
চলতি বছরের ১৬ মার্চ ঘোষিত ১৮০ দিনের বিনিয়োগ পরিকল্পনার মেয়াদ শেষে অগ্রগতি নিয়ে জনসাধারণের জন্য সর্বশেষ তথ্য প্রকাশ করেছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ।
এ পরিকল্পনার তিনটি স্তম্ভ-উন্নত অবকাঠামো, বিনিয়োগ সহায়তা এবং বিনিয়োগ উন্নয়নের আওতায় গত মার্চে ঘোষিত ১৬টি কর্মধারার মধ্যে ১৪টির অধীনে নেওয়া ২০টি উদ্যোগের অগ্রগতি তুলে ধরা হয়েছে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, সরকারের বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে উন্নত অবকাঠামো, দ্রুত ও কার্যকর সেবা এবং বিনিয়োগযোগ্য সুযোগের একটি শক্তিশালী পাইপলাইনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, কিছু পরিবর্তন ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে। তবে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে আরো সময় লাগবে। ১৮০ দিন পর অগ্রগতি জানানোর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এ হালনাগাদ প্রকাশ করা হয়েছে।
পরিকল্পনার প্রথম স্তম্ভের আওতায় বন্দর আধুনিকায়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন, বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ এবং সরকারি সম্পদের উৎপাদনশীল ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রামের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। এপিএম টার্মিনালস ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়েছে। প্রকল্পটি চালু হলে ৭০০টির বেশি সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বন্দরের সক্ষমতা ৪৪ শতাংশ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনালের ১৫ বছরের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ইজারার জন্য একটি আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটরের সঙ্গে চূড়ান্ত পর্যায়ের আলোচনা চলছে।
চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ কর্পোরেশন (সিআরবিসি) ২০২৮ সালের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্য নিয়েছে। এ অঞ্চলের প্রত্যাশিত বিনিয়োগ পাইপলাইন ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার মধ্যে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের সক্রিয় পাইপলাইন রয়েছে। প্রকল্পটি ১ লাখের বেশি সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মোংলা বন্দরের পাশে ১১০ একর জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশনের (সিসিইসিসি) সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। প্রস্তাবিত ৬৫০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগে কৃষিভিত্তিক শিল্প ও হালকা প্রকৌশল খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরে ২৪ ঘণ্টা বন্দর কার্যক্রম, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ও ব্যাংকিং সেবা চালু করা হয়েছে। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ চালুর লক্ষ্য রয়েছে। পরিকল্পিত কার্গো সুবিধার মাধ্যমে বার্ষিক পণ্য পরিবহন সক্ষমতা ২ লাখ টন থেকে ৫ লাখ টনে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
চট্টগ্রামে ৬০০ একরের বেশি জমিতে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলের নীতিগত কাঠামো চূড়ান্ত করার কাজও এগিয়ে চলছে।
ফেনীর সোনাগাজীতে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের ৪১২ একর জমিতে প্রথম সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রকল্প প্রস্তুতির কাজ চলছে। সরকারি জমিতে সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের নির্দেশিকা অনুমোদন করা হয়েছে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পন্ন হয়েছে।
মহেশখালীর কুতুবজোমে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) ২০২৮ সালে সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে। এর দৈনিক ভিত্তি সক্ষমতা ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং সর্বোচ্চ সক্ষমতা ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের ১০ হাজার একরের বেশি শিল্পজমি ঘিরে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য ৪৪টি সুযোগ চিহ্নিত করা হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদে বেসরকারি অংশগ্রহণ পরিচালনায় জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে।
দ্বিতীয় স্তম্ভের আওতায় বিনিয়োগসেবা একীভূত করা, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সংযোগ শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিডা, বেজা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব কর্তৃপক্ষকে একীভূত করে বিনিয়োগ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও পিপিপি কার্যক্রমকে একটি প্রতিষ্ঠানের অধীনে আনা হয়েছে। নতুন কাঠামোর মাধ্যমে বিনিয়োগ সহায়তা, জমি ও পিপিপি সেবা আরো সমন্বিতভাবে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়া সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (সিইপিএ) সম্পন্ন করেছে। এর আওতায় বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা পাবে। এর মধ্যে ৮ হাজার ৪২৮টি পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে বলে ইনভেস্ট বাংলাদেশ জানিয়েছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে উৎপাদন, অবকাঠামো, ইলেকট্রনিকসসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্যের খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।
প্রধানমন্ত্রী ও ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে সরাসরি আলোচনার জন্য নিয়মিত সংলাপের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রথম দফায় উত্থাপিত ২৮টি বিষয়ের মধ্যে ২১টিতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চার মাসে দু’টি সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এছাড়া বাংলাবিজে তিন দিনের বিজনেস স্টার্টার প্যাকেজ চালু হয়েছে। ১৪ দিনের বিজনেস রেডিনেস প্যাকেজ তৈরি এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অগ্রাধিকার সেবা একীভূত করার কাজ চলছে।
দক্ষিণ চীনের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে গুয়াংজুতে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কার্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য পরামর্শক সেবা ক্রয় সম্পন্ন হয়েছে এবং চীনা পরামর্শকরা কাজে যুক্ত হয়েছেন। কার্যালয়টির কার্যক্রম ২০২৬ সালের অক্টোবরে শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে।
তৃতীয় স্তম্ভের আওতায় বিনিয়োগ পাইপলাইন তৈরি, বিনিয়োগযোগ্য সুযোগ প্রস্তুত এবং খাত ও অঞ্চলভিত্তিক সম্ভাবনা চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে বিদেশি ইকুইটি আনতে ভূমিকা রাখা যোগ্য ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট ইকুইটির ১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ার নির্দেশিকা অনুমোদিত হয়েছে। এজন্য পৃথক পোর্টাল প্রস্তুত করা হয়েছে। দেশের এ ধরনের প্রথম প্রণোদনা উদ্যোগটি ১৫ অক্টোবর ২০২৬ কার্যকর করার লক্ষ্য রয়েছে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, মোট বিনিয়োগ পাইপলাইনের পরিমাণ ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত বা বাস্তবায়ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সম্ভাব্য বিনিয়োগের প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে চীন থেকে ৬০০ মিলিয়ন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ৩০০ মিলিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০০ মিলিয়ন এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার রয়েছে।
খাতভিত্তিকভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও তথ্যপ্রযুক্তিতে ৩০০ মিলিয়ন ডলার করে এবং স্বাস্থ্যসেবা ও বস্ত্র খাতে ২০০ মিলিয়ন ডলার করে সম্ভাব্য বিনিয়োগ বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।
সরকারি পর্যটন স্থাপনায় বেসরকারি বিনিয়োগের প্রথম পাইলট পিপিপি প্রকল্প হিসেবে হোটেল শৈবালকে নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৩২ একরের এ প্রকল্পের ট্রানজ্যাকশন অ্যাডভাইজার নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে এবং সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। পাইলট প্রকল্প সফল হলে ৫০টির বেশি পর্যটন স্থাপনা পিপিপি পাইপলাইনে যুক্ত হবে।
এছাড়া গভীর সমুদ্রে তিন মাস পর্যন্ত মাছ ধরার অভিযানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা সাতটির বেশি গভীর সমুদ্রগামী জাহাজ কেনার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছেন। মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অধীনে একটি অ্যাকুয়াকালচার জোনের প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাইও শুরু হয়েছে।
দেশের প্রথম সমন্বিত বিনিয়োগ মানচিত্রায়ন কার্যক্রমও পরিচালনা করছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও সানেমের (এসএএনইএম) অংশীদারিত্বে পরিচালিত এ কার্যক্রমে দেশের আটটি বিভাগ ও প্রধান খাতকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এর মাধ্যমে অঞ্চলভিত্তিক বিনিয়োগের সুযোগ, প্রতিবন্ধকতা এবং প্রয়োজনীয় সহায়ক অবকাঠামো চিহ্নিত করা হবে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশ জানিয়েছে, বিনিয়োগ পরিবেশ ও সামগ্রিক বিনিয়োগ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে এমন উদ্যোগগুলোর অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিতভাবে জনসাধারণকে অবহিত করা হবে। নতুন কর্তৃপক্ষের অধীন পৃথক উইংগুলোর কার্যক্রম সরকারের লক্ষ্য ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থাগুলোর উত্তম চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসম্পাদন সূচকের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে।
আরটিভি/এসআর




