
সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে যদি দেখা যায় রাস্তায় নেই কোনো ব্যক্তিগত গাড়ি, নেই তীব্র যানজট। কেউ হেঁটে, কেউ বাসে, আবার কেউ সাইকেলে ছুটছেন গন্তব্যের দিকে—রাজধানীবাসীর কাছে এমন দৃশ্য অনেকটা স্বপ্নের মতোই। তবে ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এমন পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যেই আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) দিবসটি পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশে ২০১৬ সাল থেকে দিবসটি পালন করা হচ্ছে।
এই দিবসের উদ্দেশ্য শুধু এক দিনের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি বন্ধ রাখা নয়। বরং ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার ও নির্ভরতা কমানো, যানজট ও বায়ুদূষণ-শব্দদূষণ কমানো এবং হাঁটা, সাইকেল ও গণপরিবহন ব্যবহারে মানুষকে উৎসাহিত করাই এর মূল লক্ষ্য।
ঢাকার সড়কে গাড়ির চাপ কতটা?
রাজধানী ঢাকার সড়কে প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখের বেশি যানবাহন চলাচল করে। এর মধ্যে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ হলেও এসব গাড়ি সড়কের প্রায় ৭০ শতাংশ জায়গা দখল করে।
অন্যদিকে, ঢাকার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল।
ফলে অল্পসংখ্যক ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য সড়কে জায়গার বড় অংশ ব্যবহৃত হলেও বিপুলসংখ্যক মানুষকে গণপরিবহনে চলাচল করতে হয়। এর প্রভাব পড়ে যানজট ও নগরজীবনে।
যানজটে বছরে অপচয় বিলিয়ন ডলার
বুয়েটের গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকার যানজটের কারণে প্রতি বছর প্রায় ৩ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থ অপচয় হয়।
অন্যদিকে, অতিরিক্ত যান্ত্রিক যানবাহনের কারণে বায়ুদূষণও বাড়ছে। এর ফলে ঢাকায় প্রতিবছর প্রায় ৮০ হাজার মানুষের অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে তথ্যটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি হাঁটা, সাইকেল ও গণপরিবহনের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
‘কম গাড়ি, বাসযোগ্য নগরী’
বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস উপলক্ষে রাজধানীর ধানমন্ডি সাত মসজিদ সড়কের আবাহনী খেলার মাঠের সামনে ‘কম গাড়ি, বাসযোগ্য নগরী’ শীর্ষক মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, পরিকল্পিত নগরায়ণের অভাবে ঢাকা মহানগরী প্রতিনিয়ত নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের যাতায়াতের চাহিদা ও যান্ত্রিক যানবাহনের সংখ্যাও বাড়ছে। ফলে ঢাকা ক্রমেই যানজটের শহরে পরিণত হচ্ছে।
তারা জানান, ঢাকার প্রায় ৭৬ শতাংশ যাতায়াত দুই কিলোমিটারের মধ্যে হয়। এসব স্বল্প দূরত্বে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় হাঁটার পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে অনেক মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে হেঁটে যাতায়াতে উৎসাহিত হবেন।
জ্বালানির দাম বাড়ায় বাড়ছে যাতায়াত ব্যয়
কর্মসূচিতে বক্তারা জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টিও তুলে ধরেন। তাদের মতে, জ্বালানির দাম বাড়লে মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত ব্যয়ের পাশাপাশি পারিবারিক ব্যয়ের ওপরও সরাসরি চাপ পড়ে।
এ কারণে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি গণপরিবহন, হাঁটা ও সাইকেল ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য করার প্রয়োজন রয়েছে।
তাদের মতে, অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমানো গেলে জ্বালানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি পারিবারিক পরিবহন ব্যয় কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে যানজট ও বায়ুদূষণ কমিয়ে নগরবাসীর জন্য আরও বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করা যেতে পারে।
যে বিষয়গুলোতে জোর দেওয়া হচ্ছে
বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে কর্মসূচিতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
শুধু এক দিনের নয়, নিয়মিত অভ্যাসের লক্ষ্য
বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবসের মূল বার্তা হলো—শুধু একটি দিন ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার না করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বরং প্রয়োজন অনুযায়ী হাঁটা, সাইকেল ও গণপরিবহন ব্যবহারের সুযোগ তৈরি এবং ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো।
বিশেষ করে স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে নিরাপদ হাঁটার পরিবেশ তৈরি করা গেলে যানজট, জ্বালানি খরচ ও দূষণ কমানোর পাশাপাশি নগরজীবনও আরও স্বস্তিদায়ক হতে পারে।
আরটিভি/জেএমএ


