
বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন খাবার রুটির ইতিহাস হাজার হাজার বছরের। বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই খাবার। রুটির ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও পুষ্টিগুণ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে প্রতিবছর ১৬ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব রুটি দিবস (World Bread Day)।
বিশ্ব রুটি দিবস চালুর উদ্যোগ নেয় আন্তর্জাতিক বেকার ও মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারক সমিতি। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে এ দিবস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিশ্বের প্রাচীনতম খাবারগুলোর একটি রুটির গুরুত্ব তুলে ধরা এবং রুটি তৈরির সঙ্গে যুক্ত কারিগরদের সম্মান জানানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
দিবসটি ১৬ অক্টোবর পালনের পেছনেও রয়েছে বিশেষ কারণ। ১৯৪৫ সালের এই দিনে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। খাদ্যনিরাপত্তা ও ক্ষুধা মোকাবিলার সঙ্গে রুটির সম্পর্ক তুলে ধরতেও দিনটি বেছে নেওয়া হয়েছে।
রুটির হাজার বছরের ইতিহাস
রুটির ইতিহাস বহু প্রাচীন। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রায় ৩০ হাজার বছর আগে মানুষ উত্তপ্ত পাথরের ওপর আটা বা শস্যের মিশ্রণ সেঁকে রুটির মতো খাবার তৈরি করত। খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৩০০০ সালে প্রাচীন মিসরীয়রা প্রাকৃতিক খামির ব্যবহার করে ফোলা রুটি তৈরির কৌশল আয়ত্ত করে। পরে রুটি তাদের দৈনন্দিন খাবারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। শ্রমিকদের মজুরি হিসেবেও রুটি দেওয়া হতো।
প্রাচীন বিভিন্ন সভ্যতায় রুটির নানা ধরন প্রচলিত ছিল। কোথাও পাতলা রুটি, কোথাও মধু ও তেল মেশানো রুটি, আবার কোথাও সৈন্যদের জন্য বিশেষ ধরনের রুটি তৈরি করা হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে গম চাষ এবং রুটি তৈরির প্রচলন ছড়িয়ে পড়ে।
মধ্যযুগে রুটি তৈরি একটি পেশায় পরিণত হয়। একই সঙ্গে এটি মানুষের জীবিকা, সামাজিক বন্ধন ও দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। ১৯১২ সালে অটো ফ্রেডেরিক রোহওয়েডার টুকরা করা রুটি তৈরির যন্ত্র উদ্ভাবন করেন। এর ফলে রুটি সংরক্ষণ ও পরিবেশন আরও সহজ হয়ে যায়।
রুটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে সংস্কৃতি
একসময় রুটির ধরন মানুষের সামাজিক অবস্থানেরও পরিচায়ক ছিল। ধনী ব্যক্তিরা গমের সাদা রুটি খেতেন, আর অপেক্ষাকৃত কম সচ্ছল মানুষের খাবার ছিল যবের মতো শস্য দিয়ে তৈরি মোটা ও গাঢ় রঙের রুটি। প্রাচীন রোমে ‘রুটি ও বিনোদন’ কথাটি শাসকদের জনগণকে শস্য ও বিনোদন দিয়ে সন্তুষ্ট রাখার নীতিকে বোঝাতে ব্যবহৃত হতো।
বর্তমানে রুটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক বন্ধনের প্রতীক। ফ্রান্সের লম্বা রুটি, ভারতের নান এবং মেক্সিকোর ভুট্টার রুটি নিজ নিজ দেশের খাদ্যসংস্কৃতির পরিচয় বহন করে। বিয়ে, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও নানা সামাজিক আয়োজনে রুটি পরিবেশনের প্রচলনও রয়েছে।
রুটির পুষ্টিগুণ কতটা?
পুষ্টির দিক থেকেও রুটি গুরুত্বপূর্ণ। এতে শর্করা, আঁশ, ভিটামিন ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান পাওয়া যায়। স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের চাহিদা বাড়ায় বর্তমানে বহু শস্যের মিশ্রণে তৈরি রুটি, গ্লুটেনমুক্ত রুটি, খামির দিয়ে তৈরি রুটি এবং পূর্ণশস্যের রুটির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। বিশেষ করে পূর্ণশস্য ও রাইয়ের রুটিতে আঁশের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকে।
বিশ্বজুড়ে রুটির বাজার
বিশ্বজুড়ে রুটির বাজারও বাড়ছে। ২০২৪ সালে এ বাজারের আনুমানিক মূল্য ছিল ২৩ হাজার ৩৪৩ কোটি মার্কিন ডলার। ২০৩৩ সালে তা বেড়ে ৩২ হাজার ৭১১ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং লাতিন আমেরিকায় বিভিন্ন উপাদান ও স্বাদের রুটির চাহিদা বাড়ছে।
নানা দেশে নানা ধরনের রুটি
বিশ্ব রুটি দিবস উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ঐতিহ্যবাহী রুটির রেসিপিও তুলে ধরা হয়। অস্ট্রেলিয়ার ড্যাম্পার, ইতালির পানা ভিসেন্তিনা, পোল্যান্ডের রাইয়ের খামিরে তৈরি রুটি, যুক্তরাষ্ট্রের পার্কার হাউস রোলস ও সান ফ্রান্সিসকোর খামিরে তৈরি রুটি এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া আজারবাইজানের ফাসালি ও ফাতির, রাশিয়ার বোরোদিনস্কি রুটি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের রেগাগ ও খামির রুটিও নিজ নিজ অঞ্চলের ঐতিহ্য বহন করে।
বিশ্ব রুটি দিবস যেভাবে পালন করবেন
দিবসটি পালনের অংশ হিসেবে মানুষকে ঘরে রুটি তৈরি, নিজ দেশের ঐতিহ্যবাহী রুটির রেসিপি ভাগাভাগি এবং ক্ষুধা মোকাবিলায় কাজ করা সংস্থাগুলোকে সহায়তা করার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে খাদ্যসংকট ও সবার জন্য পর্যাপ্ত খাবার নিশ্চিত করার বিষয়েও সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সূত্র: বিশ্ব রুটি দিবস অর্গানাইজেশন, ওয়ার্ড শেফ অর্গানাইজেশন
আরটিভি/জেএমএ


