
এইচএসসি পরীক্ষার পরই জীবনের একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়। কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যে পা রাখার এই সময়টায় একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা চিন্তা—সব মিলিয়ে অনেক শিক্ষার্থীই মানসিক চাপে থাকে।
অনেকে মনে করেন, এই বয়সে মস্তিষ্কের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। কৈশোরের শেষ দিকে মস্তিষ্কের সমস্যা সমাধান ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত অংশের বিকাশ তখনো চলতে থাকে। একই সময়ে আবেগপ্রবণতাও তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে।
এর সঙ্গে যোগ হয় পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশা, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, ক্যারিয়ার বেছে নেওয়ার চাপ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রতিযোগিতা। ফলে এই সময়ে মানসিক চাপ বা আবেগের ওঠানামা হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
তাই কঠিন এই সময়টাকে সামলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিতে কিছু অভ্যাস কাজে লাগতে পারে।
১. অল্প সময়ে বেশি নয়, দীর্ঘ পথের প্রস্তুতি
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা কোনো স্বল্প সময়ের দৌড় নয়। সাধারণত কয়েক মাস ধরে এর প্রস্তুতি নিতে হয়। তাই শুরুতেই অতিরিক্ত পড়াশোনা করে ক্লান্ত হয়ে পড়ার বদলে ধীরে ধীরে ধারাবাহিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোও প্রস্তুতির অংশ। এসব বাদ দিয়ে শুধু পড়াশোনায় মন দিলে একটা সময় পড়ার প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে।
দীর্ঘ দৌড়ের মতোই ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতেও নিজের শক্তি বুঝে এগোতে হবে।
২. রুটিন মেনে চলুন, মুঠোফোনে লাগাম দিন
সারাদিন বা সারারাত এলোমেলোভাবে পড়ার চেয়ে নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করে পড়া বেশি কার্যকর। পড়ার সময় ভাগ করে নিতে হবে, মাঝে প্রয়োজনীয় বিরতি রাখতে হবে এবং আগের পড়া নিয়মিত ঝালিয়ে নিতে হবে।
সপ্তাহে অন্তত একদিন নিজের অগ্রগতিও যাচাই করা যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস তৈরি করা জরুরি।
বর্তমানে মুঠোফোন ও ইন্টারনেটের অতিরিক্ত ব্যবহার শিক্ষার্থীদের মনোযোগ নষ্ট করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ছোট ভিডিও কিংবা অনলাইন খেলা সহজেই পড়াশোনার সময় কেড়ে নিতে পারে।
তাই পড়ার সময় মুঠোফোনের বার্তা আসার ব্যবস্থা বন্ধ রাখা, নির্দিষ্ট সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে বারবার পর্দা দেখা থেকে বিরত থাকা ভালো অভ্যাস হতে পারে।
৩. অন্যের সঙ্গে নিজেকে মেলাবেন না
কে কত ঘণ্টা পড়ছে, কে কতগুলো কোচিং করছে কিংবা পরীক্ষায় কে কত নম্বর পাচ্ছে—এসব দিয়ে নিজের যোগ্যতা বিচার করা ঠিক নয়।
প্রত্যেক মানুষের শেখার ধরন, আগ্রহ, দক্ষতা ও কাজের গতি আলাদা। তাই অন্যের প্রস্তুতির সঙ্গে নিজের প্রস্তুতিকে তুলনা না করে নিজের অগ্রগতির দিকে নজর দেওয়া উচিত।
কোনো দিন মনোযোগ কম থাকলে বা উদ্বেগ বেশি হলে নিজেকে ব্যর্থ মনে করার দরকার নেই। নিজেকে মনে করিয়ে দিতে হবে—কঠিন সময় সাময়িক, এটি কেটে যাবে।
অনেক সময় ভালো ঘুম, কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাবার কিংবা কিছুটা বিশ্রাম মস্তিষ্ককে আবার পড়াশোনার উপযোগী করে তুলতে পারে।
৪. একা সব সামলাতে যাবেন না
কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে কিংবা মানসিক চাপ বেশি মনে হলে সবকিছু একা সামলানোর চেষ্টা না করে সাহায্য নেওয়া উচিত।
শিক্ষক, বড় ভাই-বোন, পরিবার কিংবা মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শদাতার সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে। প্রয়োজনের সময় সহযোগিতা চাওয়া দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং এটি নিজের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার একটি অংশ।
৫. সাফল্য মানেই শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটি নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বা একটি নির্দিষ্ট বিষয়ই জীবনের একমাত্র সাফল্যের পথ নয়।
অন্যের তৈরি করে দেওয়া ‘ভালো বিষয়’ বা ‘খারাপ বিষয়’-এর ধারণার বাইরে গিয়ে নিজের আগ্রহ ও পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
নিজেকে প্রশ্ন করুন—কোন বিষয় পড়তে ভালো লাগে? কোন কাজ করতে গিয়ে আনন্দ ও কৌতূহল তৈরি হয়? ভবিষ্যতে কী ধরনের কাজ করতে চান? সমাজে কী ধরনের অবদান রাখতে চান?
এসব বিষয় বিবেচনা করেই ভবিষ্যৎ পড়াশোনা ও পেশার সিদ্ধান্ত নেওয়া বেশি যুক্তিযুক্ত।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার সময়টা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিই জীবনের শেষ পরীক্ষা নয়। এই সময়ে নিজের প্রতি আস্থা রাখা, নিজের যত্ন নেওয়া এবং অন্যের সঙ্গে তুলনা না করে নিজের গতিতে এগিয়ে যাওয়া জরুরি।
শেখার আগ্রহ, দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা, কাজের প্রতি সততা, নিজের ও অন্যের প্রতি মমতা এবং মানসিকভাবে ভালো থাকার চেষ্টা—এসবই শেষ পর্যন্ত একটি সুখী ও অর্থপূর্ণ জীবনের ভিত্তি তৈরি করে।
আরটিভি/জেএমএ


