
অফিস বা ক্লাস শেষে বাসে জানালার পাশে বসে আছেন। চারপাশে যানজট, গাড়ির হর্ন আর অসংখ্য মানুষের ভিড়। অথচ এত মানুষের মাঝেও হঠাৎ মনে হতে পারে, আপনি ভীষণ একা।
আধুনিক শহুরে জীবনের এ এক অদ্ভুত বাস্তবতা। চারপাশে মানুষের অভাব নেই, যোগাযোগেরও কমতি নেই। তবুও দিন শেষে অনেকের মনে তৈরি হয় এক ধরনের শূন্যতা। প্রতিদিনের ব্যস্ততা, দায়িত্ব আর প্রযুক্তির ভিড়ে অন্যদের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও নিজের সঙ্গে যোগাযোগটাই যেন ধীরে ধীরে কমে যায়।
ব্যস্ততার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে নিজের সময়
শহুরে জীবন আমাদের অনেক সুযোগ-সুবিধা দিলেও কেড়ে নিচ্ছে স্থির থাকার সময়। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরই শুরু হয় ব্যস্ততা। কর্মক্ষেত্র, পড়াশোনা কিংবা সংসারের দায়িত্ব সামলাতে সামলাতে দিনের শেষে শরীরের পাশাপাশি মনও ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবিরাম ব্যস্ততা। একের পর এক বার্তা, নোটিশ ও নানা তথ্য আমাদের মনকে আরও ব্যস্ত করে রাখে। ভার্চুয়াল জগতে শত শত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও নিজের মনের খবর নেওয়ার সময় হয় না অনেকের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্যদের সঙ্গে সবসময় যুক্ত থাকার চেষ্টা করতে গিয়ে নিজের সঙ্গে যোগাযোগ কমে গেলে মনের মধ্যে ধীরে ধীরে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে তা মানসিকভাবে আরও ক্লান্ত করে তুলতে পারে।
একা থাকা আর একাকীত্ব এক নয়
অনেকেই একাকীত্ব এবং নিজের জন্য সময় রাখাকে একই বিষয় মনে করেন। আসলে দুটির মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।
একাকীত্ব হলো এমন একটি কষ্টকর অনুভূতি, যখন একজন মানুষ অন্যের সঙ্গ চান কিন্তু তা পান না। অন্যদিকে, নিজের ইচ্ছায় কিছু সময় একা থাকা হতে পারে ইতিবাচক একটি অভ্যাস।
নিজের জন্য রাখা এই সময়টুকুতে দিনের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে নিজের ভাবনা, অনুভূতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ভাবার সুযোগ পাওয়া যায়। নিয়মিত কিছুটা সময় নিজের সঙ্গে কাটালে মানসিক চাপ সামলানোর ক্ষমতাও বাড়তে পারে।
নিজের জন্য সময় কেন জরুরি?
সারাক্ষণ চারপাশের শব্দ, কাজের চাপ ও নানা তথ্যের মধ্যে থাকলে মস্তিষ্কও বিশ্রামের সুযোগ কম পায়। কিছুটা নিরিবিলি সময় মস্তিষ্ককে সেই চাপ থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ দেয়।
এই সময় নতুন চিন্তা করার সুযোগ তৈরি হয়। নিজের ভালো লাগা, দুর্বলতা কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েও ভাবা যায়। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া বা জটিল পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষেত্রেও নিজের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো কাজে আসতে পারে।
শহরের মধ্যেই খুঁজে নিন নিজের সময়
নিজেকে সময় দেওয়ার জন্য দূরের কোনো পাহাড় কিংবা সমুদ্রের কাছে ছুটে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রতিদিনের ছোট ছোট মুহূর্তেই নিজের জন্য সময় বের করা সম্ভব।
সকালে ঘুম থেকে উঠে মোবাইল হাতে নেওয়ার আগে বারান্দায় দাঁড়িয়ে এক কাপ চা পান করতে পারেন। অফিস থেকে ফেরার পথে কিছুটা পথ একা হেঁটে আসতে পারেন। ছুটির দিনে পরিচিত কোনো পার্ক, ছাদ কিংবা নিরিবিলি জায়গায় কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকতে পারেন।
তবে এই সময়টুকুতে যতটা সম্ভব মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য পর্দা থেকে দূরে থাকা ভালো। কিছু সময় শুধু নিজের চিন্তা ও অনুভূতির সঙ্গে থাকা যেতে পারে।
প্রতিদিন ১৫ মিনিট শুধু নিজের জন্য
শহরের ব্যস্ততা কমবে না। যানজট, কাজের চাপ কিংবা চারপাশের কোলাহলও পুরোপুরি থামবে না। কিন্তু এই ব্যস্ততার মধ্যেও নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করা সম্ভব।
নিজেকে সময় দেওয়া কোনো বিলাসিতা নয়। বরং ব্যস্ত জীবনে মানসিকভাবে ভালো থাকার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি অভ্যাস হতে পারে।
তাই প্রতিদিনের ব্যস্ততার মধ্য থেকে অন্তত ১৫ মিনিট নিজের জন্য রাখুন। চারপাশের সব শব্দ থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে নিজের মনের কথা শুনুন। কারণ অন্য সবার সঙ্গে ভালো থাকার পাশাপাশি নিজের সঙ্গেও শান্তিতে থাকতে শেখাটাই দিন শেষে ভালো থাকার অন্যতম চাবিকাঠি।
আরটিভি/জেএমএ




