েছিল। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরদিন ১ জুলাই বাসায় নেওয়ার পর বিকালে তানিম অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে পুনরায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তার খাদ্যনালী কেটে যাওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে। ওই দিন রাত ১১টায় অপারেশন থিয়েটারে নেওয়ার পর গত বছরের ২ জুলাই ভোর সাড়ে ৫টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তানিম মারা যায়।
আরটিভি/এসএস


