
স্কুলজীবন শেষ হয়ে যায়, মানুষ বড় হয়, বদলে যায় চারপাশ। তবু কৈশোরের কিছু ঘটনা যেন মন থেকে মুছে যায় না। স্কুলের জনপ্রিয় শিক্ষার্থী, বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক, অপমান, বুলিং, একা হয়ে যাওয়া কিংবা কোনো বিশেষ বন্ধুত্ব—বহু বছর পরও এসব স্মৃতি স্পষ্ট মনে থাকে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, কৈশোরের এসব অভিজ্ঞতা শুধু স্মৃতিতে আটকে থাকে না। পরবর্তী জীবনে অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক, সামাজিক পরিস্থিতি বোঝার ধরন, আত্মতৃপ্তি, এমনকি স্বাস্থ্য ও কর্মজীবনেও এর প্রভাব থাকতে পারে।
স্কুলের জনপ্রিয় মুখগুলোকে কেন মনে থাকে?
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক মিচ প্রিনস্টেইন বহু মানুষের স্কুলজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, স্কুলের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিক্ষার্থীদের কথা মানুষ বহু বছর পরও সহজে মনে করতে পারে।
অনেক সময় শিক্ষকদের বা অন্য সহপাঠীদের নাম ভুলে গেলেও স্কুলের সবচেয়ে জনপ্রিয় ছেলে বা মেয়েটির নাম মনে থাকে।
কারণ কৈশোরে সামাজিক অবস্থান বা অন্যদের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে মানুষের মধ্যে তীব্র সচেতনতা তৈরি হয়। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে অন্য মানুষের আচরণ বোঝার এক ধরনের মানসিক ছাঁচ তৈরি করতে পারে।
সবাই কি জনপ্রিয় বা অপছন্দের ছিল?
গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুলের শিক্ষার্থীদের সামাজিক অবস্থান একরকম নয়। কেউ সবার কাছে পছন্দের, কেউ অনেকের অপছন্দের। কেউ একই সঙ্গে কারও প্রিয় আবার কারও অপছন্দের। আবার কেউ প্রায় সবার কাছ থেকেই উপেক্ষিত থাকে।
গবেষকেরা শিক্ষার্থীদের সামাজিক অবস্থানকে কয়েকটি ভাগে দেখেছেন—গ্রহণযোগ্য, প্রত্যাখ্যাত, বিতর্কিত, উপেক্ষিত ও সাধারণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে সাধারণ শ্রেণিতে রাখা যায়। বাকিরা অন্য চার ধরনের সামাজিক অবস্থানের কোনো একটির মধ্যে পড়ে।
সবচেয়ে বেশি পছন্দের শিক্ষার্থীদের সাধারণত বন্ধুসুলভ, উৎসাহদাতা ও সহায়ক হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে যারা উপেক্ষিত, তারা তুলনামূলক চুপচাপ ও নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে থাকা স্বভাবের হতে পারে।
প্রত্যাখ্যাত শিক্ষার্থীদের কেউ আক্রমণাত্মক আচরণ করে বা অন্যকে উত্ত্যক্ত করে। আবার কেউ সামাজিকভাবে অস্বস্তিবোধ করে এবং নিজেরাই বুলিংয়ের শিকার হয়।
কৈশোরে জনপ্রিয়তার সংজ্ঞাও বদলে যায়
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভালো ব্যবহার, পড়াশোনায় ভালো ফল বা শিক্ষকদের পছন্দের শিক্ষার্থীরা অনেক সময় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু মাধ্যমিকে উঠলে জনপ্রিয়তার ধারণা অনেকটাই বদলে যায়।
এই বয়সে কে দেখতে কেমন, কে কতটা আত্মবিশ্বাসী, কে খেলাধুলায় ভালো, কে কীভাবে পোশাক পরে কিংবা কে কতটা প্রভাবশালী—এসব বিষয় সামাজিক অবস্থান নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে শুরু করে।
এমনকি বয়সের তুলনায় বড়দের মতো আচরণ করাও কখনও জনপ্রিয়তা বাড়াতে পারে। অল্প বয়সে মদ বা মাদক গ্রহণ কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার মতো আচরণ কিছু সময়ের জন্য সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে পারে বলে গবেষণায় দেখা গেছে।
তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের আচরণের গুরুত্ব কমে যায়। তখন মানুষের কাছে ভালো লাগা ও গ্রহণযোগ্যতা আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বন্ধুবলয় কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে?
কৈশোরে শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতো করে বিভিন্ন বন্ধুবলয় তৈরি করে। কেউ পড়াশোনায় আগ্রহী, কেউ খেলাধুলায়, কেউ গান-বাজনায়, কেউ আবার নিজেদের আলাদা পোশাক ও আচরণের মাধ্যমে পরিচিত হয়ে ওঠে।
এই বন্ধুবলয়ের সীমারেখা অনেক সময় খুব কঠিন হয়। ভিন্ন ধরনের কাউকে সহজেই বাদ দেওয়া বা উপহাস করার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।
গবেষকদের মতে, কৈশোরে নিজের পরিচয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তাই একই ধরনের মানুষদের নিয়ে দল তৈরি করা অনেকের কাছে নিজের অবস্থান বুঝতে সহজ করে।
তবে সবাই কোনো নির্দিষ্ট দলের অংশ হয় না। একটি গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৪৫ শতাংশ মাধ্যমিক শিক্ষার্থী নিজেদের শুধু ‘সাধারণ কিশোর’ হিসেবে দেখত।
স্কুলের তকমা কি বড় হয়েও থেকে যায়?
কৈশোরের শুরুতে যে শিক্ষার্থী নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা মনে করে, সময়ের সঙ্গে তার অবস্থান বদলাতেও পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, মাধ্যমিকের শেষ দিকে বন্ধুবলয়ের কঠোর সীমারেখা কিছুটা শিথিল হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা কমায় এবং নিজেদের পছন্দের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে শেখে।
ফলে স্কুলের শুরুতে যাকে পড়ুয়া বা অজনপ্রিয় ভাবা হতো, পরে সে নিজের মতো বন্ধু খুঁজে নিতে পারে। আবার একসময়কার জনপ্রিয় শিক্ষার্থীর সামাজিক অবস্থানও বদলে যেতে পারে।
অর্থাৎ স্কুলজীবনের কোনো একটি সময়ের পরিচয়ই একজন মানুষের পুরো জীবনের পরিচয় হয়ে থাকে না।
সেই সময়ের অভিজ্ঞতা বড় হয়েও প্রভাব ফেলে
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী লুসি ফোকসের মতে, কৈশোরে সামাজিক ক্ষমতা ও প্রভাবের পার্থক্য খুব তীব্রভাবে অনুভূত হয়। কারণ কিশোর-কিশোরীরা বছরের পর বছর প্রায় একই মানুষের সঙ্গে প্রতিদিন সময় কাটায়।
এই কারণেই স্কুলজীবনের সামাজিক অভিজ্ঞতা মানুষের মনে গভীরভাবে গেঁথে যেতে পারে।
মিচ প্রিনস্টেইনের মতে, কৈশোরের অভিজ্ঞতাগুলো পরবর্তী জীবনে অন্য মানুষের আচরণ বোঝার এক ধরনের মানসিক ছাঁচ হিসেবে কাজ করতে পারে। সেই পুরোনো স্মৃতিগুলো বিভিন্ন সামাজিক পরিস্থিতিতে আবার মনে পড়ে।
জনপ্রিয়তা সবসময় সুখের নয়
গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুলজীবনে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া পরবর্তী জীবনে ভালো সম্পর্ক, সুস্বাস্থ্য ও কর্মজীবনে ইতিবাচক ফলের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
অন্যদিকে শুধু সামাজিক মর্যাদা বা প্রভাব পাওয়ার চেষ্টা সবসময় ইতিবাচক ফল দেয় না।
যুক্তরাষ্ট্রের ১৮৪ জন কিশোর-কিশোরীকে ১৩ থেকে ২৩ বছর বয়স পর্যন্ত অনুসরণ করা একটি গবেষণায় দেখা যায়, অল্প বয়সে সামাজিক মর্যাদা পাওয়ার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ করা ব্যক্তিদের পরবর্তী জীবনে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও আচরণগত নানা সমস্যার ঝুঁকি বেশি ছিল।
অল্প বয়সে মদ ও মাদকের প্রতি আগ্রহ পরবর্তী সময়ে আসক্তির ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত ছিল। একইভাবে শুধু সামাজিক মর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা বন্ধুত্ব ও প্রেমের সম্পর্ককে গভীরভাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি করতে পারে।
প্রত্যাখ্যাত হওয়ার স্মৃতিও প্রভাব ফেলে
স্কুলজীবনে বারবার প্রত্যাখ্যাত হওয়া বা একঘরে হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
মিচ প্রিনস্টেইনের গবেষণায় দেখা যায়, স্কুলে প্রত্যাখ্যাত শিক্ষার্থীদের সময়ের সঙ্গে বিষণ্নতার প্রবণতা বাড়তে পারে।
এর একটি কারণ হতে পারে—প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর মানুষ আরও গুটিয়ে যায়। ফলে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ কমে এবং আবারও প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অনুভূতি তৈরি হয়। এভাবে একটি নেতিবাচক চক্র তৈরি হতে পারে।
তবে প্রত্যাখ্যাত হওয়া মানেই ভবিষ্যৎ খারাপ হবে, এমন নয়। বরং এমন অভিজ্ঞতা থেকে কেউ কেউ অন্যের অনুভূতি বোঝার ক্ষেত্রে আরও দক্ষ হয়ে উঠতে পারেন। অন্যায় বা কাউকে খারাপ আচরণের শিকার হতে দেখলেও তারা বেশি সচেতন হতে পারেন।
স্কুলজীবনের পরিচয় বদলানো সম্ভব
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কৈশোরে পাওয়া কোনো তকমা সারা জীবনের পরিচয় হয়ে থাকতে হবে না।
গবেষকদের মতে, স্কুলজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হওয়া নেতিবাচক ধারণা অনেক সময় বড় হয়েও নিজের আচরণকে প্রভাবিত করে। কেউ হয়তো মনে করতে পারেন, অন্যরা তাকে অপছন্দ করবে। ফলে সামাজিক পরিস্থিতিতে এমন আচরণ করতে পারেন, যা সত্যিই সেই নেতিবাচক অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
কিন্তু নিজের পুরোনো ধারণাগুলো নতুন করে দেখার চেষ্টা করলে এই চক্র থেকে বের হওয়া সম্ভব।
কোনো মানুষের অস্পষ্ট মন্তব্যকে সবসময় নিজের বিরুদ্ধে বলা হয়েছে বলে ধরে নেওয়ার বদলে অন্য ব্যাখ্যাও থাকতে পারে—এভাবে ভাবার অভ্যাস গড়ে তুললে সামাজিক সম্পর্ক আরও ইতিবাচক হতে পারে।
স্কুলের দিনগুলো জীবন ঠিক করে দেয় না
কৈশোরের অভিজ্ঞতা মানুষের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাই যে পুরো জীবন নির্ধারণ করে দেবে, এমন নয়।
স্কুলজীবনে জনপ্রিয় ছিলেন কি না, একসময় উপেক্ষিত ছিলেন কি না কিংবা কোনো বন্ধুবলয়ে জায়গা পেয়েছিলেন কি না—এসব পরিচয় সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে।
এমনকি কৈশোরে প্রত্যাখ্যাত হওয়া মানুষও পরবর্তী জীবনে ভালো সম্পর্ক, পছন্দের কাজ এবং অর্থপূর্ণ জীবন গড়ে তুলতে পারেন। গবেষকদের মতে, পুরোনো অভিজ্ঞতার প্রভাব বুঝতে পারা এবং প্রয়োজন হলে নিজের সেই মানসিক ছাঁচ বদলানোর চেষ্টা করাই গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: বিবিসি
আরটিভি/জেএমএ


