
লিভারের রোগ সব সময় স্পষ্ট উপসর্গ নিয়ে দেখা দেয় না। প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকের শরীরে তেমন কোনো লক্ষণই প্রকাশ পায় না। ফলে অজান্তেই বাড়তে পারে রোগের জটিলতা। জন্ডিস, পেট ফুলে যাওয়া কিংবা হজমের সমস্যাকে লিভারের অসুখের পরিচিত লক্ষণ হিসেবে ধরা হলেও হাত-পায়ের কিছু অস্বাভাবিক পরিবর্তনও হতে পারে লিভারের সমস্যার ইঙ্গিত।
লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমা, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ কিংবা সিরোসিসের মতো জটিলতায় ত্বক, নখ ও রক্তনালিতে বিভিন্ন পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। তবে এসব লক্ষণ থাকলেই যে লিভারের রোগ হয়েছে, এমন নয়। অন্য শারীরিক সমস্যার কারণেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
হাত-পায়ের যে ৫ পরিবর্তনে সতর্ক হবেন
১. হাতের তালু লাল হয়ে যাওয়া
হাতের তালু স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি লাল হয়ে যাওয়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘পালমার এরিথেমা’ বলা হয়। লিভারের দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে এ ধরনের পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। সাধারণত দুই হাতের তালুতেই লালচে ভাব দেখা দেয়। কখনো তালু গরমও অনুভূত হতে পারে।
তবে হরমোনের পরিবর্তনসহ অন্যান্য কারণেও হাতের তালু লাল হতে পারে। তাই শুধু এ লক্ষণ দেখে লিভারের রোগ নির্ণয় করা সম্ভব নয়।
২. নখের রং ও গঠনে পরিবর্তন
নখের রং ফ্যাকাশে বা সাদাটে হয়ে যাওয়া এবং গঠনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন কিছু ক্ষেত্রে লিভারের দীর্ঘস্থায়ী রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। বিশেষ করে নখের বড় অংশ সাদা দেখানো এবং প্রান্তে তুলনামূলক গাঢ় রং দেখা দেওয়ার মতো পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।
তবে রক্তস্বল্পতা, পুষ্টির ঘাটতি ও ছত্রাকের সংক্রমণসহ বিভিন্ন কারণেও নখের রং ও গঠন বদলে যেতে পারে। দীর্ঘদিন এমন পরিবর্তন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
৩. পা ও গোড়ালি ফুলে যাওয়া
লিভারের গুরুতর রোগে শরীরে তরল জমে পা ও গোড়ালি ফুলে যেতে পারে। লিভারের কার্যক্ষমতা কমে গেলে রক্তে অ্যালবুমিন নামের প্রোটিনের মাত্রা কমে যাওয়ার কারণে এ সমস্যা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে পেটেও তরল জমে পেট ফুলে যেতে পারে।
তবে পা ফোলার পেছনে হৃদ্যন্ত্র, কিডনি কিংবা শিরার সমস্যাও থাকতে পারে। বিশেষ করে হঠাৎ এক পা ফুলে গেলে এবং ব্যথা থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
৪. ত্বকে জালের মতো লাল রক্তনালি দেখা দেওয়া
ত্বকের ওপর ছোট লাল বিন্দু থেকে মাকড়সার জালের মতো সূক্ষ্ম রক্তনালি ছড়িয়ে থাকতে দেখা গেলে তাকে ‘স্পাইডার অ্যাঞ্জিওমা’ বলা হয়। লিভারের দীর্ঘস্থায়ী রোগ, বিশেষ করে সিরোসিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে এ ধরনের লক্ষণ দেখা যেতে পারে।
হরমোনের পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে ত্বকের ওপরের রক্তনালিগুলো এভাবে দৃশ্যমান হয়। তবে ত্বকে দৃশ্যমান সব শিরা বা রক্তনালিই লিভারের রোগের লক্ষণ নয়।
৫. হাত-পায়ে ঝিনঝিনি, অসাড়তা বা ব্যথা
হাত-পায়ে বারবার ঝিনঝিনি অনুভব করা, অসাড় হয়ে যাওয়া কিংবা জ্বালাপোড়া ও ব্যথা স্নায়ুর সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। কিছু লিভার রোগের সঙ্গে স্নায়ুর ক্ষতির সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণের কারণে লিভারের পাশাপাশি স্নায়ুও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। হেপাটাইটিস সি-র মতো কিছু সংক্রমণের সঙ্গেও স্নায়ুজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তবে ডায়াবেটিস, ভিটামিনের ঘাটতি কিংবা স্নায়ুতে চাপ পড়ার কারণেও এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই সমস্যার প্রকৃত কারণ জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
লিভারের রোগ সন্দেহ হলে কী করবেন?
হাত-পায়ের এসব পরিবর্তন দেখা দিলেই লিভারের রোগ হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। তবে এসব লক্ষণের পাশাপাশি অতিরিক্ত ক্লান্তি, ক্ষুধামন্দা, বমি বমি ভাব, চোখ বা ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া, প্রস্রাবের রং গাঢ় হওয়া কিংবা পেট ফুলে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক লিভার ফাংশন টেস্ট, অন্যান্য রক্ত পরীক্ষা কিংবা আলট্রাসনোগ্রামের পরামর্শ দিতে পারেন। পরীক্ষার ফলাফল ও রোগের ধরন বিবেচনায় চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়।
লিভারের রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে জটিলতা কমানো সম্ভব। তাই শরীরের অস্বাভাবিক পরিবর্তন অবহেলা না করে সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
আরটিভি/এসকে


